হারালো ভূতের গল্প…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইরাজ আহমেদ

আলোর আগ্রাসন বাড়লেই ভূতেরা বিদায় নেয়। এই শহর থেকেও ভূত বিদায় নিয়েছে। একদিন শহরটা অদ্ভূত নির্জন ছিল। তখন মানুষের ঠ্যালাঠেলি আর ভীড় বাড়ে নি। এতো শপিং সেন্টার, এতো আলো জ্বেলে রাতজাগা খাবারের দোকানের বাড়াবাড়ি কিছুই ছিল না। তখন আমাদের জীবনে ভূত ছিল, ভূতেদের নিয়ে নানা গল্পও ছিল। লিখতে লিখতে মনে হলো একটা শহরকে ঘিরে ভূত হারিয়ে গেলে বোধ হয় কিছুটা বিপত্তিই হয়। ভূত অথবা ভূতের ধারণা তো মনের সরলতার একটি প্রতিফলন। সরলতা হারিয়ে গেলে ভূতও হয়তো বিদায় নেয়।
অনেক অনেক দিন আগের কথা। শৈশবের পাড়ায় গলির গায়ে গলি। তারই একটির পেটের ভেতরে ছোট্ট একটা বাড়ি ছিল। একতলা বাড়ি, প্রায় ভেঙ্গে পড়া দেয়াল। একতলা বাড়িরে মাথার ওপর টিনশেড, দেয়াল ইঁটের। বারান্দায় রাশি রাশি পাতা পড়ে থাকতো। সেই বাড়ির দরজা জানালা কখনোই খুলতে দেখা যায় নি। বাড়িটাকে ঘিরে আমাদের কৌতুহল ছিল রুদ্ধশ্বাস। শুনি এখানে কেউ থাকে না। কিন্তু দরজার কড়ায় কখনো তালা ঝুলতে দেখা যায় না। তাহলে ভেতরে কে থাকে? আমাদের বন্ধুদের অনেক গল্প ছিলো বাড়িটাকে ঘিরে। কেউ বলতো রাতে বাড়ির ভেতরে আলো জ্বলতে দেখা যায়। কেউ একটু আগ বাড়িয়ে বলতো, সে ভোরবেলা স্কুলে যাবার সময় দেখেছে বাড়ির বারান্দায় একজন মানুষ হাফপ্যান্ট পড়ে ব্যায়াম করছে। প্রতিবেশীদের প্রশ্ন করে জানা গিয়েছিল ওই বাড়িতে ঢাকাই সিনেমার একজন অভিনেতা থাকেন।তারপর আমরা নিয়ম করে অনেক উঁকিঝুকি মেরে গেছি ওই রহস্যময় বাড়ির ফাঁকফোকড়ে। যদি দেখা মেলে সেই অভিনেতার। কিন্তু কোথাও কাউকে দেখিনি। শূণ্য বাড়ি, ঘরের ভেতরে অন্ধকার আর বারান্দায় পড়ে থাকা অজস্র ঝরা পাতা।তাতে আমারা বন্ধুরা নিশ্চিত হয়েছিলাম ওই বাড়িতে ভূতেরই বসবাস আছে। প্রাড়ার লোকেরা কিছুই জানে না। বহুদিন ওই বাড়ির কথা ভেবে গা ছমছম করতো আমার। সত্যি সত্যি ওই অভিনেতাকেও আমরা কোনোদিন দেখতে পাইনি। তাহলে ওই বাড়িতে আসলে কে থাকতো? প্রশ্নটা আজো মাঝে মাঝে মাথায় কড়া নেড়ে যায়।
এরকম কত অদ্ভূত গল্প যে ছড়িয়ে থাকতো এই ঢাকা শহরের অলিতে গলিতে। যেন এমন সব গল্প ছাড়া গলিই হয় না। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ভেতরে ছিল এক মস্ত বড় পুকুর।সেই পুকুর নিয়েও ছড়িয়ে ছিল গল্প। পুলিশ লাইনের ঘোড়ার আস্তাবলের কাছেই ছিল পুকুরটা। লোকে বলতো পুকুরের মাঝখানে জলের অনেক নিচে বিশাল একটা শেকল আছে। ওই শেকল নাকি জ্যান্ত হয়ে পুকুরে নামা মানুষের পা জড়িয়ে ধরে। তারপর টেনে নিয়ে যায় পুকুরের তলায়। সেই পুকুরের নিচে শেকল কিন্তু কেউ কখনও চোখেও দেখেনি। কিন্তু সেই সময়ে বেশ কয়েকজন মানুষ ওই পুকুরে ডুবে মারা গিয়েছিল। তাতে করে শেকলের গল্পটা খুব দ্রুত চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ আর ভয়ে সে পুকুরে নামতো না।
