সিয়েরা নেভাডার অপার্থিব সৌন্দর্যে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শামীমা জামান

র‍্যাঞ্চো করডোভার একটি চীনে রেস্তোরায় ভরপেট খেয়ে নিয়ে আমাদের রওনা দিতে দিতে দুপুরের রোদ বেশ ঝলমলে চেহারা ধারন করে।এই মধ্য মার্চে স্যাক্রামেন্টোতে শীত নেই ।আছে বসন্তের প্রাণ জুড়ানো হালকা শীতল বাতাস । তাই সোয়েটার, জ্যাকেট কানটুপি ছাড়াই স্নো দেখতে যাওয়া । ন্যাটোমাস থেকে রিনোর দিকে হাইওয়ে ফিফটি ধরে ছুটে চলেছে আট সিটের ভ্যানটি ।চালকের আসনে ইনটেল এর সাবেক ইঞ্জিনিয়র রহমান সাহেব দ্যা গ্রেট ভদ্রলোক! গন্তব্য সিয়েরা নেভাডা মাউন্টেইন রেঞ্জ। ওয়েস্টার্ন নর্থ আমেরিকার বিস্তীর্ণ পাহাড়ী বনাঞ্চল। ক্যালিফোর্নিয়া  নেভাডা স্টেট বাউন্ডারির আছে একটি উজ্জ্বল চমকপ্রদ ইতিহাস।সে ইতিহাসে আজ যাবনা।তারচে বরং জানা যাক এ অঞ্চলে ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য কি কি অপেক্ষা করছে। উত্তর থেকে দক্ষিনে লম্বায় চারশো মাইল আর চওড়ায় সত্তর মাইল এ মাউন্টেইন রেঞ্জেই দেখা মিলবে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু গাছ’ দ্যা জায়ান্ট সেকোইয়া ‘।সেকোইয়া প্রজাতির দানবীয়  সুউচ্চ গাছ গুলো বয়সে তিন হাজার পেরুনো বুড়ো কালের সাক্ষী হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। সবচেয়ে বয়স্ক গাছটির বয়স তিন হাজার পাঁচশো বছরের বেশি! সেকোইয়া ন্যাশনাল পার্কে এদের আবাস । আমেরিকার প্রথম ন্যাশনাল পার্ক ইয়োসোমিটি ক্যালিফোর্নিয়ার অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ।ইয়োসোমিটি ভ্যালির ফ্লোরের উচ্চতা প্রায় চার হাজার ফুট।ইয়োসোমিটি ফলস চব্বিশ শো ফুট। স্কটিশ আমেরিকান পরিবেশবিদ ও লেখক জন মুইর প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এর সহযোগিতায় এই ন্যাশনাল পার্ক এর আইডিয়া শুরু করেন। তবে পর্যটকেরা এ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ভীড় করে লেক ট্যাহোতে ।উত্তর আমেরিকার তৃতীয় আর পৃথিবীর ১০তম গভীর লেক।গভীরতা ১৬৪৫ ফিট।আমেরিকার অন্যান্য জলাশয়ের মত লেক ট্যাহোর পানি সাগরে প্রবাহিত হয় না। মোট ৬৩ টি প্রবাহমান জলধারা থাকলেও বহির্গমন প্রবাহ মাত্র একটি আর সেটি রিনো শহরের পূর্ব দিকে ট্রাকি রিভার এবং নেভাডার লেক পিরামিড। লেক ট্যাহোর প্রচুর দর্শনীয় সব স্থানে রয়েছে ক্যাম্পিং করার যাবতীয় আয়োজন। নরডিক স্কিইং ,ডাউনহিল স্কিইং সহ অনেক খেলার সুব্যবস্থা আছে এখানে। আছে বিশ্ব মানের রিসোর্ট ,মোটেল, শপিং সেন্টার ।

    স্কি রিসোর্ট গুলোতে ঝকঝকে তকতকে রেস্ট্রুমের দেখা মিলবে। ভাবছেন বালিশ নিয়ে আরাম করে শুয়ে ভ্রমনের ক্লান্তি মেটাবেন ? না এখানে আপনার বর্জ্যের অপেক্ষায় হা করে আছে সারি সারি কমোড ।আমেরিকানরা টয়লেট কে রেস্ট্রুম বলে কিনা ! চিন্তা কি সকালে খেয়ে আসা পাস্তা বের হওয়ার রাস্তা তো পেল। স্কি রিসোর্ট এর প্রবেশ দারের দু পাশে এক তলা খানিক উচ্চতায় জমা আর্টিফিশিয়াল বরফ  দিয়ে বুঝি ডেকর করা হয়েছে এমনটা ভেবে আয়েশ করে হেলান দিয়ে একটা ঐতিহাসিক সেলফি তুলতে গেলাম।মাইরি বলছি কে যেন আমার পৃষ্ঠদেশ আর পোজ দেয়া বাম হস্ত কেটে নিয়ে যায় ! এত সত্যি বরফ ! বোঝার জন্য বুদ্ধি থাকা চাই মফিজা ।হাতের গায়ের কুচি কুচি বরফ ঝাড়তে ঝাড়তে মিঃ বিন এর মত ইতিউতি দেখতে হচ্ছে পাছে কেউ দেখে না ফেলে,আর তখন ই এক সাদা মিয়ার সাদা  কালো কুকুর  আমার পায়ের কাছে ধন রত্ন শুকতে এলো ।ও মাই গড ,ও মাই গড বলে দ্রুত আমার দলের লোকজনের কাছে গেলাম।সাদা মিয়া হেসে আমায় জানালো তার পাপি মাইন্ড করেছে আমার ব্যবহারে।সে নাকি ভেবেছে আমি তাকে ঘৃণা করছি।

