হারানো শহরের প্রেক্ষাগৃহে

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইরাজ আহমেদ

সিনেমা হলের সামনে বিশালা আকৃতির হোর্ডিংয়ে সোফিয়া লরেনের প্রায় উন্মুক্ত শরীর, পিস্তল তাক করে দাঁড়িয়ে ধাকা ক্লিন্ট ইস্টউড অথবা বিশেষ ভঙ্গীতে কারাটে কিং ব্রুস লী। বেনহার, টু উইমেন, বুচ ক্যাসেডি অ্যান্ড সানডেন্স কিড, লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া, ডার্টি হ্যারি,এন্টার দ্যা ড্রাগনের মতো একের পর এক সিনেমা আমাদের মুগ্ধ দৃষ্টির সামনে দিয়ে যেন বয়ে চলে যেত। হলের কাউন্টারের সামনে বিশাল লাইন চলে গেছে রাস্তা পার হয়ে।গরমের দুপুরে ধাক্কাধাক্কি, মারামারি, ব্ল্যাকারদের নির্বিকার মুখ, হল্লা, হয়তো কখনো বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে হাতের মুঠোয় পাওয়া একটা টিকেট-ঢাকার একসময়ের সিনেমা হলের পরিচিত দৃশ্য। কোথায় সেসব দৃশ্য এখন, কোথায় সেই ভীড় আর মানুষেরা? হারিয়ে গেছে। বদলে যাওয়া সময় মুছে দিয়েছে দৃশ্যগুলো। সাজানো গোছানো থিয়েটার হল, পপকর্ণ আর সফট ড্রিংকসের ফেনায় উচ্ছা্সে সব অতীত এখন। চিরকালের জন্য উপড়ে তুলে ফেলা হয়েছে এই শহরের ঐতিহ্যবাহী ছবিঘর গুলিস্তানের নাম-নিশানা। উঠে গেছে নাজ নামের পুরনো সেই হল। জৌলুশ হারিয়েছে পুরনো দিনের সেইসব ছবিঘর।

পিতার দৃষ্টি এড়িয়ে প্রথম একা একা হলে গিয়ে সিনেমা দেখা ১৯৭৯ সালে। সিনেমার নাম ছিল ‘ক্যাসেন্ড্রা ক্রসিং’। সোফিয়া লরেন আর রিচার্ড বার্টনের অভিনয়ে অসাধারণ এক থ্রিলার। আমি ইংরেজি সিনেমা বেশী দেখতাম। জোনাকী সিনেমা হলে তখনও ইংরেজি সিনেমা মুক্তি পেতো। মধুমিতা, অভিসার, নাজ আর গুলিস্তান স্বমহিমায় উজ্জ্বল। বাংলাদেশের সিনেমা শিল্প তখন বেশ শক্তিশালী। রাজ্জাক, ববিবতা, কবরী, ওয়াসিম, ফারুক প্রবল প্রতাপে রাজত্ব করছেন। তাদের সিনেমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতো পৃথিবী বিখ্যাত সব ইংরেজি সিনেমা।

আমরা ভুলেই গেছি আশির দশকেও এই শহরে সিনেমা হলকে বলা হতো প্রেক্ষাগৃহ। তখন দু একটি হল ছাড়া অন্য কোথাও ছিলো না এখনকার মতো ছিমছাপ পরিবেশ, অদ্ভূত লাল, নীল আলো, সম্ভ্রান্ত নিরিবিলি পরিবেশ। রোববার এবং পরে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে আমরা হুমড়ি খেয়ে পড়তাম দৈনিক পত্রিকায় বিশেষ করে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার শেষের পৃষ্ঠা। বড় বড় সাইজে সিনেমার বিজ্ঞাপন ছাপা হতো। পরের সপ্তাহের সিনেমার কথাও জানিয়ে দেয়া হতো।এসবই ছিলো একটা সময়ে এই শহরে সিনেমা হলের অনুষঙ্গ। সব মিলে এক অদ্ভূত শিহরণ।

ঢাকার প্রেক্ষাগৃহে টিকেট ব্ল্যাকার সম্প্রদায়কে এখন আর দেখা যায় কি না আমার জানা নেই। তবে এটুকু বলতে পারি দেখা গেলেও সংখ্যায় খুবই কম হবেন তারা। একটা হল একটা এলাকার মাস্তানরা দখল নিয়ে নিতো টিকেট ব্ল্যাকের জন্য। তাদেরই নিয়োজিত কিছু গরীব মানুষ এসব টিকেট বিক্রি করতো চড়া মূল্যে। মাস্তানরা সিনেমা মুক্তি পাবার আগের দিন বেশীরভাগ চিকেট কিনে ফেলতো। সেগুলো চলে যেতো ব্ল্যাকারদের হাতে। তারপর হলের কাউন্টারে দুপুরের পর ঝুলিয়ে দেয়া হতো হাউজফুল নোটিশ। টিকেট না পেয়ে মারামারির ঘটনা তখন হলগুলোতে লেগেই থাকতো।

