সুকান্ত ও শ্রীজাত একই রেখার রৈখিক

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কোথায় যেন
কবিতা আবার নড়েচড়ে উঠেছে
কুলেশ্বর, কুলদেবতারা ক্ষেপেছে আবার
কবিতাই পারে ভীত নাড়িয়ে দিতে বারবার
কবিতাই পারে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে
কোথায় ফাটল ধরেছে এই সমাজের ভীতে
কবিতা তুমিই শেষাবধি বোধে অবিনশ্বর
ভেঙ্গে দাও প্রথাগত স্রষ্টার দেউলিয়া ঘর।
এই মর্মে কবিতা এবং মানবতার স্বার্থে কিছু কথা বলা। প্রথমেই আনছি কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যকে, যাকে বলা হয় গণমানুষের কবি। অসহায়-নিপীড়িত সর্বহারা মানুষের সুখ, দুঃখ তার কবিতার প্রধান বিষয়। অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের স্বার্থে ধনী মহাজন অত্যাচারী প্রভুদের বিরুদ্ধে নজরুলের মতো সুকান্তও ছিলেন সক্রিয়। যাবতীয় শোষণ-বঞ্চনার বিপক্ষে সুকান্তের ছিল দৃঢ় অবস্থান। তিনি তাঁর কবিতার নিপুণ কর্মে দূর করতে চেয়েছেন শ্রেণী বৈষম্য। মানবতার জয়ের জন্য তিনি লড়াকু ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। অসুস্থতা অর্থাভাব তাকে কখনো দমিয়ে দেয়নি। মানুষের কল্যাণের জন্য সুকান্ত নিরন্তর নিবেদিত থেকেছেন। তিনি মানবিক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বিদ্রোহের ডাক দিয়েছেন। তার অগ্নিদীপ্ত সৃষ্টি প্রণোদনা দিয়ে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে প্রয়াসী ছিলেন। মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কাব্যধারার প্রচলিত প্রেক্ষাপটকে আমূল বদলে দিতে পেরেছিলেন।
এই আমূল বদলে দেওয়ার বিষয়টাকে তৎকালীন তথাকথিত কবি সাহিত্যকেরা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেননি। তাঁরা সুকান্তের কবিতা উচ্চমার্গীয় হয়নি, এতে কাব্যশৈলী খুঁজে পাওয়া যায়নি, (কারণ সুকান্তের কবিতায় প্রায়শই সাধারণ শব্দ উঠে এসেছে) এমনিতর আরো অনেক সমালোচনা হয়েছে। তাই বলে কী সুকান্তের কবিতা থেমে গেছে? তাঁর কবিতা কী কালোত্তীর্ণ হয়নি! সময়ের দাবী নিয়ে এখনো সুকান্তের কবিতা কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ঠিক সেভাবে আজকে শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে সময়কে কুঠারাঘাত করে কবিতা লিখেছেন, সেটাও সময়ের দাবী। দেশ,সমাজ,মানুষকে জাগিয়ে তুলতে, সচেতন করে তুলতে হলে ভাষা শব্দ ছন্দ জ্ঞানের দরকার পড়েনা, দরকার নেই সাহিত্যমানও। দরকার শুধু শব্দবাণে আঘাত করা, যদি আঘাতটা ঠিক জায়গামতো লাগে। সেই কাজটিই হয়েছে শ্রীজাতের কবিতায়। এতে কবিতার মান খোঁজার দায়বদ্ধতা আসে কোথা থেকে! আগে দেশ, মানুষ; নাকি কবিতা! যদি কবিতার সুরেই বের হয়ে আসে এই প্রতিবাদ তাতে কবিতার কী দোষ!? যদিও শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় কবিতা জগতে ইতোমধ্যে তাঁর কাব্যশৈলী দিয়ে নিজস্ব এক আসন তৈরি করে ফেলেছেন। তারপরেও, কিছু অকালকুষ্মাণ্ড কবি শ্রীজাতের কবিতার খুঁত ধরতে বসে গেছেন, কেউকেউ বলছেন দুর্বল পংক্তি বা বাচাল কবিতা কিম্বা সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য এমন কবিতা লিখেছেন।এরা বসে বসে কবিতা লিখে যান, আর কেউ যদি কবিতা দিয়ে ভীত নাড়িয়ে দেন তখন এদের চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যায়। কারণ শ্রীজাত এখন অনেকের মধ্যমণি হয়ে উঠেছেন, এটাই তাদের ঈর্ষার কারণ। তবে আমি শ্রীজাতের পাশেই আছি, শুধু কবি বলেই নয়, মানবতার প্রশ্নে এবং প্রগতির প্রশ্নে ‘অভিশাপ’ কবিতাটি মাথায় তুলে নিলাম।
অভিশাপ
শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
সময়ে ওষুধ, নইলে বেড়ে যায় সবরকম রোগই
ভিখ পেতে পেতে তুমি রাজা হয়ে ওঠো, গেঁয়ো যোগী।
উঠেই নির্দেশ দাও, ধর্মের তলব দিকে দিকে
মৃগয়ায় খুঁজে ফেরো অন্য কোনও ধর্মের নারীকে।
যে–হরিণ মৃত, তারও মাংসে তুমি চাও অধিকার
এমন রাজত্বে মৃত্যু সহজে তো হবে না তোমার।
বাতাসে হাপর নামে, দেশ জুড়ে অধর্মের ছাই…
প্রতি নির্বাচনে আমরা শতাব্দীপিছনে ফিরে যাই।
যেখানে পুরুষধর্ম ধর্ম-পুরুষের অন্য নাম
আর আমি নারীর মৃত্যু পার করেও শিকার হলাম।
আমাকে ধর্ষণ করবে যদ্দিন কবর থেকে তুলে –
কন্ডোম পরানো থাকবে, তোমার ওই ধর্মের ত্রিশূলে!

জয় হোক মানবতার, জয় হোক কবিতার।

(আন্জুমান রোজী কানাডা থেকে)

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com