১৮ বছর পরে একদিন…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

সুস্মিতা খান

ক্লাস ফোর পর্যন্ত আমি পড়েছি ইংরেজি মাধ্যমের একটি স্কুলে। তারপরে নানান জটিলতায় আমার মা আমাকে একটা বাংলা মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। স্কার্ট-টাই পড়া আমি আচানক লাল পাইপিং লাগানো আকাশী নীল কামিজ আর সাদা পায়জামা ওড়নায় জড়িয়ে গেলাম। ক্লাস সিক্সে।

প্রথমটা আবছা মনে আছে। একরুম মেয়ে। সবাই অনেক কথা বলে। ক্লাস সিক্সের মেয়েরা যতটা বলে তারচেয়ে অনেক বেশী। প্রথমদিন বসেছিলাম হাফসার পাশে। বেড়াল চোখের, গোলাপি ঠোটের কাটাকাটা চেহারার একটা মেয়ে। কি যে সুন্দর। কি যে সুন্দর। আমি প্রথম দিনে সমাজবিজ্ঞান, সাধারণবিজ্ঞান সব গুলে খেয়ে ফেললাম এই মেয়েকে দেখে।

প্রথম দিনের প্রথম ক্লাস ছিল সাইদা আপার। উনি ক্লাসে এলেন। সবাই একসাথে দাঁড়িয়ে সালাম দিলো। উনি বললেন – এই সবাই “হাগায়” বস। আমি তীব্র আতঙ্ক নিয়ে এদিক ওদিক তাকালাম। দেখলাম সবাই বসে পড়লো। বেঞ্চে। জায়গা মতন। বুঝলাম “হ” উনার অনেক প্রিয় শব্দ। পরবর্তী সাত বছর উনি বাংলা ২য় পত্র পড়াতে গিয়ে অসংখ্যবার আমাদের কারণে অকারনে “হাগায়” বসিয়েছেন। আমরাও হেসে কুটিপাটি হয়ে “জায়গায়” বসেছি।

তাসকিন আপা গান শেখান। আমি মাথাসহ পুরো শরীর দুলিয়ে গাই “আয় তব সহচরী, হাতে হাত ধরি ধরি”। ম্যাডাম আমাকে গানে ২৫ এ ২৪ দেন, আমি ছুটে এসে আমার নানাকে বলি নম্বর আর উনি বলেন – এই মহিলার গান গাওয়ার ক্ষমতা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। তোকে ক্যামনে ২৫ এ ২৪ দেয়।

লাকি আপা নামে এক আপা আছেন। উনার ভয়ে সবাই কাঁপে। কেন কাঁপে এখন মনে করতে পারছিনা। কি জানি পড়াতেন তাও এখন মনে করতে পারছিনা। তবে মনে আছে আমিও লাকি আপার ভয়ে সবার সাথে কাঁপতাম। সম্মিলিত কাঁপাকাঁপি।

গুলেনুর আপা বলে এক হৃদয়হীন আপা ছিলেন। ম্যাটিল্ডা সিনেমা দেখেছেন? ঐটার প্রিন্সিপালটার মতন এক মহিলা। দেখে থাকেন যদি তাহলে বুঝবেন কিসের কথা বলছি আমি। বাপরে বাপ, খামোখা একটা আতঙ্কের মধ্যে রাখতেন তিনি সবাইকে।

বাবু স্যার। অঙ্ক করাতেন। সুযোগ পেলেই কান ধরে দিতেন টান। গরমে ঘামে ভেজা আমাদের কান সেই রামটানে প্রায়ই চিরে যেতো। সরল অঙ্ক বড়ই গড়লভাবে বুঝাতেন। আমি ছিলাম অঙ্কে মাথামোটা, এক সরল অঙ্কে আমি হাবুডুবু খেয়েছি আজীবন আর আমার কান খেয়েছে রামটান।

মারফি আপা ইংরেজি পড়াতেন। উনার ধারনা ছিলেন উনি খুব ফ্যাশন সচেতন একজন মানুষ। আমরা ছাপোষা ঘরের একপাল মেয়ে। উনি নাকে রুমাল চেপে ক্লাসে ঢুকতেন আর চোখ সরু করে আমাদের দিকে তাকাতেন। নিজেকে কীটসম মনে হতো। উনাকে আপা ডাকা বারণ ছিল। ম্যাডাম ডাকতে হতো। ম্যাডাম শব্দটি নিয়ে বিবমিষা বোধকরি তখন থেকেই শুরু।

ছিলেন নীরদ স্যার। উচ্চতর গণিত পড়াতেন। স্কেল দিয়ে সমান করা সিঁথি ছিল মাথায়। চুপচুপে তেল। মোটা কাঁচের চশমা। সরল হাসি, যে হাসি চোখ ছুঁয়ে যায়। সরল অঙ্কে কান টান খাওয়া আমি এই হাসির প্রেমে পড়ে উচ্চতর গণিত নিয়ে এক অসমসাহসিকতার পরিচয় দিলাম।

এই সব গল্পের মাঝে কিভাবে কিভাবে যেন স্কার্ট-টাই পড়া আমি লাল পাইপিং লাগানো আকাশী নীল কামিজ আর সাদা পায়জামা ওড়নায় জড়িয়ে গেলাম। সারা জীবনের জন্য।

আজ ১৮ বছর পরে আবার ফিরে গেলাম সেই দিন গুলোতে।

দীবা আমাদের সাথে এলো ক্লাস সেভেনে। চুপচাপ থাকে। কথা কম বলে। শোনে বেশী। ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম হয়ে তাক লাগিয়ে দিলো। শাফিন শীতকালে জামার নিচে সোয়েটার পড়তো। সুপারম্যানের মতন প্যান্টের উপর জাঙ্গিয়া লাগতোনা মোটেই। দারুণ লাগতো দেখতে। কোঁকড়া চুলের বুশরা ছিল ভীষণ মজার একটা মানুষ। সাধারণ একটা কথা বলতো তাতেই হাসি থামানো কঠিন ছিল।

আজ ১৮ বছর পরে আমাদের দেখা। সাড়ে চার ঘণ্টা আড্ডা। বায়োস্কোপের মতন করে চোখে এলো “হাগায় বসানো” সাইদা আপা, বেশী করে নাম্বার দেয়া তাসকিন আপা, গুলেনুর আপার নির্মম আচরণ, লাকি আপাকে কারণ ছাড়া ভয় পাওয়া, বাবু স্যারের রামটান, মারফি আপার থুক্কু ম্যাডামের হামবড়া ভাব, নীরদ স্যারের রুল টানা সিঁথি।

কাল সারারাত “হুমাইনি” (ঘুমাইনি)। উত্তেজনায়। আজ সারারাতও মনে হয় “হুম” (ঘুম) হবেনা। “হুশিতে” (খুশিতে)।

দিন শেষে শুরুর দিকের মানুষগুলোর কাছে ফিরে যাবার মতন আনন্দ আর কিছুতে পাওয়া যায়না।

ছবি: লেখক সৌজন্যে

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com