হাকিমে চলে আসিস

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইরাজ আহমেদ

এক ছিল মাঠ। তার দুদিকে লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা সীমানা প্রাচীর। একদিকে বিশাল তিনতলা এক ভবন। সামনে দিয়ে চলে গেছে সাদা অ্যাসফল্টের সামান্য ভাঙ্গা রাস্তা। মাঠে শীত ছাড়া অন্য সময়ে সবুজ ঘাস মাটি কামড়ে থাকে। লোহার সীমানার আগে কাঁটা মেহেদির ঝোপ। এই মাঠের একপাশে বড় রাস্তার দিকের সীমানা ঘেঁষে ছোট্ট্ ছন্নছাড়া এক চায়ের দোকান,মাথার ওপর কাঠবাদাম গাছের ছায়া। দোকানের মালিক হাকিম মিয়া, আমাদের হাকিম ভাই।

আশির দশকের সূচনালগ্নের কিছু আগে থেকে (যতদূর মনে পড়ে) হাকিম ভাইয়ের এই চায়ের দোকানের গোড়াপত্তন হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী লাগোয়া মাঠের এক কোণায়। তার আগেই লাইব্রেরী ভবনের পেছনে শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন প্রায় কিংবদন্তীতুল্য হয়ে উঠেছিলো। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে হাকিম ভাই ছিলো এক প্রিয় নাম। তার চায়ের দোকান ঘিরে আড্ডার সুঘ্রাণ এতোটাই বিস্তারিত হয়েছিলো যে এই মাঠের নাম হয়ে গিয়েছিল হাকিমের মাঠ। আশির দশকের মাঝামাঝি কোন এক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই চায়ের দোকান তুলে দিতে চাইলে  ছাত্ররা প্রতিবাদ করে। ঘটনা গড়ায় স্বারকলিপি দেয়া পর্যন্ত।

হাকিম চত্বর

পুরো বিষয়টি সংগঠিত করেছিল প্রয়াত কবিবন্ধু শিমুল মোহাম্মদ।
সামরিক স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের দীর্ঘ অপচ্ছায়ার সময়টাতে আন্দোলন, মিছিল, খুন, পুলিশের গুলি আর ভালোবাসায় হাকিম ভাই আর তার চায়ের দোকান ছিল যেন এক দ্বীপ। টানা আট বছরের বেশী সময় হাকিমের মাঠে আড্ডা দিয়েছি।
হাকিম ভাই এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন বেশ অনেক বছর আগে। কিন্তু আমি তাকে আজো দেখতে পাই। মাঝারি গড়ন, মাথায় চুলের স্বল্পতা নিয়ে হাসিমুখের আমাদের হাকিম ভাই। খুব ভোরে কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজির হলে দেখতাম দুটো কেরসিনের চুলা জ্বালিয়ে হাকিম ভাই বসে আছেন। চুলার ওপর কেতলিতে পানি ফুটছে। লাইব্রেরীর গেটে রিকশা ছেড়ে হাকিম ভাইয়ের দোকানে বসে এক কাপ চা দিয়ে তখন আমাদের অনেকেরই দিন শুরু হতো।ছোট ছোট চায়ের কাপ বড় একটা গামলার মধ্যে ডোবানো। পাশেই প্রায় ভাঙ্গা একটা কালো রঙের ছোট আলমারি জাতীয় একটা স্থাপনা। তার ভেতরে বিস্কুটের কৌটা। পান খাওয়া দাঁত ছিল হাকিম ভাইয়ের। কিন্তু সবসময় তার মুখে হাসি লেগে থাকতো।
অনেক গল্প হতো হাকিম ভাইয়ের সঙ্গে। বিশেষ করে দুপুরের দিকে আমাদের গল্প জমে উঠতো। তখন মধাহ্নের বিরতিতে বন্ধুরাও হয়তো ছিটকে পড়েছে এদিক-সেদিক। আমারও কিছু করার না থাকলে হাকিম ভাইয়ের দোকানের একপাশে ফেলে রাখা কংক্রিটের স্ল্যাবটাতে বসে থাকেতাম। কত যে গল্প হতো এই মানুষটার সঙ্গে। গ্রামের গল্প, বাড়ির গল্প, আমার নিজের জীবনের গল্প। হাকিম ভাই পরম ভালোবাসায় চা আর বিস্কুট এগিয়ে দিতো। ওই আড্ডার চায়ের বিল কখনো নিতো না হাকিম ভাই। তখন মোবাইল ফোনের প্রাদুর্ভাব ঘটেনি সমাজে। হাকিম ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলো আমাদের সবার পোস্টবক্স। যার যা খবর, কাউকে কিছু বলার থাকলে সেটা হাকিম ভাইকে বলে যেতাম। সারাদিনে কোন একটা সময়ে সেই বিশেষ মানুষের সঙ্গে আমার দেখা না হলেও হাকিম ভাইয়ের ঠিক কীভাবে যেন দেখা হয়ে যেত। ব্যাস, খবর পৌঁছাতো যথাস্থানে।
আশির দশকে আন্দোলনে উত্তাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু সশস্ত্র ক্যাডারকে দেখেছি হাকিম ভাইয়ের কাছে অস্ত্র রেখে যেতে।

