হারিয়ে যাওয়া ক্ষুদে নবাবরা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইরাজ আহমেদ

কিরকম শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে থাকতো অস্ত্রগুলো। যেন হিংসার মন্ত্রে বশ করে শুইয়ে রাখা হয়েছে তাদের। ঠিক একটি সময়ে জেগে ওঠে তারা, উগরে দেয় শ্বাপদের মতো হিংস্র শিশা, মৃত্যু, রক্তপাত। প্রথম অবৈধ অস্ত্র দেখি সত্তরের দশকের একেবারে শেষ ভাগে এসে। তখন স্কুলের গন্ডী টপকে গেছি সবে। আমাদের পাড়ায় তরুণদের হাতে অস্ত্র এলো, একটা ভাঙ্গা রিভলবার। সঙ্গে কয়েক রাউন্ড গুলি। তখনই জানলাম গুলিকে ডাকা হয় বিচি নামে। পিস্তল অথবা রিভলবারকে বলা হয় ঘোড়া। সবই শহরের অন্ধকার জগতে ব্যবহৃত নাম। পাড়ায় পাড়ায় তখন গজিয়ে উঠছে ‘গলির মোড়ের গুন্ডা’, সমাজতাত্বিকদের ভাষায় ‘স্ট্রিট কর্ণার গ্যাং’। সেই ভাঙ্গা অবৈধ অস্ত্র সেই গলির মোড়ের গুন্ডাদের চেহারাই পাল্টে দিয়েছিলো। তিনশ পয়ষট্টি দিনের প্রায় প্রতিদিন বল অথবা ব্যাট হাতে মাঠে খেলতে যাওয়া একদল তরুণ ঝট করে যেন পাল্টে গেলো। পাল্টে গেলো তাদের ভাষা, পাল্টে গেলো মুখভঙ্গী। অস্ত্রের ধাতব আগ্রাসনে তারা হারালো তাদের সারল্য আর সকল কৈশোরবেলা।তখন সন্ধ্যা নামলেই পাড়ার বাড়িগুলো কেঁপে কেঁপে উঠতো বোমা আর গুলির আওয়াজে।তখনো অবশ্য শহরের মাস্তানদের হাত থেকে নেমে যায় নি হকিস্টিক আর ছোরা। পাড়ায় পাড়ায় জন্ম নেয়া এই ক্ষুদে নবাবদের রাজত্বে তখন দিশেহারা নগরবাসী, অভিবাবক। তারা এই অস্ত্রের জোরেই ভাগ করে নিয়েছিল নগরীর নানা এলাকাকে অদৃশ্য দাগ টেনে।
আমাদের পাড়ায়ও এমন ক্ষুদে নবাবদের একটা দল ছিলো। আবাল্য সঙ্গীদের এই দলের মধ্যে মিশে গিয়েছিলো আমার ছায়াও।রেস্তোরাঁয় বাকী খাওয়া, দলবেঁধে সিনেমা হলে গিয়ে মারপিট, পাড়ায় পাড়ায় বিনা কারণে যুদ্ধ আর গার্লস স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে মহড়া দেয়াই ছিলো তাদের একমাত্র কাজ।সে মহড়া অবশ্য ছিলো প্রেমের।
আমার এই ক্ষুদে নবাব বন্ধু দলের সর্দার রাতে একাই এগারোটা রুটি খেত মাংস দিয়ে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির ছাদে ব্যায়াম করতো। ওর ঘুঁষির ধাক্কায় প্রতিপক্ষের একজনের দাঁত পড়ে যেতে দেখেছিলাম নিজের চোখে।তখনও মারামারি করার জন্য শরীরচর্চার বিষয়টা পাড়ায় পাড়ায় প্রচলিত ছিলো।আশির দশকের শুরুতে আমাদের চিন্তার জগতে রীতিমতো ঝড় তুলেছিলো ব্রুস লী। তাঁর অসাধারণ কারাতে, কুংফু কৌশলের জোয়ারে ভাসছে তখন পুরো শহরের তরুণরা। পাড়ায় পাড়ায় কাঠ আর লোহার চেইন দিয়ে তৈরী হচ্ছে নান চাকু নামে বিশেষ ধরণের অস্ত্র। সেখানে আধ হাত লম্বা দুটো লাঠিকে চেইন দিয়ে আটকে নেয়া হতো। ব্রুস লী তাঁর ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’ ছবিতে এই অস্ত্রের প্রায় শৈল্পিক ব্যবহার দেখিয়েছিলেন। সেসব আমাদের কাছে ছিলো স্বপ্ন। তখন ঢাকার কয়েকটি পাড়ায় তরুণদের মধ্যে ক্যারাটে শিক্ষা নেয়ার চল শুরু হয়। আমাদের পাড়ায়ও ক্যারাটে ব্ল্যাক বেল্ট পাওয়া এক বড় ভাইয়ের কাছে শুরু হয় আমাদের প্রশিক্ষণ। একটি অর্ধসমাপ্ত মার্কেটের পাশে খোলা জায়গায় চলতো প্রশিক্ষণ।সেই বড় ভাই অবশ্য আমার প্রতিবেশী হওয়ায় তার বাড়িতেই শিখতাম আমি। প্রথম দিনেই লাথি খেয়ে পড়ে গিয়ে তার খাট ভাঙ্গার স্মৃতি আজো মনে আছে।
মারামারি করার জন্য তখন অদ্ভূত দর্শন একটি অস্ত্রের প্রচলন ছিলো। সেটার নাম হাঙ্গর মাছের দাঁত। রিকশা অথবা সাইকেলের চেনের দিন ফুরিয়েছে তখন। জায়গা করে নিয়েছিল এই দাঁত। বস্তুটি কোত্থেকে হাতে এসেছিলো মনেও পড়ে না। কিন্তু ব্যবহার ও রক্তপাতের ইতিহাসটা ছিলো ভয়ঙ্কর।
ক্ষুদে নবাবদের হাতে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র চলে আসার আগে হকিস্টিক নামে এই খেলার সামগ্রীটি বিপজ্জনক অস্ত্র হিসেবে রাজত্ব করেছে। এসব লাঠিসোটার জমানা বিদায় নেয় পাইপ গানের আমদানীতে। পাইপ গান নামের এই অস্ত্রটি অবশ্য বেশীদিন স্থায়ী হয় নি। তারপরেই চলে আসে মেশিন অর্থাৎ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র।
এই শহরের সমাজ কাঠামো বদলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার জগতের ভূগোলও পাল্টেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময় রাজনীতি করতে গিয়ে অনেক ধরণের জটিল অস্ত্র স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। এখন তো একে-৪৭ অস্ত্রের যুগ। বদলে গেছে অন্ধকার জগৎ। উধাও হয়ে গেছে সেইসব স্ট্রিট কর্ণার গ্যাং অথবা ক্ষুদে নবাবেরা। এই শহরে দাঁড়িয়ে কত ধরণের স্রোত যে বয়ে যেতে দেখলাম।দেখলাম হিংসার মন্ত্রে বশ করা অবৈধ অস্ত্র।

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com