হলিডেতে স্কটল্যান্ড

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নূরুজ্জামান মনি

এক.

আজ ফুরফুরে মেজাজে পোহালো স্কটল্যান্ডের রাত। আকাশ ধীরে ধীরে ঘন নীল হয়ে ফুটতে লাগলো। লোমশ ভেড়ার পালের মতো মেঘগুলোকে তাড়িয়ে নিয়ে যেতে লাগলো কোনো এক অদৃশ্য রাখাল। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ভাবলাম আজ ইচ্ছেমতো ঘুরে ঘুরে সব দেখা যাবে। একটু একটু করে সকালের রোদ বিস্তৃত মাঠের সবুজ ঘাসে তার সোনালি চাদর বিছাতে লাগলো। পাখিরাও আজ যেন বড় দিলখোলা। জানালার অদূরে গোলাপি বুনো ফুলগুলো বাতাসে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে যেন বলছে, আর দেরি করছো কেন? তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ো।

সবাই তড়িঘড়ি তৈরি হয়ে গাড়িতে লাফিয়ে উঠলাম। লাঞ্চের সামগ্রী গুণে গুণে কয়েকটি স্যাণ্ডউইচ-চা, খাবার পানি-ফিজি ড্রিংকস গাড়িতে তোলা হলো। ক্যামেরা তো সঙ্গে আছেই। বাইনোকুলার পাওয়া গেলো না, তাই একটু আফসোস রয়ে গেলো। আমরা যে ফার্মহাউস রেণ্ট করেছি, এর মালিক আমাদেরকে যেসব জিনিস ব্যবহারের জন্যে দেবার কথা ছিলো, সে তালিকায় বাইনোকুলারও ছিলো। কিন্তু সেটা পাইনি।

যাক, গাড়ি স্টার্ট দেবার আগেই আমরা ঠিক করে নিলাম আজ ফরফার লেক(Loch of Forfar) দেখতে যাবো। স্কটিশ ভাষায় লেককে বলে লক (Loch)।নেভিগেটরে মেয়েলি কণ্ঠের দিক নির্দেশনা ফলো করে আমার ছেলে নিনাদ ডাণ্ডি সিটির উল্টো পথে গাড়ি চালাতে শুরু করলো। “কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা” টাইপ আমাদের গতি। রাস্তার দু’ধারে শুধু সবুজ সবুজ আর সবুজ। বিস্তৃত স্ট্রবেরী-আলু আর কপি ক্ষেত। সবুজ ঘাসের জমিতে নাদুস নুদুস গরু আর মেষের পাল ঘাস খাচ্ছে। কোনো কোনো গরু ঘাসের উপর শুয়ে আলস্যে সকালের রোদ পোহাচ্ছে। কাছে দূরে অত্যুচ্চ অনুচ্চ টিলে পাহাড়। ছিমছাম গোছানো আর সবুজে সবুজে সাজানো।

ঘণ্টা দু’য়েক ড্রাইভের পর আমাদের গাড়ি এসে থামলো এক গভীর জঙ্গলের পাশে। জঙ্গল হলে কি হবে, সেখানেও গোছানো গাড়ি পার্কিং এর জায়গা। আমাদের সঙ্গে আরো কয়েকটা গাড়ি এসে থামলো। গাড়ি থেকে নেমে প্রথমেই লাঞ্চ সেরে নিলাম। অনেক দুর হাঁটতে হবে লেকের পাড়ে যেতে। ডানদিকে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে একটা সরু পায়ে চলা পথ দেখতে পেলাম। সেই সরু পথ ধরে আমাদের হাঁটতে হবে।

জঙ্গলের ভেতরের সরু পথটাতে পা বাড়িয়ে মনটা আরো ভালো হয়ে গেলো।

 দু’ধারে অজস্র বুনো ফুল অভ্যর্থনার ভঙ্গিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। অযত্নে ফুটেছে। কিন্তু কী বিচিত্র-বর্ণিল বুনো ফুলগুলো। পথের দু’পাশে গাছে গাছে চেরি ধরেছে।গাছগুলো কিন্তু কেউ লাগায়নি। আপনিই জন্মেছে। রাশি রাশি চেরিফল কেউ কুড়িয়েও নেয় না। বুনো পাখিদের খাবার এগুলো। এছাড়া ঝোপে ঝোপে থোকা থোকা ব্লুবেরি-রাস্পবেরি ধরে আছে। খুব সুস্বাদু আর পুষ্টিসমৃদ্ধ ফল এগুলো। কেউ এসবের চাষ করে না। আপনা আপনি ঝোপে ঝাড়ে জন্মে। ফল দেয়। পরে ঐ বুনো ফলগুলো প্যাকেটজাত হয়ে বিক্রির জন্য অভিজাত শপে চলে যায়।

বন দেখতে দেখতে আর ছবি তুলতে তুলতে আমরা সম্মুখে পা চালাতে লাগলাম। এক জায়গায় চোঙ্গার মতো সুন্দর বুনো ফুল দেখে হাত বাড়িয়ে তুলতে গিয়ে একটু সমস্যা দেখা দিলো। কিভাবে যে চুতরা পাতা ছুঁয়ে ফেলেছি, খেয়াল করিনি। হাতের চামড়ায় জ্বলুনি শুরু হয়ে গেলো। ব্রিটেনে আসার আগে ধারণা ছিলো ঐ যন্ত্রণাদায়ক আগাছাটা বুঝি শুধু আমাদের দেশেই জন্মে। কিন্তু না। এখানে বনে জঙ্গলে হৃষ্টপুষ্ট চুতরা পাতার গাছ আছে। ছুঁয়ে দিলেই বিপদ। ছোটবেলা আমাদের দেশের সীমান্তঘেঁষা এলাকার কমলাবাগানে কমলা খেতে গিয়ে কত যে চুতরা পাতার যন্ত্রণা সয়েছি তার হিসেব নেই। এখানে এসে জানতে পারলাম, চুতরা পাতা মূলত ইউরোপের আগাছা। এর ইংরেজি নাম Stingy nettles. এই গাছের পাতায় খুব সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম সূচালো কাঁটা থাকে। মানুষ এই গাছের পাতা ছুঁয়ে দিলেই কাঁটাগুলো চামড়ায় বিঁধে যায় আর তীব্র জ্বলুনি শুরু হয়।

ফরফার লেকে শৌখিন মৎস্যশিকারিদের জন্য বড়শিতে মাছ ধরারও ব্যবস্থা আছে। ভাড়ায় বড়শিও পাওয়া যায়। গোটা ব্রিটেনে বড়শি দিয়ে মাছ ধরার নিয়ম দু’টো। কোথাও মাছ ধরে সঙ্গে নিয়ে আসা যায়, আবার কোথাও বড়শিতে মাছ আটকিয়ে শখ পুরো হয়ে গেলে শিকার ফের পানিতে ছেড়ে দিতে হয়। আমাদের হাতে সময় না থাকায় সেই শখ পূরণ করা হয়নি। নতুন কোনো স্পট দেখতে আঁকাবাঁকা বুনো পথে হেঁটে গাড়িতে ফিরে আসি।

ফরফার, ডাণ্ডি

স্কটল্যান্ড

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com