হতে চাওয়া শিল্পীর শিল্পিত অনুভব

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

কনকচাঁপা এক ছিলো একলা মানুষ…তার আশেপাশে অনেকেই ছিলো..কিন্তু বাবা বললেন তোমাকে কোনদিকে তাকালে চলবেনা….বাবার কথা মানতেই হবে…। সবার মাঝেও সে একলা হয়ে থাকে সে একলা একলাই আপন মনে আরো একলা হতে থাকে….এভাবে অনেক দিন পার হয়…সে বাবাকে শুধায় ..বাবা…এই যে আমি একলা হয়ে গেলাম! এবার বলো..এই একাকিত্বের মাঝে নিজেকে আরো একলা করতে কি কি করতে হবে….আর কেনইবা আমি এমন একাকীত্ব মেনে নেবো। বাবা বলে…হে বৎস ..যা কিছু তোমার হোক সব কিছু ভালো হোক…এ আমার একান্ত চাওয়া। তোমাকে বিচ্ছিন্ন করা আমার উদ্দেশ্য নয়…তোমার মনন..শিল্পবোধ ধৈর্য্য সব কিছুকেই শক্তি মান করে গড়ে তোলাই আমার উদ্দেশ্য এবং দায়িত্ব। তারপর বাবা বললেন তুমি হবে মহান শিল্পী। চিত্রকর। তোমার দৃষ্টিশক্তি হতে হবে প্রখর। তোমার ভাবনা হবে নিমগ্ন সাধকের মত শান্ত। তোমার দৃষ্টি হবে চিলের মত তীক্ষ্ণ ….তোমার অনুভব হবে মাটির মত আনকোরা তুমি হবে তোমার ভুবনে প্রথম। তুমি হবে সাদার সাদা। তুমি হবে কালোর মাঝে আধাঁর। একলা মানুষটা সব বুঝে নিলো মেনে নিলো… এবং পৃথিবীর পারিপার্শ্বিক অনেক কিছু থেকেই আলাদা হয়ে গেলো। দিন যায়..মাস যায়..সুই হয়ে যায় ফাল….মাতৃজঠরে বসবাসের মত করে শিল্পী রংয়ের তরলে ভাসে ভাসে দোল খায়…রং হয়ে যায় আলো..আলো হয়ে যায় শব্দ ..শব্দের হয়ে ওঠে কল্পনা ..কল্পনা হয়ে যায় ধ্রুবতারা ..ধ্রুবতারা হয়ে যায় আলোর গতির প্রতিকুলতা…প্রতিকুলতা হয়ে ওঠে আরামদায়ক বাতাস …সেই বাতাসের রেশমী সুতোয় শিল্পী ফুল আঁকতে আকতে শিল্পী হয়ে ওঠে নীলকন্ঠ পাখী। শিল্পীর পথ ধীরে ধীরে রংধনু ধরতে ওপরের দিকে ধায়…..ধীরগতিতে সে পথের ফারাক হতে থাকে পৃথিবীর সঙ্গে….শিল্পীর নিষেধ আছে পৃথিবীর পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে ভাবতে। সে কিছুই ভাবে না..সে অবলীলায় উপরে উঠতে থাকে..রংধনুর রং নিতে আরো আরো ওপরে উঠতে থাকে…যত রং চরায়..ছবি তত সুন্দর হতে থাকে ……যত ছবি সুন্দর হয় শিল্পী ততো কবিতায় পংক্তি আঁকে এভাবে একদিন রংধনুর রং ফুরায়। শিল্পী পেছনে তাকায় …দেখে পৃথিবীর সঙ্গে তার আর কোন সম্পর্কই নাই…পেছনে যাওয়া তার মানা …সে সামনেই তাকায়। দেখে জ্বলজ্বলে এক সূর্য ..তার ভেতর কোটিকোটি রং….সে ভাবে এইতো এতো রঙ! এখান থেকেই আমি ছবি আকার রসদ,ভাবনা, সব পেয়ে যাবো। যেই ভাবা সেই কাজ।শিল্পী সূর্যের দিকে হাত বাড়ায়।হঠাৎ সে অনুভব করে তার সমস্ত উপস্থিতি, ভাবনা,ধারনা, স্বত্বা সব কিছু গলে গলে রেনু রেনু হয়ে সারা মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে।নিজেকে তার খুবই মহান মনে হয়।সারাজীবন একলা থেকে সাধনা করে আজ এভাবেই তার পৃথিবীর সঙ্গে পৃথিবীর বুকে মিশে যাওয়া হলো এবং মেশা সার্থক হল।সার্থক হল জীবন,সার্থক হল সাধনা। এভাবেই শিল্পীর ছবির সৌন্দর্য পৃথিবীতে সব খানে নানাভাবে ছড়িয়ে পড়লো। ফুল আরো সুন্দর হয়ে উঠলো। পাখি আরো রঙ্গিন হয়ে গেলো। গোধুলীর আলো আরো উজ্জল হয়ে গেলো। শিল্পীর মনের ভেতর বসে থাকা বাবা তখন শিল্পী কে বললেন …দেখলে তো..এই একলা হওয়ার শিক্ষা টা তোমাকে কিভাবে সারা পৃথিবীর বুকে স্থায়ী ভাবে ছড়িয়ে দিলো? তুমি যদি এই পৃথিবীর বুকে আগেই মিশে যেতে তো কখনই এভাবে পৃথিবীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশতে পারতে না……. এবার বলো…তোমার এই একলা চলাটাই কি আসলে পৃথিবীর বুকে মিশে যাওয়ার সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি ছিলো না?

ছবি: কনক চাঁপা

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com