সেইসব বন্যার দুঃখ আনন্দ মেশানো দিনগুলো

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

কনকচাঁপা কয়দিন ধরে অবিরাম বর্ষণ হচ্ছে।মন টা কেমন যেন বিষণ্ণ। এই বন্যার নিরবচ্ছিন্ন দুর্দশা কজন জানে? আমি সেই সৌভাগ্যবান বা দুর্ভাগা দের একজন যে কিনা বছরের পর বছর এই বন্যাকে কাছে থেকে দেখেছি। মাদারটেক যখন আব্বা বাড়ি করলেন, কথাটা আসলে বলা উচিৎ যে আম্মা বাড়ি করলেন, কারণ জমিটা পছন্দ করেছিলেন আম্মাই আব্বা মোটেও ঢাকা শহর রেখে এই দূর পাড়াগাঁয়ে আসতে রাজী হননি।যাইহোক ওখানকার কোনকিছু সম্পর্কে কিছুই জানতাম না।দক্ষিণ গাঁয়ের প্রধান সড়ক থেকে প্রান চার ফুট নিচু উচ্চতায় জমি যেমন ছিল তেমন রেখেই বাড়ি করা হল।খুব সুন্দর ছোট একটা ছবির মত বাড়ি।কিন্তু বর্ষাকাল আসলেই ঘটলো বিপত্তি। আর সেটা সাধারণ বরষা ছিল না।বন্যা হয়ে পুরো এলাকা প্লাবিত হয়ে গেলো। তখন আমরা খেয়াল করলাম অন্য বাড়ি গুলো আমাদের বাড়ির চেয়ে অনেক উঁচু উঁচু। প্রথমে আমাদের জায়গার নিচু অংশে পানি উঠে তা পুকুরের মত হয়ে গেলো। তাতে অন্য জায়গা থেকে মাছ আসা শুরু করলো।আব্বা নানারকম জাল দিয়ে তা ধরতে লাগলেন।সে এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা।মাছের সঙ্গে নানারকম সাপ ও আনাগোনা শুরু করলো।আমরা তাও মেনে নিলাম।কি অপূর্ব টলটলে পানি,তাকে ভাল না বেসে পারাই যায়না।অল্প অল্প করে সে পানি উঠানে চলে এলো। আব্বার কোন চিন্তা নাই।তিনি।মাছ ধরছেন তো ধরছেনই।আম্মার মুখ থমথমে।ধীরেধীরে পানি ঘরের বারান্দায় উঠলো। মাটির বারান্দা! ক্ষয়ে ক্ষয়ে গেলো চোখের সামনেই।তারপর ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে সেই পানি ঘরে ঢুকলো।ঘরের আসবাব সব এক ইটের ওপর, ধীরেধীরে দুই ইট তিন ইটের ওপর তোলা হল। আব্বা এগুলো কাজে খুবই আনন্দ পেতে লাগলেন।দুই খাটেরর মাঝখানের খালি জায়গাটিতে চৌকি উপর থেকে দোলনার মত বেঁধে দিলেন।কারন এতো ইটের ওপর আর ভারী কিছু তোলা যায়না।পুরাই জলীয় জীবন।সারা উঠান বাঁশের সাঁকো। আর ঘরে এমন অবস্থা যে খাটের ওপর দাঁড়ানো যায়না।ঘর থেকে বেরিয়ে বাচ্চারা আমরা বারান্দার চালে বসে থাকি।ওখানেই নাস্তা খাই,পড়তে বসি।আবার বৃষ্টিতে ভিজি,ঢেউটিনের চালে শুয়ে শুয়ে বৃষ্টি তে ভেজা! আহা! স্বর্গীয় আনন্দ।যাইহোক, আম্মা আব্বাও আনন্দিত, তাদের কখনওই মন খারাপ হতে দেখিনা, মনে হয় উৎসব চলছে অথবা তাঁরা যেন এটাই চাইছিলেন।উঠানে সাঁকোতে বসে মাছ ধরেই আব্বা নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হিসেবে গন্য করে নিতেন।একদিন ঘরের ওই চৌকির দোলনাতে বসে আব্বা বিশাল এক শোলমাছ বড়শী তে ধরলেন।আম্মা চৌকিতে বসে কাটবেন।আব্বা পাশে বসা, বলছেন বুঝেছো মোমেনা— ছোটবেলায় এক দাদী বুড়ির হাতে এমন বড় শোলমাছ ভুনা খেয়েছিলাম,মনে হয় আদা জিরা কিছু দেননি, শুধু হলুদ কাঁচামরিচ দিয়েই রেধেছিলেন।কি যে স্বাদু ছিল সে রান্না! তেমন করেই রাঁধো! আম্মা মাছের আঁশ ছাড়াতে যেই বটিতে ঘষা দিয়েছেন অমনি মাছটা মোচড় দিয়ে পানিতে পালালো! জীবনে আব্বা কত মাছই না ধরলেন কিন্তু ওই মাছের আফসোস তাঁর গেলনা! যাইহোক আমাদের ঘরে যতদিন পানি থাকতো ততদিনই আনন্দ থাকতো। দুর্দশা শুরু হত পানি কমা শুরু করলে।এই পানি কমে যাওয়াকে বলে পানি টান ধরা।টান ধরতেই মাটির মেঝে ভেঙে উঠান ভেংগে পানিতে চলে যেতো। কচুরি পানা পচে তখন আর ঘরবাড়ি বাসযোগ্য থাকতো না।কিন্তু আমরা কোথায় যাবো? ওই পচাগলা পরিস্থিতিতেও অফিস আদালত স্কুল কলেজ করতে হতো।এভাবেই প্রায় বর্ষা বন্যায় অতিবাহিত হয়েছে এবং হচ্ছে আমাদের নিম্নাঞ্চল এর মানুষ গুলোর জীবন।আমি সত্যিকার অর্থে নিজেকে ভাগ্যবানই মনে করি এইসব দুর্দশা কে চাক্ষুষ করতে পেরে।আমি আমার জীবন কে ধন্য মনে করি।

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com