১৩ মানেই…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অনেকের কাছে ১৩ মানেই বিপদ। বহু হোটেলে আজও ১৩ নম্বর লেখা কোন রুম রাখা হয় না, বহু রেস্তোরাঁয় ১৩ নম্বর টেবিল থাকে না। অনেকে ১৩ তারিখে কাজ শুরু করতে চান না।এমনকি অনেক এপার্টমেন্টেও ১৩ নাম্বার ফ্লোর বলে কোন ফ্লোর থাকে না। অনেকের কাছেই অপয়া এই ১৩ সংখ্যা।  সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে শুভ বা অশুভ সংখ্যার কোনো সংকেত নেই। ব্যাংকে টাকা লেনদেন, জিনিসপত্র কেনাকাটা, শেয়ার বাজার থেকে শুরু করে মানুষের জন্মদিন, পরীক্ষার ভাল-খারাপ সব কিছুতেই সংখ্যার একটা আধিপত্য থেকেই যায়।তেমনি একটা সংখ্যা ১৩।পৃথিবীর অনেক দেশে, অনেক ধর্মে এবং অনেক মানুষের কাছে এই ১৩ সংখ্যাটি অপয়া হিসেবে বিশেষ পরিচিত। কিন্তু কেন? তাহলে আসুন কেন এবং কিভাবে এই সংখ্যাটি ‘অপয়া’ হিসেবে পরিচিতি পেল, জেনে নেই তার ইতিহাস।

১৮৬৯ সালে ইতালির বিখ্যাত সুরকার জিওচিনো এনটোনিও রোশিনির বায়োগ্রাফি থেকে আনলাকি ১৩ সংখ্যার বিশদ বর্ণনা মেলে। শুধু তাই নয়, রোশিনি নিজেও কোন এক শুক্রবার  এবং ১৩ তারিখের মৃত্যু বরণ করেন। ফলে সংখ্যাটি আরও গুরুতর কালো সংখ্যা হিসেবে সকলের মনোজগতে প্রতিষ্ঠা পায়। ১৩ নিয়ে এই ভীতির নাম ‘ট্রিসকাইডেকাফোবিয়া’। এ প্রসঙ্গে চলুন একটা রূপকথার গল্প জেনে নেই।

এক জ্যোৎস্নারাতে ১২ জন দেবতার নৈশ ভোজের আয়োজন চলছিল। সকলে যখন একসঙ্গে রাতে খাবার টেবিলে  বসলেন । ঠিক তখনই বিনা আমন্ত্রণে সেই সেখানে উপস্থিত হলেন ১৩তম ব্যক্তি। সবাই বেশ চমকে যায়। কারণ সেই ১৩তম ব্যক্তি ছিলেন খারাপ কাজের দেবতা স্বয়ং লোকি। তার পরপরই  হলো অশুভের সূচনা। লোকি শুরু করেন রাজ্যের অশান্তি। লোকির প্ররোচনায় শীত ও অন্ধকারের দৃষ্টিহীন দেবতা হোড ভালো কাজের দেবতা ব্লাডারকে হত্যা করে।  পুরো স্বর্গপুরীতে নেমে আসে শোকের মাতম। সেই থেকে ১৩তম জনের উপস্থিতি অর্থ পরের বছর কোনো মৃত্যু সংবাদ! এভাবে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ধর্মে ও সমাজ ব্যবস্থায় ১৩ সংখ্যাটি অপয়া হিসেবে পরিচিতি পায়। উন্নত-অনুন্নত অনেক দেশের সংস্কৃতিতেও এর ব্যতিক্রম ঘটে না।

‘১৩’ সংখ্যা নিয়ে বিশ্বে প্রচলিত কুসংস্কার:

