সেই পথের পাঁচালী

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘পথের পাঁচালি’ সিনেমা‘র ৬২ বছর অতিক্রান্ত হলো। ১৯৫৫ সালের ২৬ আগস্ট সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল। তার পরের গল্প তো ইতিহাসে বিস্তারিত। প্রখ্যাত কথাশিল্পী বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি ‘পথের পাঁচালি’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সত্যজিৎ রায়ের এই সিনেমা গোটা পৃথিবীতেই চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে আজো ভীষণ ভাবে সমাদৃত।

নিজের প্রথম সিনেমা নির্মাণ করতে গিয়ে অর্থ সংকটে পড়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। টাকার অভাব ছবিটি তৈরী করতে তিন বছর বাড়তি সময় নিয়েছিলো। কম বাজেটে অপেশাদার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দিয়ে ছবিতে অভিনয় করিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। এই সিনেমার অাবহসঙ্গীত তৈরী করেছিলেন প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ রবিশংকর। তিনি প্রথমবার এখানে ভারতীয় রাগ সঙ্গীতকে ব্যবহার করেছিলেন।

অনেক খুঁজে সত্যজিৎ রায়ের সহকারী বংশী চন্দ্রগুপ্ত উপন্যাসের সেই নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের আদলে একটি গ্রাম আবিষ্কার করেছিলেন। কলকাতার কাছে তৎকালীন গড়িয়ায় বোড়াল নামে একটি গ্রামের সন্ধান পান তিনি। যার সঙ্গে সাদৃশ্য আছে বিভূতিভূষণের নিশ্চিন্দপুরের। গ্রামটি পছন্দ হয়েছিলো পরিচালকের। তারপর সেখানেই শুরু হয় ‘পথের পাঁচালির শ্যুটিং।সেই বোড়াল গ্রাম এখন কেমন আছে? ৬২ বছর পরে সেই ভূগোল, সেই প্রকৃতি কতটা বদলে গেছে? এসবের সুলুক সন্ধান করতেই সম্প্রতি জার্মানির রেডিও ‘ডয়েচে ভ্যালে’-এর পক্ষ থেকে অনুসন্ধান চালানো হয়। তারা সম্প্রতি প্রকাশ করেছে সেখানকার বর্তমান সময়ের ছবি। প্রাণের বাংলার পাঠকদের জন্য সেই তথ্য ও ছবি পুনঃপ্রকাশ করা হলো।

 সেই বোড়াল গ্রামে উপন্যাসের সব উপাদানই ছিলো এক রেল লাইন ছাড়া। সেই গ্রামে পরে প্রতিষ্ঠিত হয় সেই অসাধারণ চলচ্চিত্রকারের মূর্তি। এখান থেকে ৫০ মিটার দূরেই বিভুতিভূষণ কথিত হরিহর-সর্বজয়ার কুটিরের অবস্থান।

বোড়াল গ্রামে বসবাস ছিল মুখোপাধ্যায় পরিবারের। সেই বাড়িতেই সিনেমায় ‘পথের পাঁচালী‘র চরিত্ররা বসবাস করেছে। অথচ কালের দীর্ঘ যাত্রায় সেই বাড়ির এখন ভগ্নদশা। কোন সংস্কারও নেই।

এই বাড়িটি সেই আমলে সত্যজিৎ রায় শ্যুটিংয়ের জন্য ভাড়া নিয়েছিলেন মাসিক ৫০ টাকার বিনিময়ে। ভাঙ্গাচোড়া বাড়ির কাঠামোর মধ্যেই একটি ঘরকে তিনি ব্যবহার করেছিলেন ইন্দিরা ঠাকুরনের বসবাসের জায়গা হিসেবে। বাকী ঘরগুলো নিজেই তৈরী করেছিলেন সেট হিসেবে। এখন সেই বাড়িতে উঠেছে পাকা বাড়ির কাঠামো।

যারা পথের পাঁচালী দেখেছেন তাদের নিশ্চয়ই মনে আছে বাড়ির ভেতরের ছোট্ট্ উঠানের কথা। বহুবার অপুকে দেখা গেছে উঠানে খেলা করতে।সেই উঠানের এখন  ভিন্ন অবয়ব।

ছবিতে ঝোপঝাড় মোড়া জায়গাতেই ছিল সর্বজয়ার সেই তুলসীমঞ্চ। সময়ের পরিবর্তনে ডালপালায় ঢেকে গেছে সেই মঞ্চের চিহ্ন।

মুখোপাধ্যায় পরিবারের বাড়ির কাছেই ছিল এক পুকুর। দর্শকদের ভুলে যাবার কথা নয়। সেই পুকুরে অপু বোন দূর্গার মালা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। পুকুরটি এখন আর ব্যবহৃত হয় না। ছেয়ে গেছে আগাছার জঙ্গলে।

১৬৯৮ সালে তৈরী হওয়া মন্দির। সত্যজিৎ রায়ের অমর সৃষ্টিতে এই মন্দিরটি বহুবার দেখানো হয়েছে। আজো মেন্দিরের মাথায় ঘাসের জঙ্গল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মন্দিরের কাঠামোটি। পেছনের দেয়ালে অবশ্য নতুন রঙের পোঁচ চোখে পড়ছে।

‘লেবুর পাতায় করমচা, হে বিষ্টি ধরে যা’ সেই এক বকুল গাছের তলায় বৃষ্টির দিনে আশ্রয় নিয়ে   অপু আর দূর্গা বৃষ্টি থামানোর মন্ত্র পড়েছিল। সেই ছায়া বিস্তার করা বকুল গাছ আর নেই। কেটে ফেলা হয়েছে। তবে গ্রামের মানুষ গাছটির স্মৃতি রক্ষা করতে চেষ্টা করেছে।

উপন্যাসে ইন্দিরা ঠাকুরনের মৃত্যুর ঘটনায় বাঁশবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সত্যজিৎ রায় তাঁর সিনেমায়ও বাঁশবনকে প্রায় একটি চরিত্রের মতো উপস্থাপন করেছিলেন। মুখোপাধ্যায় বাড়ির কাছেই সেই বাঁশবনও এখন উজাড় হয়ে যাচ্ছে প্রায়।

সিনেমার সেই ভাঙ্গা দেয়াল এখনো আছে। কিন্তু ছবি জানাচ্ছে  সেই দেয়ালের ওপর দিয়ে এখন উঁকি দিচ্ছে এসি। দেয়ালটি হয়ে পড়েছে আরো জীর্ণ।

উঠানের জবা গাছটি আজো রয়ে গেছে । কালের যাত্রা তাকে মুছে দিতে পারেনি। শুধু বদলে গেছে সেইসব চরিত্র।

বিনোদন ডেস্ক
তথ্যসূত্র ও ছবিঃ ডয়েচে ভ্যালে (বাংলা)  

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com