সোনায় বাধানো হাত গুলো কোথায় এখন পাই

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

কনকচাঁপা খাদ্য মানুষের জীবনে বড় একটি প্রসঙ্গ। আমি যদিও খাওয়ার জন্য বাঁচিনা, বাঁচার জন্য খাই।তবুও খাওয়ার স্বাদের ভাল মন্দ খুব ভালো মতই বুঝি,কারন সারাজীবন ই আমি ভালো রাঁধুনি দের সঙ্গে বেড়ে উঠেছি। আমার দাদীমার রান্না যেন ভুতের কাণ্ডকারখানা! বিধবা মানুষ, লোকবল নেই কিন্তু তাঁর ভাড়ার ঘর নানান তেজারতি তে ঠাসা।যেন মুদীর দোকান।সেখানে নলেন গুড় থেকে চা পাতা মিছরি থেকে মাওয়া সব গোছানো। আমরা বাড়ি গেলে অবশ্য কিছু বৈয়াম খালি হয়ে যেত।পিঁপড়ার মত খুঁটে খুঁটে চুরি করে খেতাম সব।দাদীমা টের পেয়েও কিছু বলতেন না।যাইহোক, তিনি কখন রান্না করতেন টের পে

শাশুড়ি মায়ের সঙ্গে

তাম না, কিন্তু কি অপূর্ব তার স্বাদ! ভাজা গোসত, মাছ চচ্চড়ি, ঝোলা খিচুড়ি, আটার চাপড়ি,আলুর দম, দুধ পিঠা, দুধ সেমাই এতো মজার ছিল, শুধু আমি না, সবাই অস্থির থাকতো এই খাবার গুলোর জন্য।আর দাদীমার হাতের চা! চায়ের প্রচলন সাধারণ এর মাঝে ছড়িয়েই দিয়েছিলেন আমার দাদী মা।জলপাইগুড়ি থেকে চা পাতা এনে সবাইকে দিন রাত খাওয়াতেন।চায়ের কেটলি চুলা থেকেই নামতোই না।কামলা কিষানরাও এই চা পেতেন।আমার নানী বুজির রান্নাও অন্যরকম মজা ছিল।গরম গরম তুলা তুলা ভাত আর হাজার রকম ভর্তা, আর অদ্ভুত মজার মাছের ঝোল! আহা! মুখে দিয়ে চমকে যেতাম।নানী বুজির ভাত পরিবেশন ছিল খুব গোছানো। সব কিছু গরম,সঠিক মাপে নরম, সেদ্ধ মচমচে কুড়কুড়ে, এবং ঘনত্ব ও সঠিক মিষ্টতা ও হাতের কাছে সহজলভ্যতা! এ যেন বেহেস্ত। পানের বাটা থেকে ঘিয়ের বয়াম,গোলাপি লেবেনচুষ থেকে কাপকেক, সব জাদুমন্ত্র দিয়ে গোছানো। যার সঠিক অর্থ হল যে যা চায় সে তাই পেয়ে যায়।কিন্তু নানীবুজিকে কখনওই গলদঘর্ম দেখিনি।কি হাসিখুশী একজন মানুষ। রান্না মজার ছিল আমার শাশুড়ি মায়ের।ঘন দুধের পিঠাপুলি সেমাই পায়েস পুডিং যেমন অপূর্ব হত তার হাতে তেমনি শুধু লম্বা বেগুনের চচ্চড়ি খেলে মনে হত যেন মাখন মাখা ভাত! যেমন তাঁর কোর্মা পোলাও তেমন তার আচার সস রসগোল্লা! আল্লাহ! এতো মজার খাবার যে খেয়েই মরে যেতে ইচ্ছে হওয়ার মত অবস্থা।সুতার মত করে কুচি করা দুধকদু খেয়ে কেউ বুঝবেইনা এটা সেমাই না লাউ! গরুর গোস্তের নরম ঝোল থেকে ভয়ানক ঝাল পটকা মরিচের আচার সবই মনে হত সাহিত্য।খাওয়ার পর মনে হত এক একটি কবিতা।

মায়ের সঙ্গে

আল্লাহ! দূর দুরান্ত থেকে আত্মিয় এসে বলতেন মামি,চাচী আপনার হাতের খাশির কোরমা! সেই যে যুদ্ধের বছর খেয়েছিলাম এখনো মনে আছে! কেউ হয়তো বলতেন,বুবু,তোমার হাতের সেমাই খেতে এলাম।স্মিত হাস্যে সেই প্রশংসা মেনে নিয়ে আবার আপ্যায়ন এ ব্যস্ত হতেন স্বল্পভাষী শাশুড়ি মা।আর আমার মা? সারাজীবন বেহিসাবি মেহমান আর স্বল্পকায় মানিব্যাগ সামলানো হিমসিম খাওয়া মানুষ আমার মা,কিন্তু খাবারের স্বাদ কখনওই নড়চড় হতে দেখিনি।চাল ফোটা বা ঝোল ঘন হওয়ার হিসাব সব সময়ই কাটা কম্পাসে বাঁধা।আমাদের সিরাজগঞ্জ এর দিকের মানুষ সবসময়ই ভাতে ভর্তা আর মাখা চচ্চড়ি বেশি খেয়ে থাকেন।সেগুলো তো আছেই,এছাড়াও ভুনা ভাজা পিঠা পুলি চা মিষ্টি সবই আমার মায়ের হাতে স্পেশাল হয়ে ওঠে। এতো মোলায়েম দুধের পিঠা, যে কোন চুলাতেই আম্মা পারদর্শী। মুরগীর ঝোলে যে  একটা ভাজা ভাজা সর পড়ে তা মায়ের রান্না ছাড়া কোথাও দেখিনি।তাঁর করলা ভাজি খেলে মনে হবে মিষ্টি কিছু খাচ্ছি।আর ডাল এর গন্ধ! এ আমার দুপুরের সঞ্জীবনী সুধা! আব্বা মারা যাওয়ার পর অবশ্য আম্মা রান্নাই করতে চাননা। তবুও সখ করে বলি,আম্মা আপনি একটু এটা রাঁধেন। তখন দেখা যায় আম্মা যেন কিছু একটা চড়িয়ে হাত টা জাস্ট পাতিলের উপর ঘুরিয়ে আনেন,খাবার হয়ে ওঠে মধুময়। ভেবেছি,সব গুলো হাত একদিন সোনায় বাঁধিয়ে দেবো। হাহাহা!

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com