হাকিম ভাই

হাকিম ভাইয়ের বিখ্যাত চিনির পোটলায় নিরাপদে পুলিশের চোখ এড়িয়ে ঘুমাতো পিস্তল। প্রেমিকাকে দেয়ার জন্য বিশেষ কোন তথ্য চিঠির আকারে লিখে রাখা হতো হাকিম ভাইয়ের ডাকবাক্সে।সেই নারীকে দেখলেই তার কাছে সরবরাহ হয়ে যেত চিঠি অথবা খবর। আমি নিজেও এমন অনেক বার্তা রেখে যেতাম হাকিম ভাইয়ের কাছে।বন্ধু অথবা বান্ধবীরাও অনেক সময় আমাকে ক্যাম্পাসে খুঁজে না পেলে খবর নিত হাকিম ভাইয়ের কাছে।    হাকিম ভাই মাঝেমধ্যেই বেশ রঙচঙে শার্ট পরতো। লুঙ্গি আর শার্ট এই ছিল তার প্রধান পরিধেয়। মাঝে মাঝে এই রংদার জামার রহস্য জানতে চাইলে মিটিমিটি হেসে হাকিম ভাই বলতো, ‘আপনেরা পড়বেন, আমার পড়তে মন চায় না?’ইতিহাসের সাক্ষী ছিলো আমাদের হাকিম ভাই। এখন মনে হয় হাকিম ভাই বেঁচে থাকলে তার ওপর একটা বই লিখে ফেলা যেত। নিজের চোখে বহুকিছু দেখেছিল হাকিম ভাই। খুন, সংঘাত, মিছিল, ষড়যন্ত্র, প্রেম, নেশাখোর যুবক, মাতাল, দুঃখী মানুষ। বিখ্যাত সব চরিত্র। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এসব নিয়ে হাকিম ভাই কখনোই আগ বাড়িয়ে গল্প করতো না। প্রয়োজনীয় তথ্যটুকু ছাড়া অন্যকোন খবর তার কাছ থেকে অন্য কানে সরবরাহ হতো না কখনোই। মাঝে মাঝে বিপদের আগাম বার্তা দিয়ে সাবধান করে দিত হাকিম ভাই। একবার মধ্য আশির কোন এক সময়ে সকালবেলা সবেমাত্র হাকিম ভাইয়ের দোকানের সামনে এসে চায়ের অর্ডার দিয়েছি। হাকিম ভাই দ্রুত ইশারায় জানিয়ে দিলো এলাকা ত্যাগ করতে। আমার সঙ্গে আরেকজন বন্ধু ছিল। আমরা হাকিম ভাইয়ের ইশারা পেয়ে দ্রুত মাঠ ত্যাগ করেছিলাম। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের ক্যাডাররা হামলা চালিয়েছিল মাঠে।
হাকিমের মাঠ বা চত্বর বলেই মুখ-চলতি নাম হয়ে গিয়েছিল জায়গাটার।মাঠের মাঝখানে এক বিশাল গাছ। সেই গাছের চারপাশে নানা ভাগে নানা ধরণের আড্ডা চলতো সকাল থেকে রাত অবধি।এখন শুনেছি সেই গাছের গায়ে ‘হাকিম চত্বর’ লেখা সাইনবোর্ড ঝোলে।সকালের দিকে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ভীড় থাকতো। বেলা বাড়লেই মাঠের দখল চলে যেত ক্যাডারদের হাতে। সেখানে তখন দাঁড়িয়ে থাকতো মোটর বাইক আর কঠিন চোয়ালের যুবকেরা। ওই সময়ে কবি-গল্পকারদেরও আড্ডা বসতো মাঠে। সে আড্ডায় থাকতো আজকের অনেক নামকরা সাংবাদিক। তখন তারা ছিলেন দেশের নানা সংবাদপত্রের বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা।
বিচিত্র সব মানুষজন আসতেন এই মাঠে আড্ডা দিতে।কখনো চোখে পড়ত মাঠে বসে আছেন কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ আর অভিনেতা হাবিবুল হাসান। কখনো সে আড্ডায় প্রয়াত সাংবাদিক মিনার মাহমুদ, গল্পকার ইসহাক খান, সৈয়দ কামরুল হাসান, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত অধ্যাপক আনিস রহমান, সাংবাদিক খায়রুল আনোয়ার মুকুল, প্রয়াত সাংবাদিক আহমদ ফারুক হাসান, কবি ও অভিনেতা মেহেদী আল আমিন, সাবেক সাংবাদিক মালিক আল ইমরান। আসতেন প্রখ্যাত প্রয়াত গায়ক হ্যাপী আখন্দ, কখনো কথাশিল্পী মঈনুল আহসান সাবের।
এই মাঠের টানে আসতেন কবি জাফর ওয়াজেদ, চলচ্চিত্রকার জাহেদুর রহিম অঞ্জনসহ আরো কত চেনা মুখ। হাকিম চত্বরে নিয়মিত আড্ডাধারীদের মধ্যে ছিলেন, কবি ইস্তেকবাল হোসেন, শ্যামল জাকারিয়া, প্রয়াত কবি শিমুল মোহাম্মদ, তারিক সুজাতসহ আরো বহু কবি-লেখক। স্মৃতির দুয়ার খুলে দিলে এই তালিকা লিখে শেষ করা যাবে না। হাকিম ভাইয়ের মাঠে বহু রাজনৈতিক কর্মী ও নেতারাও নিয়মিত আড্ডায় যোগ দিতেন।
হাকিম ভাই সেই ইতিহাসের অংশ এখন। সেই আড্ডা, সেইসব মানুষ সময়ের হাওয়ায় কোথায় ছিটকে পড়েছে কে জানে? শুধু হাকিম ভাইয়ের মাঠ রয়ে গেছে। পড়ে আছে অনেক স্মৃতি ছায়ার মতো, মৃত ছায়া। পুরনো বন্ধুরা এখনো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দেখা করতে চাইলে বলে-হাকিমে চলে আসিস।

ছবিঃ সংগৃহীত, গুগল     

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com