হাসি দিয়ে যায় চেনা..

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জসিম মল্লিক,টরন্টো থেকে

২০১০ সাল। আমার সামনে এখন যে ভদ্র মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন তিনি দেখতে বেশ আকর্ষনীয়। ফর্সা গোল গাল। ছোটখোটো দেখতে। চেহারায় একটা দুঃখী দুঃখী ভাব আছে। আসলেই দুঃখী কিনা কে জানে। মানুষের চেহারা দেখে কী আর সব বোঝা যায়! আকর্ষনীয় চেহারার এই মানুষটিকে মহিলা বলা কি ঠিক হচ্ছে! বয়স আন্দাজ করতে পারছি না। তবে চব্বিশ পঁচিশের মধ্যে হবে। সুতরাং মহিলা বললে অসুবিধা হবে না। আমি তাকে কি সম্বোধন করবো তাও বুঝতে পারছি না। আমার আগেই যিনি খাবার অর্ডার করছিলেন তিনি ভাবী বলে সম্বোধন করেছেন। এই বয়সী একজনকে ভাবি বলতে আমার কেমন যেনো বাঁধো বাঁধো ঠেকছে , তাই আমি কোনো সম্বোধনেই গেলাম না। আমার বয়স এখন ছাপ্পান্ন পার হয়েছে। কিন্তু ভাব করি আমি যেনো এখনও তরুণ। আমার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আমি এমন একটা ভাব করি যেনো আমি ওদের সমান। অর্ককে বলি আই এ্যাম ইয়াঙ্গার দেন ইউ। অর্ক হাসে। বলে ওকে বাবা। অথচ ভিতরে ভিতরে কত কি ক্ষয় পাচ্ছে! কত সমস্যা! বয়স বড় নির্মম। আমি নিজেকে কখনও লুকাইনা। আমার ভাবতে ভয় লাগে যে একদিন বুড়ো হবো। ইশ্ সেই দিনগুলো কী ভয়াবহ হবে! কেউ পাশে থাকবে না। হয়ত বা ওল্ড হোমে পড়ে থাকব। আমি আমার মাকে বার্ধক্যের যন্ত্রনা সহ্য করতে দেখেছি। অন্যের উপর নির্ভরশীল হওয়া যে কত কষ্টের..। যাইহোক। দোকানের এই মহিলা যদি কোনো পার্টিতে সাজ সজ্জা করে যান তাহলে আমি নিশ্চিত তাকে চিনতে পারবো না। কারন তখন তাকে দেখতে রানী মুখার্জীর মতো লাগবে। আমার হয়ত মাথা ঘুরে যাবে। এই মানুষটি খুউব গম্ভীর টাইপ। প্রফেসfরদের মতো। একেতো বয়স অল্প তার উপর সুন্দর দেখতে, তাকে কি গম্ভীর হলে চলে! আমি বেশ কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকলাম। কিন্তু তাকে একবারও হাসতে দেখলাম না। গম্ভীর টাইপ মানুষ দেখলে আমার মন খারাপ হয়ে যায়। এই মহিলা হাসলে তাকে দেখতে কেমন লাগবে সেটা দেখার আমার খুব ইচ্ছা। আমরা কেনো যে

আমার মায়ের সঙ্গে

প্রাণ খুলে হাসতে পারি না। নিজেকে একটা খোলসে বন্দী করে রাখি। গাম্ভীর্যের একটা ভাব ধরে থাকি। হাসি খুশী থাকা কত ভালো ব্যাপার। আমি নিজে হাসি খুশী মানুষ খুউব পছন্দ করি অথচ আমি নিজেই মাঝে মাঝে মুখ গোমরা করে থাকি। আয়নায় তখন নিজেকে দেখি। গোমরামুখো আমাকে কেমন কিম্ভুত আর অসহ্য লাগে। হাসলে প্রতিটা মানুষকে কি চমৎকার দেখতে লাগে। অনেকেই বলেছে আমাকেও নাকি হাসলে ভালো লাগে। এখন আবার দাড়ি রেখে আরো বুড়োটে হয়ে গেছি। আমার এই নিউ লুকে বন্ধুরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। দুটোই আমি খুশী মনে গ্রহণ করেছি। কারন সবাই আমার আপনজন। আচ্ছা আমরা হাসতে কেনো ভুলে যাই! হাসি শেখার জন্য কি কোনো ট্রেনিং সেন্টার আছে! থাকলে সেখানে আ

মারই আগে ভর্তি হওয়া উচিত। নিউইয়র্কে আমার এক বন্ধু আছে ওর সাথে যখন কথা বলি তখন সে

