হেমন্তের অরণ্যে পোস্টম্যান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হেমন্তের অরণ্যের কাছে কারা চিঠি নিয়ে যায়? সেই সব পোস্টম্যানেরা কি আজও পৃথিবীতে আছ? কাদের লেখা চিঠি বিলি করে তারা হেমন্তে ঝরা পাতার অরণ্যে! কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় জানতেন হয়তো। তাই লিখেছিলেন,

‘‘হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান ঘুরতে দেখেছি অনেক তাদের হলুদ ঝুলি ভরে গিয়েছিলো ঘাসে অবিকল ভেড়ার পেটের মতোন’’।

হেমন্তকাল এসেছে পৃথিবীতে। বিকেল হলেই এখন একটা উদাসী হলুদ আলো নেমে আসে । সন্ধ্যাবেলা অনেক মানুষ আর কিছু করবার নেই বলে ভাত খেয়ে হ্যারিকেন নিভিয়ে রেখে ঘুমের মধ্যে হারিয়ে যায়।  লোহার বাসরের মতো এই শহরে ফসল ওঠেনা হেমন্তে।  তবু ক্যালেন্ডারের পাতায় হেমন্ত ফিরিয়ে দেয় হয়তো অনেক স্মৃতি।

গ্রামে গ্রামে ফসল কাটা হয়ে যাবার পর ইঁদুরেরা আসে ফসলের অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ করতে। হেমন্তের ফসলশূন্য উদাসী মাঠের সেইসব ইঁদুরদের সন্ধান আমাদের নতুন করে দিয়েছেন জীবনানন্দ দাশ। শালিক আর লক্ষ্মীপেঁচার নির্জন স্বাক্ষরকে তো অমর করে রেখে গেছেন তিনি।  তাই বোধ হয় অকারণে মন পোড়ে এই হেমন্তকালে।ধান আর ছাতিমফুলের সুঘ্রাণের গল্প মনের মধ্যে বসবাস করে।

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো সেই হেমন্তকাল নিয়ে ‘হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান।’ 

হেমন্তকাল মনে হয় ফুরিয়ে যাওয়ার সময়। কেউ কেউ বলেন এমন কথা। হেমন্তকালে ক্ষণস্থায়ী সময় কোত্থেকে যেন হুহু করা বেদনাকে নিয়ে আসে হাত ধরে। হেমন্তের বিকেলে যে কী ম্লান হলুদ আলো জ্বেলে একটু একটু করে মরে যেতে থাকে সে বার্তা পৌঁছায় কারো কারো কাছে। সন্ধ্যার আকাশে সবকিছুকে একা করে দিয়ে যে মৃগশিরা নক্ষত্রের দেখা মেলে চাঁদের পাশে। তবুও পৃথিবীতে হেমন্ত আসে। আসে আমাদের এই নগরেও। কিন্তু বিশাল ফ্লাইওভার, ছুটে চলা গাড়ির হর্নের আর্তনাদ,জনতার জঘন্য মিতালিতে ভরে ওঠা এই মহানগরে কোথায় বসবে হেমন্তকাল? তার জন্য তো কোনো আসন পাতা হয়নি। আজকাল পাঠ্য বইয়ের পাতায়ও মুখ গুঁজে নেই হেমন্তকাল। নেই আমাদের ব্যস্ত শহুরে মনের বন্দরে। হেমন্ত এখন যেন এক সরু করিডোর, পার হয়ে শীতের কাছে যেতে হয় কেবল।

কে জানে হেমন্তের সময়কে? নিভু নিভু হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের চেম্বারের বেঞ্চিতে বসে থাকা বৃদ্ধ মানুষটি কী মনে রাখেন হেমন্তের কথা? তাকে তো আসন্ন শীতের আগেই গুছিয়ে রাখতে হবে নিজের সামান্য কাপড়, কাঁথা, গত বছরের রোদের গন্ধমাখা বাঁদরটুপি। যে লোকটা ওষুধের দোকানের সামনের সিঁড়িতে ঘুমায় তারও মাথায় নানান ভাবনা জমা হয় হেমন্তকালে। হেমন্তের রাতগুলি একা, একটু বেশি দীর্ঘ জানে সে খবর চায়ের দোকানের একটু বেশি কাছে বসে থাকা পথের কুকুর।অনেক রাতে একা বাড়ি ফেরা মানুষটির মতো তাকেও জানতে হয় এইসব রাত ভুতুড়ে। তাই ভাবি, বৃষ্টি ফুরিয়ে যাওয়া এই মাসে কারা চিঠি লেখে শুকনো পাতার অরণ্যকে?পোস্টম্যান সেই চিঠি নিয়ে যায়। তাদের দেখা হয় সেখানে মহীনের ঘোড়াগুলির সঙ্গে?

ট্রেনস্টেশনে এত এত লোহার তৈরি আয়োজন নিয়ে পড়ে থাকে রেললাইন। দুপুরের দিকে গরম ভেদ করে উত্তর দিক থেকে হাওয়া দেয়। প্ল্যাটফর্ম ছুঁয়ে বেড়ে ওঠা নিমগাছটার পাতায় পাতায় সে হাওয়া বুনে যায় শীত আসার গল্প। রেললাইনের মতো হেমন্তে কোথায় চলে যেতে চায় মানুষের মন স্মৃতিবিদ্ধ হয়ে?কাজ ফুরানো গরীব চায়ের দোকান, ভিড় ছাড়া ডিসপেন্সারিতে তিনদিনের পুরনো পত্রিকা, সেলুনে কাঁচি চলার কুটকুট শব্দ তাকে কী মনে করিয়ে দেয় কেউ রেডিও শুনছে অতীতকালে? সাইকেলে চেপে বাড়ি ফিরছে কেউ, খড়ের গাঁদা থেকে বের হয়ে এসে হাঁটছে একটা লাল পিঁপড়া, মাচায় শুয়ে আছে লাউ, টমেটো ক্ষেতে পানি ছিটিয়ে গেছে কেউ যত্নে-এসব ছবি কবেকার? কোন সুদূর কোনো হেমন্তকালে?

হেমন্ত তো শহর থেকে দূরে, অনেক দূরে ধানক্ষেতের উপর কুয়াশার আবছায়া চাদর, পুরনো পথ পার হতে গিয়ে নাকে আসা পাতা জ্বালানোর ভুষো গন্ধ। সে ক্ষণস্থায়ী; কাফকার লেখাগুলোর মতো। বুকের ভেতরে কেমন টান ধরে থাকে, কিন্তু মনে হয় কতকিছুই তো চোখ এড়িয়ে থেকে গেলো।জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়তে পড়তে যেমন মনে হয় সব কবিতাই তিনি হয়তো হেমন্তকালে বসে লিখেছিলেন।

হেমন্তকালের কোনো এক ভোরবেলা বের হয়ে পড়ি আমরা কেউ কেউ। বাস আমাদের উড়িয়ে নিয়ে যায় শহর থেকে দূরে। সেখানে জলের সবুজ ঘ্রাণ মাখা পুকুরে দলবেঁধে নেমে যায় হাঁসের দল, ভেসে আসে কীর্তন গান দূর থেকে।কাদের উঠানে উদাসী আলোয় শুকায় কার শাড়ি? আমরাও কি পথ হেঁটে যেতে যেতে থমকে যাই মৃত পাখি আর সাপের খোলস দেখে? হেমন্তকাল ফুরিয়ে যাওয়ার-ই সময়।

ইরাজ আহমেদ

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com