সেইসব মৃত টেলিফোন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইরাজ আহমেদ

আমাদের বাড়িতে পুরনো কালের একটা টেলিফোন সেট আছে। কালো রঙের ভারি ফোন সেট। এই ফোন সেটটা আমি প্রথম দেখি ১৯৬৯ সালে আমার প্রয়াত ফুফু ডা. রুহুল হাসিনের বাড়িতে। ওই আমার প্রথম টেলিফোন সেট হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখা। ফোনটা এখনো সাজানো আছে বাড়িতে অক্ষত অবস্থায়। মাঝে মাঝে সবার আগোচরে রিসিভার তুলে হ্যালো, হ্যালো বলি। ভাবি, ফোনের উল্টোদিকে আমার শৈশবের সেইসব চেনা মানুষের কন্ঠস্বর যদি হঠাৎ শুনতে পাই!
ডায়াল ঘুরিয়ে ফোন করতে হতো তখন। এখনকার মতো বাটন পুশ করে নয়।তারপর লাইন পাবার অনিশ্চয়তা। বৃষ্টি হলেই মাটির তলায় ফোনের বক্স যেতো ডুবে। আর তাতেই কাঙ্ক্ষিত লাইন পেতে বিলম্ব। যে সময়ের কথা বলছি তখন সব বাড়িতে টেলিফোন থাকতো না। তখন বড় রাস্তার ওপর অথবা পাড়ার ওষুধের দোকানেই ছিল জরুরী ফোন করার জায়গা।প্রতিবেশী কারো বাড়িতে ফোন থাকলে সে ফোনও ব্যবহার করা যেত প্রয়োজনে। এই ফোন করাকে ঘিরে তখন তৈরী হতো পারিবারিক যোগাযোগের কালচার। এক বাড়ির গৃহকর্ত্রী ফোন করতে চলে যেতে পাশের বাড়ি। তারপর সেখানে শুরু হতো চা খাওয়া আর গল্প। আমাদের বাড়িতে ফোন এসেছিলো ১৯৭৪ সালে। দোতলা বাড়ির এক তলায় থাকতাম আমরা।তখন অবশ্য সেই ভারি কালো টেলিফোনগুলোর ব্যবহার চলছে শুধু অফিস-আদালতেই। বাড়িতে এলো হালকা ধূসর বর্ণের টেলিফোন সেট। সেদিনের সেই উত্তেজনার অনুভূতিটা এখনো মনে আছে। মিস্ত্রি লাইন লাগিয়ে দিয়ে চলে যাবার পর কতবার যে সেই ফোনের রিসিভার তুলে ফোনের ডায়াল ঘুরিয়েছি তার কোন ইয়ত্তা নেই। তখন সেই দোতলা বাড়িতে অন্য ভাড়াটেদের ফোন ছিল না। সবাই জরুরী যোগাযোগের জন্য আমাদের নম্বরটাই ব্যবহার করতে শুরু করলো।কারো ফোন এলে তাকে ডাকতে যেতে হতো আমাকেই । আর সেই সুযোগে ওই বাড়ির বন্ধুদের সঙ্গে চলতো গল্প।
আরেকটু বড় হতেই বাড়ির ফোনের সঙ্গে যুক্ত হলো প্রেম। আমার না হলেও আশপাশের বাড়ির বড় ভাইদের প্রেমের ফোন আসতে শুরু করলো। বাড়ি খালি থাকলে তারাও ফোন করার জন্য ঢুকে পড়তো। তখন আমাদের পাশের বাড়ির এক বড় ভাই আমাদের ফোন ব্যবহার করে প্রেম করতো। এই প্রেমের নিপীড়নেই বোধ হয় সেই সময়ে আমদানী হলো তালা। আমাদের বাড়িতেও ফোনে লাগানো হলো তালা। তখন এক ধরণের ছোট্ট চৈনিক তালা মিলতো বাজারে। এখন মনে হয়, ফোনে লাগানোর জন্যই হয়তো ওরকম ক্ষুদ্র তালার আবিষ্কার হয়েছিলো। ফোনের ডায়ালে ছোট একটা হুক ছিল। তালাটা ওখানেই আটকে দিয়েছিলেন অভিবাবকরা যেন চাইলেও কেউ ফোন করতে না পারে। কিন্তু আমার সেই পাড়াতো বড় ভাই কী এক অদ্ভূত কৌশলে তালাসহ ফোনের ডায়াল ঘোরানোর পদ্ধতি উদ্ভাবন করে ফেললো।ব্যাস, চললো ফোনালাপ। আসলে প্রেম হয়তো এরকমই, মানে না কোন বারণ।
তখন টেলিফোনের সঙ্গে আরেকটি বিষয় জড়িয়ে থাকতো গভীর ভাবে। তার নাম অপেক্ষা। আরেকটু যখন বড় হলাম নিজেই জড়িয়ে গেলাম ভালোবাসার মানসিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে। তখন সেই অপেক্ষা নামের অনুভূতিটা তাড়িয়ে মারতো। কখন সেই কাঙ্ক্ষিত ফোন আসবে? অথবা কখন বাড়ির লোকের চোখ এড়িয়ে সুযোগ মিলবে একটা ফোন করার।এখন এই শহরে অপেক্ষা পর্বের ওপর যবনিকা পড়েছে। সেল ফোনের কল্যাণে আঙুল ছোঁয়ালেই কল চলে যায় যথাস্থানে। মানুষ চোখের পলক ফেলার আগে পৌঁছায় প্রিয়জনের কাছে। ভিডিও ফোন কলের কল্যাণে পর্দায় ফুটে ওঠে তাদের ছবিও। তাই সেখানে তো মৃত মধুর অপেক্ষা।
এক সময়ে ফোনে ১৪ ডায়াল করলেই শোনা যেতো ঘড়ির সময়। অনেকেরই হয়তো মনে আছে ব্যাপারটা। আশির দশকের একেবারে শুরুতে মগবাজার এক্সচেঞ্জের কোন এক বিভ্রাটের কারণে ১৪ ডায়াল করলে বিভিন্ন নারী-পুরুষকে পাওয়া যেতো তারা অন্য লাইনে কথা বলছে। তখন ওভাবে সবার সঙ্গেই সবাই কথা বলতে পারতো। মজার ব্যাপার হচ্ছে ওই সময়ে বহু মানুষের সঙ্গে বহু মানুষের সম্পর্কও তৈরী হয়ে গিয়েছিল ফোনে।
ফোনের জন্য অপেক্ষার পালা আরেক জায়গায় লম্বা হতো। তার নাম ছিল, ট্রাংককল। বিশেষ নম্বর ঘুরিয়ে এক্সচেঞ্জ অফিসে কল বুক করা হতো অন্য জেলায় অথবা বিদেশে ফোন করার জন্য। নম্বর দেয়ার পর শুরু হতো অপেক্ষার পালা। এক্সচেঞ্জ কখন সংযোগ দেবে। বেশীরভাগ দিনেই কল সংযুক্ত করা যেতো না। সেই অপেক্ষার মাঝে ছিলো স্বজনের উদ্বেগ আর উৎকন্ঠা।
লেখা শুরু করেছিলাম সেই কালো টেলিফোন দিয়ে। আমি মাঝে মাঝে ফোনটার দিকে তাকাই। ভাবতে চেষ্টা করি কত মানুষের কত কথা হয়তো এই মৃত ফোনের তারের সঙ্গে সহমরণে গেছে। যদি সেইসব হারানো কথা শুনতে পাওয়া যেতো আবার। আমি অপেক্ষা করি।

ইরাজ আহমেদ

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com