মনে পড়ে টিকেটের জন্য প্রথম মারামারি করেছিলাম মধুমিতা সিনেমা হলে।সিনেমাটা ছিল ব্রুস লী অভিনীতি এন্টার দ্যা ড্রাগন। পৃথিবী জুড়েই ধুন্দুমার হিট সিনেমা তখন এন্টার দ্যা ড্রাগন। আমরা একদল তরুণ গেছি দেখতে। হলের সামনে মানুষের দীর্ঘ লাইন।সময়টা আশির দশকের শুরু। রিয়ার স্টলের টিকেটের মূল্য ছিল খুব সম্ভবত সাড়ে চার অথবা সাড়ে সাত টাকা। ড্রেস সার্কেল বা ডিসি সাড়ে দশ টাকা। অর্থের আনুকূল্য বেশীরভাগ সময় না থাকায় নিচের তলায় রিয়ার স্টলে সিনেমা দেখতে হতো আমাদের। সেদিনও প্রচন্ড ভীড় ঠেলে ভেতরে পা রেখে জানা গেলো টিকেট নেই। তারপর কোমরের বেল্ট খুলে শুরু হয়েছিল আমাদের মহড়া। মারামারিতে সেদিন টিকেট পাওয়া সম্ভব হয়েছিল কি না মনে নেই তবে পুলিশের তাড়া জুটেছিল কপালে।এরপর এরকম মারামারির সঙ্গে অনেকবার জড়িয়ে গেছি।মধুমিতা অথবা অভিসার হলের ব্ল্যাকার সম্প্রদায়ের সঙ্গে আমাদের এক ধরণের সখ্য তৈরী হয়ে গিয়েছির। অনেক সময় শো শুরু হওয়ার আগ মুহূর্তে সিনেমা দেখার জন্য পাড়ার বন্ধুরা আমরা দলবেঁধে হাজির হলে ওরাই রিয়ার স্টলে অথবা ফ্রন্ট রোতে আমাদের বসার ব্যবস্থা করে দিতো। তখন তো আর এই সময়ের মতো ইন্টারনেটে সিনেমার টিকেট আগাম বুক করার সুযোগ ছিলো না।

নতুন আর পুরনো ঢাকার সংযোগস্থল গুলিস্তানের মোড়। সেখানে নাজ সিনেমা হলে বেশীরভাগ সময় চলতো ইংরেজি সিনেমা। পুরনো ঢাকার লায়ন, শাবিস্তান আর আজাদে বেশীরভাগ সময় মুক্তি পেতো চীনা কুংফু কারাতে মার্কা ছবি। কাঠের চেয়ার, নষ্ট ফ্যান আর দর্শকদের হৈ হল্লার মধ্যে বসে সিনেমা উপভোগ করা। তখন মাঝে মাঝে ইলেকট্রিসিটিও চলে যেতো সিনেমা চলার মাঝখানে।

মধুমিতা সিনেমা হলের পাশের গলিতে ছিলো ব্ল্যাকারদের আড্ডা।গলিটার মুখে ছিল একটা চটপটির দোকান।সিনেমা দেখার আগে অথবা পরে ফুচকা খাওযা হতো সেই দোকানে বসে। গুলিস্তান সিনেমা হলের পাশে ছিল ঢাকার আরেক বিখ্যাত খাবারের দোকান ‘পূর্নিমা স্ন্যাকবার’। বিশাল সাইজের জিলাপি আর শুকনো ভাজা মুরগির রান বন রুটিতে ঢুকিয়ে দিয়ে বার্গার-এই ছিলো পূর্ণিমার বিখ্যাত খাবার। জিলাপি ভাজার গন্ধে হল লাগোয়া ফুটপাতের বাতাস ভারি হয়ে থাকতো। সিনেমা দেখে বের হয়ে বহুদিন পূর্ণিমার সামনে দাঁড়িয়ে জিলাপি খেয়েছি। সম্ভবত সেই দোকানটাও এখন উধাও।

র‌্যাকুয়েলস ওয়েলচ অভিনীত হান্ড্রেড রাইফেলস সিনেমা দেখার জন্য বাড়ি থেকে টাকা সরিয়েছিলাম। তখন আমার লুকিয়ে সিনেমা দেখার টাকা জোগাড় হতো দাদুর ব্যাগ থেকে। একবার পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে ভুলে সিনেমার ছেঁড়া টিকেট রেখে মার খেয়েছিলাম মায়ের হাতে। আমার প্রয়াত অনুজও ছিল সিনেমা দেখার পোকা। মনে আছে ছোটবেলায় বিভিন্ন সিনেমা হলের ফোন নম্বর জোগাড় করে ও ফোন করে জেনে নিতো নতুন সিনেমার নাম। তারপর চলতো পিতার ওপর সিনেমাটা দেখানোর জন্য চাপ প্রয়োগের প্রক্রিয়া।

তখন সিনেমা হলের ভেতরে শো শুরুর আগে চমৎকার সুগন্ধী স্প্রে করে দেয়া হতো। তরুণ বয়েসের সেই ঘ্রাণ আজো নাকে লেগে আছে। হলের ভেতরে ঢুকলেই সেই গন্ধটা এক ধরণের আলাদা অনুভূতি তৈরী করতো। সেই হারানো অনুভূতিটা আজো বুকের মধ্যে নিয়ে ঘুরি। এখনকার ঢাকা শহরের অভিজাত সিনেমা হলে যাই সিনেমা দেখতে। কিন্তু সেই সময় আর সেই উত্তেজনা কোথাও আর ধরা দেয় না। হয়তো বয়স হয়ে গেলো, পুরনো হয়ে গেলাম এই শহরে। তবু এখনো সেই অনির্বচনীয় আনন্দের অনুভূতিটা স্মৃতির গভীরে দাগ কেটে বসে আছে।
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com