   বরফ বেয়ে উচ্চতায় উঠতে এক পা গর্ত থেকে উঠালে আরেক পা গর্তে ডেবে যায়।আরিক ,আলভী,অয়ন স্নো বল ফাইটে মেতে উঠেছে ।দু বছর বয়সী এক সাদা পরী কে তার বাবা মা বরফের বিছানায় বসিয়ে দিয়ে সেলফি তুলতে ব্যস্ত,বাচ্চাটি মনের আনন্দে স্নো ভর্তা করতে লাগলো দু হাত দিয়ে। দেখলাম এই বাচ্চার মা বাবার চেয়ে ওই ডগি র মা বাবা অনেক বেশি কেয়ারিং তাদের কুকুরছানার ব্যাপারে।কতক ছেলেমেয়ে স্কি করতে করতে উলটে পুল্টে যাচ্ছে ।চারিদিকে ধবধবে সাদা।ঠিক কতটা সাদা চোখ থেকে সানগ্লাস খোলার পর বোঝা গেল।আচ্ছা এতক্ষন কেন সানগ্লাস পরে ছিলাম ! এই সৌন্দর্য এতক্ষন কেন পান করিনি।দিগন্ত বিস্তৃত সাদা পাহাড় আর পাহাড়।মাঝে মাঝে সারি সারি পাইন।আসার সময় পথের দু পাশের আকাশছোঁয়া পাহাড় আর ঘন বনাঞ্চল নিয়ে যাচ্ছিল কোন অপার্থিব সুন্দরের দেশে। এত পাহাড় ,পাহাড়ের পর পাহাড়,তারও পরে আরো পাহাড়। পর্বত ঢাল বেয়ে সারিবদ্ধ পাইন,সিডার,ওক,ফার।শিল্পীর তুলিও এত নিপুন গোছানো হাতে আকেনা । আর আকাশ ।এখান থেকে আকাশ ছোয়া যায়। চারিদিকে এত আনন্দ আর কোলাহল,অথচ চোখ মেলে দুরের পাহাড়,গিরিখাদ ,সাদা আর সবুজে ঢাকা বিস্তীর্ণ স্বর্গীয় সুন্দর ,সন্ধ্যা নামার আগে যেন ভয়ংকর বিষন্ন এক মন খারাপের রাজ্য। চোখে না দেখলে এ অপার্থিব অনুভব বোধ হবার নয়। এখান থেকে আর লোকালয়ে ফিরে যাবার সাধ জাগেনা।মনে হয় কি হবে ওসবে,কেন জীবন? যে মহান শিল্পী এত উজাড় করে এঁকেছ এ বিষন্নতা ,পাহাড় থেকে পাহাড়ে দুরের বনাঞ্চলে তোমায় খুজে পেলেও পেতে পারি। পাহাড়্রের কোলে দাঁড়িয়ে এই যে বিরহ এ কার জন্য?আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সানগ্লাস পরা লোকটির জন্য তো নয়। এই কি ইশক সুফিয়ানা ?

   সন্ধ্যায় পথে কোন মানুষের দেখা মিললো না ।কেবল দু একটি গাড়ি যার যার লাইন মেপে ছুটে যায় রিনোর দিকে। রিনো নেভাডা রাজ্যের ছোট্র শহর। রিনোকে বলা হয় ওয়ার্ল্ড বিগেস্ট লিটল সিটি ! গ্ল্যামার আর মাস্তি।ছোটখাট লাসভেগাস।মোড়ে মোড়ে ক্যাসিনো।রেস্টুরেন্ট।মদ আর নেংটো নারী।  ইয়ে পুরো নেংটো নয় দু এক জায়গায় সামান্য কাপড় অথবা অলংকার থাকে। আমুদে মানুষের যত্রতত্র ভিড় সেখানে। আমরা একটা ক্যাসিনোতে ঢুকলাম ৬তলায় গাড়ি পার্ক করে এসে। উপরে বাচ্চাদের ক্যাসিনো ।নিচে আসল ক্যাসিনো। বাচ্চাদের হরেক রকম খেলার আইটেমসহ এখানেই  মঞ্চে সুদৃশ্য কস্টিউমে নয়নাভিরাম সার্কাস তন্বীরা তাদের পারদর্শিতা দেখিয়ে চলেছে।আমাদের দলে নারী পুরুষ সহ বেশ কজন মুমিন মুসলমান আছেন ।তারা অতীব মুগ্ধতার সহিত মূল ক্যাসিনোয় প্রবেশ করলেন।আমার বোরিং লোকটাকে অভয় দিলাম’খেলো খেলো কিছু মনে করব না’ !তিনি আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে  চোখে চোখে বললেন ‘টাকা জলে ফেলার শখ হয়েছে তোমার?’ অতপর আর কি করা স্লট মেশিনের আশেপাশে ঘুরঘুর করে দুনিয়ার পাগলদের পাগলামি দেখা। ক্যাসিনোর চোখ ধাঁধানো রাতের গ্লামার, এত রং,এত জৌলুশ এক সময় যেন বিরক্তির উদ্রেক করে,মন পড়ে থাকে পাহাড়ের নাটকীয় সৌন্দর্যে।এখানেই বোধ হয় পার্থিব আর অপার্থিব সুন্দরের পার্থক্য ।

ছবি:লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com