প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করে যে, ১৩তম ধাপটি জীবনের শেষ ধাপের একটি চক্র। তাদের বিশ্বাস- চক্রের ১২টি ধাপ জীবিত অবস্থায় সম্পন্ন হয়। সুতরাং ১৩ নম্বর ধাপ মৃত্যুকেই নির্দেশ করে। তাই ১৩-কে তারা মৃত্যু ও ধ্বংসের প্রতীক বলে মনে করত। এভাবেই ১৩ সংখ্যাটির সাথে আনলাকি বা অশুভ কথাটির ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়েছিল মিশরে।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও ১৩ সংখ্যাকে অশুভ বলে মানে। তাই তারা চন্দ্র পঞ্জিকা ১৩ মাসের পরিবর্তে ১২ মাসের সৌর পঞ্জিকার ব্যবহার শুরু করেন। কারণ এক  সৌর বছর = ১৩ চন্দ্র মাস (Moon Months)। আর এ সব কারণে ‘১৩’ সংখ্যাটিকে এখনো অনেকেই আনলাকি মনে করেন, তা কারণ মেনেই হোক বা অকারণেই হোক।

খ্রিস্ট ধর্মেও ১৩ জনের একসঙ্গে খাবার টেবিলে বসাটাকে অশুভ বলে ধরা হয়। কারণ লাস্ট সাপারে ১৩তম ব্যক্তি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন জুডাস ইস্কারায়োট। পরবর্তীতে জুডাস ইস্কারায়োটই যীশুর সঙ্গে প্রতারণা করেছিলেন। যীশুকে যেদিন শূলে চড়ানো হয় সেদিন ছিল শুক্রবার, তারিখটিও ছিলো ১৩। তাই এখনো খ্রিষ্টানরা যেকোনো শুক্রবার ১৩ তারিখ হলে সেই দিনটিকে অশুভ হিসেবে ধরে নেয়। ঔপনিবেশিক শাসক হিসেবে ব্রিটিশদেরকে মুক্তমনা বলা হলেও ১৩-এর কুসংস্কার থেকে তারাও মুক্ত নন। ব্রিটেনে ১৩ নম্বর বাড়ি অন্য বাড়ির তুলনায় দামে কম। ইংল্যান্ডে ১৩ নম্বরধারী বাড়িগুলোর আর্থিক মূল্য একই মানের অন্য বাড়িগুলোর তুলনায় গড়ে প্রায় চার হাজার পাউন্ড কম।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সর্বাধিক দীর্ঘমেয়াদে চারবার নির্বাচিত বত্রিশতম প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টও ১৩ নিয়ে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিলেন। এই প্রেসিডেন্ট ১৩ তারিখে কোথাও সফরে যেতেন না, এমনকি হোয়াইট হাউস থেকে শুরু করে কোনো দাওয়াতেও কখনো ১৩ জন অতিথি নির্বাচন করতেন না। কানাডার ওন্টারিওতে ১৩নং সড়ক বলে কিছু নেই বা ছিলও না। ১৩ নম্বরকে কানাডিয়ানরা দুর্ভাগ্যের প্রতীক বলে ভাবেন, যদিও এর কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যায় না। বহুদিন যাবৎ প্রচলিত কুসংস্কারের ফলে মানুষের মনে ১৩ সংখ্যাটি অপয়া হিসেবে বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে।

বিভিন্ন ধর্মে ও দেশে ১৩ কে যেমন অশুভ হিসেবে মেনে চলে তেমনি বিভিন্ন ব্যক্তিও এই ১৩ সংখ্যার নিয়ে মাথা ঘামান।প্রচন্ড ক্ষমতাশালী সম্রাট আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট এক সময় নিজেকে দেবতাদের সমকক্ষ ভাবতে শুরু করেন। সেসময় গ্রীসে ১২ মাসের জন্য ১২ জন দেবতাকে মানতো গ্রীসের অধিবাসীরা। এই ১২ জন দেবতার মূর্তি বানিয়ে পূজা করতো গ্রীকরা। আলেকজান্ডার সেই ১২ জন দেবতার সঙ্গে নিজের বিশাল আকৃতির মূর্তি তৈরি করেন।তাতে দেবতার সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩তে। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর গ্রীকরা ভাবতে শুরু করে, আলেকজান্ডার ১৩তম দেবতা হওয়ায় তার মৃত্যু হয়েছে। তাই আলেকজান্ডারের জীবনে ১৩ অপয়া হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। ইরাকের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের করুণ পরিণতি ১৩ সংখ্যার বৃত্তে আবদ্ধ। সাদ্দাম হোসেন (SADDAM HUSSEIN)-কে ইংরেজীতে লিখতে লাগে ১৩টি অক্ষর। তাকে গ্রেফতার করা হয় ২০০৩ সালের ১৩ই ডিসেম্বর। তবে কি এখানেও ১৩ অশুভ চক্রের প্রভাব!