যতটুকু না কথা বলে তার চেয়ে বেশী হাসে। আর মজার মজার জোকস শোনায়। তার ভান্ডারে অসংখ্য জোকস আছে। তার অসাধারন প্রান প্রাচুর্য। তাকে আমি কখনও মন খারাপ করতে দেখিনি। মুখ গোমরা করে থাকে না। হাসতেও পারে। তার সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল তার দোকানে। বিক্রেতাদের হাসলে ভাল লাগে। ভরসা পাওয়া যায়। সেটা ১৯৯৮ সালের কথা। প্রথম আমেরিকায় এসেছি। যা দেখি তাই স্বপ্নের মতো মনে হয়। আমি যখন প্রথম বরিশাল থেকে ঢাকা আসি তখনও আমার এরকমই অনুভূতি হয়েছিল। আহা আমেরিকা! শংকরের ’এপার বাংলা ওপার বাংলা’ পড়ে মনে মনে ভাবতাম আমি কি কখনও আমেরিকা যেতে পারবো! ওরকম দেশ আবার আছে নাকি! একদিন আমি ঠিকই গেলাম। নিউইয়র্ক শহর। একদিন জ্যামাইকা অঞ্চলে এক দোকানে ঢুকলাম। দোকানটার মালিক একজন বাঙ্গালী। বিচিত্র রকমের সব জিনিস দোকানটায় বিক্রি হচ্ছে। ঢুকে দেখি তেমন একটা লোকজন নাই। একজন ভদ্রলোক দোকানে। আমি তাকে লম্বা করে আস্লামাআলাইকুম… বললাম। লোকটা অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকালো। তারপর মুখ ঘুরিয়ে নিজের কাজে মন দিল। আমি একটু ব্যথিত হলেও হাল ছাড়লাম না। আমি যেচে বললাম ভাইসাব আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, বেড়াতে। ও আচ্ছা। বলেন কি দরকার। না মানে আপনি বাঙ্গালী মানুষ। আমেরিকায় ব্যবসা করছেন। বাঙলা সাইনবোর্ড। আমার বেশ ভালো লাগছে। দেখতে আসলাম। তা জনাবের দেশে কি করা হয়! আমি বললাম, সাংবাদিক। অহ্, এই বলে আবার কাজে মন দিলেন। আমি একটু কষ্ট পেলাম। তিনি বললেন আপনার কিছু দরকার! বললাম জ্বি। আমি একটা ক্যারিঅন ব্যাগ কিনবো। সে বলল, দেখেন কোনটা পছন্দ হয়। আমি একটা ব্যাগ পছন্দ করলাম। এবং বিল পে করতে গেলে সে কিছুতেই টাকাটা নিলেন না। আমি খুব লজ্জিত হচ্ছিলাম কিন্তু তিনি না হেসেই বললেন, আপনি মেহমান, আপনাকে নাইস মানুষ মনে হইছে, তাই ক্ষুদ্র গিফট..। একদিন গেলাম আর এক দোকানে। সেটাও জ্যামাইকায়। হিলসাইডে। দোকানটার নাম(এই গল্পটি আগেও করেছি) সিভিএস ফার্মা। সেখানে গিয়ে একটি বাঙ্গালী তরুনীকে পেলাম। রপসী মেয়েটি পার্টটাইম কাজ করে। সে আমাকে যথেষ্ট আগ্রহ নিয়ে সব দেখাচ্ছে, কথা বলছে, হাসছে , জানতে চাইছে আমেরিকা আমার কেমন লাগছে। কোথায় কোথায় ঘুরলাম এইসব। ছাত্র সে। আমি অনেক কিছু কিনলাম। সেদিন আমাকে আশ্চর্য করে দিয়ে সে তার এমপ্লয় কোটা থেকে তিরিশ পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট দিল। শুধু তাই নয় সে আলাদা একটা প্যাকেট দিল। বাড়িতে যেয়ে দেখি ব্রান্ড নেমের দুটো পারফিউম। কানাডায় প্রথম এক বছর ছিলাম অটোয়া। প্রথম প্রথম দু’একটা বাঙ্গালী দোকানপাটে দেখতাম বিক্রেতারা কেমন গম্ভীর মুখে বসে আছে। আমার খুউব শখ হয় দেখি এই মানুষগুলো হাসলে তাদের দেখতে কেমন লাগবে। আমি হাসিমুখ মানুষ খুঁজে বেড়াই। আহা কেনো যে এরা হাসতে ভুলে যায়!

ছবি: লেখক ও গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com