বিশ্বাস করেছিলাম গল্পটা। আজ লিখতে বসে হাসি পাচ্ছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও ভাবছি, কত সরল ছিল তখন আমাদের ভাবনাগুলো।আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে সেই একই শহরে বসে এরকম গল্প কারো চিন্তাতেও ঠাঁই পাবে না। অথচ সেই সময় এসব আষাঢ়ে গল্প নিয়ে চলতো আমাদের জল্পনা কল্পনা। এই বছর কুড়ি আগেও এমনি আরেক ভূতের গল্প ডালপালা মেলেছিল শহরের হাইওয়ে নিয়ে। বিমান বন্দরের দিকে যেতে রাস্তার নিকুঞ্জ নামের জায়গাটায় তখনও এতো বড় বসতি তৈরী হয় নি। খোলা মাঠ, ধানক্ষেত আর এখানে ওখানে মন খারাপ করে একা দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছই ছিল নিকুঞ্জের শূণ্যতার সঙ্গী। রাত বাড়লে হাইওয়েতে তখন এতো গাড়ি চলতো না। থাকতো না যানজটও। তখন প্রায়ই ঠিক নিকুঞ্জের সামনের হাইওয়েতে বাস, গাড়ি আথবা ট্রাক অ্যাকসিডেন্ট করার খবর শোনা যেত। ড্রাইভাররা বলতো দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে যাবার সময় তারা হঠাৎ ঘোড়ায় সওয়ার এক বিশাল আকৃতির মানুষকে রাস্তা অতিক্রম করতে দেখতো। আর তখনই ভয় পেয়ে তাদের গাড়ির ব্রেক বিশ্বাসঘাতকতা করতো। ওই ভুতুড়ে ঘোড়সওয়ারকে আমি কোনোদিন চোখে দেখিনি। দেখার কথাও নয়। কিন্তু বহু মানুষের মুখে মুখে সে কাহিনি সাত কাহন হয়েছিল এই শহরে।
পুরনো ঢাকা তো এক সময়ে এরকম ভূতুড়ে গল্পের কেন্দ্র ছিল। সেখানকার পোড়ো, পরিত্যাক্ত বাড়ি, গলিপথ, বাড়ির ভেতরের কূয়া, তালাবন্ধ ঘরকে ঘিরে ছিল ভূতের গল্পগাছা। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে শুনতাম এখনকার বাহাদুর শাহ পার্কের মোড়ে রাতের বেলা রহস্যময় কালো রঙের ট্যাক্সি নিয়ে বসে থাকতো এক সাহেব। রাতেরবেলা সদরঘাটে কোনো যাত্রী এলে তাকে তুলে নিয়ে সেই সাহেব ড্রাইভার চলে যেতো। সেই যাত্রীকে নাকি আর কেনোদিন খুঁজে পাওয়া যেতো না। সেই ইংরেজ সাহেব ভূতকে নাকি অনেকেই দেখেছিল। অবশ্য সেই মানুষদের কারো সঙ্গেই কারো দেখা হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দোলায় এক শহরের ভূতের গল্প। বড় হয়ে বুঝতে পেরেছি সব মিথ্যে। তবুও সেই অদ্ভূত ভয় পাওয়ার অনুভূতি, ঘাড়ের কাছে শিরশির করে ওঠা সবকিছু এখনো যেন জীবন্ত। স্মৃতির পর্দা সরালেই যেন সেই হারিয়ে যাওয়া সরল এক শহরের মঞ্চে গল্পগুলো জীবন্ত হয়ে উঠবে। জীবন্ত হয়ে উঠবে নির্জন এক শহর, শহরের ছোট ছোট ঘরবাড়ি, অন্ধকারে ঠাসা গলি আর বন্ধ দরজাগুলো। শুরুতেই বলছিলাম, আলোর আগ্রাস বাড়লে ভূতের গল্প পালিয়ে যায়। এই শহরের বেলায়ও তাই ঘটেছে। কিন্তু সেই আমাদের সহজ সরল মন হারিয়ে গেছে এই শহরের লোহার বাসর থেকে। বদলে গেছে মানুষের মন, জীবন আর ভাবনাগুলো।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com