সেই ঈদ-এই ঈদ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মোগলদের শাসনকাল শুরু হওয়ার আগে ঈদ উৎসব আলাদা ভাবে পালিত হতো না। ঈদ উৎসবের সূচনা হয় মোগল আমলে। তাদের আগে মুসলমানদের সংখ্যা খুব একটা বেশী ছিলো না। ফলে ঈদকে নিয়ে থাকত না আলাদা কোনো উৎসাহ ও আয়োজন।
১৬১০ সালে ঢাকায় মোগল রাজ্য শুরু হয়। আর মোগলদের সঙ্গে আসে প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং সামরিক বাহিনী মিলিয়ে আনুমানিক ৫০ হাজার মানুষ, এসেছিল বিশাল সংখ্যক বিভিন্ন পেশাজীবী এবং তাদের পরিবার-পরিজন।আর তখনই শুরু হয় ‘ঈদ’ পালনের উৎসব। মোগলদের ঈদ উদযাপন হতো দু-তিনদিন ধরে। চলত সংগীত ও নৃত্য পরিবেশন। বিশাল আকারের মেলা বসত।সন্ধ্যায় যখন মোমবাতির আলোয় আলোকিত হতো মোগল আমলের ঢাকা শহর, শেষ রোজার সন্ধ্যাকাশে উঠত ঈদের চাঁদ। শিবিরে বেজে উঠতো শাহী তূর্য (রণশিঙ্গা) এবং গোলন্দাজ বাহিনী গুলির মতো একের পর এক ছুঁড়তে থাকতো আতশবাজি।সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলত এই আতশবাজির খেলা। শেষরাতের দিকে বড় কামান দাগা হতো। সে সময় ঢাকাবাসী বাদশাহী বাজার (বর্তমানে চকবাজার) থেকে ঈদের কেনাকাটা সারতেন।
সমসাময়িক মোগল লেখকদের স্মৃতিকথায় মোটা দাগে ঈদ উৎসবের নানা কথা লেখা আছে। সেখানে মেলা নিয়ে বিস্তারিত কিছু নেই। তারপরেও ধরে নেওয়া যায়, পারস্যের সংস্কৃতিচর্চা করা সেসব মোগলরা ঈদে মেলার আয়োজন করতো। ‘নওরোজ’ (পারস্যের নববর্ষ) পালনের সময় যে মেলার আয়োজন করতো সে সূত্র ধরেই সম্ভবত ঈদের মেলারও আয়োজন করা হতো। মোগলদের আমলে এটা চর্চার ফলে ঢাকায় ঈদে মেলার একটা সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে চর্চাটা চলতে থাকে। এই ঈদ মেলার ধারাবাহিকতা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। মোগল সম্রাটের কাছ থেকে ইংরেজরা বাংলার-বিহার-উড়িষ্যার রাজস্ব সংগ্রহের ভার পায়। ঢাকার নায়েব-নাযিমরা পরিণত হন ক্ষমতাহীন শাসকে। তখন বেশ ম্লান হয়ে আসা ঢাকার জৌলুস ধরার চেষ্টা করা হতো ঈদ ও মহরমের মিছিলের মাধ্যমে। এই মিছিলগুলোর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ঢাকার নায়েব-নাযিমরা। শিয়া মতাবলম্বী হওয়ার দরুণ নায়েব-নাযিমরা ঈদের পাশাপাশি মহরমেরও মিছিল বের করতেন।
সেসব মিছিলে এ দেশীয়দের পাশাপাশি ঢাকায় অবস্থানকারী ইউরোপীয়রাও অংশ নিতো। হাকিম হাবিবুর রহমান, প্রখ্যাত নাট্যকার সাঈদ আহমেদ, আশরাফ-উজ-জামানের স্মৃতিকথায় গত শতকের বিশ-ত্রিশ দশকেও ঢাকায় যে ঈদের মিছিল বের হত তার বিবরণ পাওয়া যায়।
সে শতাব্দীতেই চল্লিশ দশকের দাঙ্গায় এবং অন্যান্য কারণে ঈদের মিছিল বন্ধ হয়ে যায়। উনিশ শতকের শেষের দিকে মুসলমানরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে শুরু করে। এতে মোগল সম্রাজ্যের অংশীদার পরিবারগুলোর পাশাপাশি মুসলমানদের আরেকটি শ্রেণির উত্থান হয়।এদের ঢাকায় আসার ফলে রাজধানীর ঈদ উৎসবে নতুন কিছু সংযোজন হয়েছিল। যেমন বিভিন্ন ধরনের পিঠা, সেমাই ও ঈদের দিনে মেলার আয়োজন।শুধু তাই নয়, তাদের উপস্থিতি ঢাকার ঈদের মেলায় সংযোজন করে গ্রামীণ সংস্কৃতি। ফলে মেলা ঢাকার চকবাজারেই সীমাবদ্ধ রইল না, ছড়িয়ে পড়ল শহরের আশপাশেও।পান্ডুনদীর কাছেই মেলা হওয়ায় নানারকম ব্যবহার্য জিনিসপত্র নিয়ে আশপাশের গ্রামের বিক্রেতারা হাজির হতেন এই মেলায়। বলা যায় এক ধরনের গ্রামীন ও নাগরিক জীবনের মেলবন্ধনেরও সৃষ্টি হতো।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেমন সামাজিক রীতিনীতির পরিবর্তন হচ্ছে, তেমনি পরিবর্তীত হচ্ছে আমাদের ধ্যানধারনা আর উৎসব উদযাপনের রীতি। এই ২০১৭ সালে দাঁড়িয়ে সেই প্রা্চীন সময়ের ঈদ উৎসব উদযাপনের দিকে ফিরে তাকালে অবাক হতে হয়। কত ভিন্নতা এসেছে ঢাকাবাসীর ঈদ উৎসব পালনের রীতিতে। পুরো উৎসবটাই এখন  বাজারমুখী হয়ে পড়েছে। রোজার দিনে কেনাকাটা আর নতুন খাবারের রেসিপির মুঠোয় যেন বন্দী ঈদ। তবে বাংলাদেশের গ্রাম অথবা মফস্বল শহরে গেলে আজো সেই পুরনো ঈদ উৎসবের ছোঁয়া পাওয়া যায়।

হোসেন শাহ
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com