 বিভিন্ন স্থানে ও প্রতিষ্ঠানে ১৩ এর প্রভাব।

১৯৭০ সালের এপ্রিল মাসের ১৩ তারিখে  অক্সিজেনের সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হওয়ার কারণে অ্যাপোলো ১৩-এর চন্দ্র অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে নভোচারীদের অনেকেরই বেঁচে থাকা দুরূহ হয়ে পড়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত অবশ্য তারা নিরাপদে ফিরে আসতে পেরেছিলেন। আর তখন থেকে এই নম্বরটিকে আনলাকি নাম্বার হিসেবে নভোচারীদের অনেকেই বিশ্বাস করেন।

একজন ব্যক্তিকে ফাঁসিতে ঝুলোনোর স্থানটিকে গ্যালোচ বলা হয়ে থাকে। কোনো অপরাধী ব্যক্তির তার জীবনের শেষ পরিণতি হচ্ছে এই গ্যালোচ। এই ফাঁসির স্থানটি ১৩টি ধাপের সিঁড়ি দিয়ে তৈরি একটি মঞ্চ। এটা বিশ্বাস করা হয় যে, একজন মানুষকে ফাঁসিতে ঝুলানোর জন্য ১৩টি ধাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। উরুগুয়ের এয়ার ফোর্স ফ্লাইট ৫৭১ বিমানটিতে আন্দিজ পর্বতে ধাক্কা লেগে আগুন ধরে যায়। দুর্ঘটনায় ২৯ জনের মৃত্যু হয়। একই দিনে সোভিয়েত এরোফ্লেট রানওয়ে থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে একটি লেকের ধারে বিস্ফোরিত হয়। ১৭৪ জনের মৃত্যু হয় ঐ ঘটনায়। সেইদিন ছিল ১৩ তারিখ। তখন থেকে মানুষ বিশ্বাস, এই ১৩ নম্বরই ছিল অঘটনের মূলে।

Columbia Space Shuttle নভোযানটি মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল ১৬ জানুয়ারি ২০০৩ সালে। সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে,  তারিখটির সবকটি সংখ্যা যোগ দিলে দাঁড়ায় ১+৬+১+২+০+০+৩ = ১৩! মহাকাশ থেকে ফেরার সময় নভোযানটি দুর্ঘটনায় পতিত হয়। বিস্ফোরণের কারণে Columbia Space Shuttle নভোযানটি ধ্বংস হয়ে যায়। নভোযানে অবস্থানকারী সকল ক্রুর দুঃখজনক মৃত্যু ঘটে।

কভেনস বলতে ১৩ জনের দল নিয়ে ডাইনি বা খারাপ লোকদের একটা দলকে বোঝায়। দলে ১৩ জন সদস্য থাকায় কুসংস্কারবশত মানুষের বিশ্বাস জন্মায়, যে দলে ১৩ জন থাকে সে দলের কোনো উন্নতি হয় না। এমনকি দলটির সবরকম চেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানের একটি ইতিবাচক প্রভাব আছে। বিজ্ঞানের মুখোশ পরে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা একদিকে খুবই সহজ। বলা চলে, যত মানুষ, তত সংস্কার। বিশ্বাস পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয়ার আগেই মন থেকে তিরোহিত হতে পারে, কিন্তু কোনো বিশ্বাস যখন পূর্ণ রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে, তখন তা হয় সংস্কার।

কোন সংস্কারকে আমরা কুসংস্কার বলি, কোনো কোনোটাকে ভালো মন্দ কিছুই না বলে প্রশ্রয়ের দৃষ্টিতে দেখি। যেমন: ১৩ সংখ্যাটি, আনলাকি থার্টিন নামেই বেশ পরিচিত। একে অনেকেই স্বভাবত এড়িয়ে চলেন, সে শিক্ষিত স্বভাবসুলভ বা অশিক্ষিত সহজাত যা-ই বলি না কেন! এটি প্রচলিত একটি কুসংস্কার যা যুগ যুগ ধরে মানুষের চিন্তা ভাবনায় মিশে আছে।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com