সিজারিয়ান সেকশন কেন হবে জেনে নিন…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল

প্রত্যেক নারীর জীবনের আনন্দময় মুহূর্ত মা হওয়া। কিন্তু এই মাতৃত্বের স্বাদ পেতে তাকে অনেক শারীরিক ও মানসিক ধকল সইতে হয়। কোনো মহিলার স্বাভাবিক প্রসব ঝুঁকিপূর্ণ হলে তার পেট ও জরায়ু কেটে সন্তান প্রসব করাতে হয়। আর এটাকেই বলে সিজারিয়ান সেকশন। আমাদের দেশে এখনো গর্ভবতী নারী কিংবা তাদের আত্মীয়স্বজন মারাত্মক অপারেশনের কথা শুনে যত না চিন্তিত হন তারচেয়ে বেশি আতঙ্কগ্রস্ত হন সিজারিয়ান সেকশনের নাম শুনে। তাদের ধারণা যে, একটু চেষ্টা করলে যেখানে স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব হতো সেখানে কেন অপারেশনের মতো একটি জটিল ব্যয়বহুল পদ্ধতি চিকিৎসকেরা বেছে নিচ্ছেন। আসলে তা নয়, বিশেষ কিছু কারণে সিজারিয়ান অপারেশন প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের প্রয়োজন হয় নতুবা মায়ের অথবা শিশুর প্রাণহানির আশঙ্কা দেখা দেয়। অনেক সময় আগে জরায়ু ফেটে গেলে কিংবা শিশু জরায়ুর বাইরে পেটের মধ্যে চলে গেলে অপারেশন করা হয় তবে সেটাকে সিজারিয়ান সেকশন বলা হয় না, এ ক্ষেত্রে পেট কেটে (ল্যাপারোটমি) শিশু বের করা হয়।
কোন কোন ক্ষেত্রে সিজারিয়ান সেকশন করা হয়:
# যদি সন্তান জরায়ুর মধ্যে স্বাভাবিক অবস্থানে না থাকে অর্থাৎ শিশুর মাথা নিচের দিকে না থেকে যদি উল্টো থাকে কিংবা শিশু আড়াআড়িভাবে অবস্থান করে
# যদি জরায়ু অভ্যন্তরে দুই বা তার বেশি সন্তান থাকে
# যদি গর্ভস্থ সন্তানের হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কিংবা কম থাকে
# যদি নিচের দিকে শিশুর কাঁধ চলে আসে
# যদি মায়ের ইতঃপূর্বে জমজ সন্তান হয় এবং সিজারিয়ান অপারেশন করার ইতিহাস থাকে
# যদি মায়ের প্লাসেন্টা কিংবা গর্ভফুলের কিছু অংশ আলগা হয়ে গিয়ে থাকে
# যদি জরায়ুতে আগে অন্য কোনো অপারেশন হয়ে থাকে
# যদি যোনিপথ সঙ্কুচিত থাকে কিংবা যোনিপথে জন্মগত ত্রুটি থাকে
# যদি মায়ের পেলভিস বা শ্রোণি স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট হয় এবং সন্তান বড় হয়
# যদি জরায়ুতে টিউমার থাকে
# যদি সন্তান প্রসব স্বাভাবিকের চেয়ে বিলম্বিত হতে থাকে
# যদি মায়ের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, টক্সেমিয়া কিংবা হৃদরোগ থাকে
#যদি সন্তান প্রসবের আগে রক্তক্ষরণ হতে থাকে
# যদি ইতঃপূর্বে মায়ের কয়েকটি সন্তান নষ্ট হয়ে থাকে
# যদি আমবিলিকল কর্ড অর্থাৎ শিশুর নাভির সাথে মায়ের ফুলের সংযোজক নালি বা নাড়ি শিশুর গলার সাথে পেঁচিয়ে যায়
# যদি প্রসবের সময় জরায়ু সঙ্কুচিত না হয়
#যদি বেশি বয়সে সন্তান নেয়া হয়।

অনেক সময় দেখা গেছে আগের সন্তানগুলোর স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে কিন্তু বর্তমান প্রসবের সময় চিকিৎসক সিজারিয়ান সেকশন করার কথা বলছেন। এর কারণ কী?

# এর কারণ হলো আগের সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে সব কিছু স্বাভাবিক ছিল কিন্তু বর্তমান সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে শিশুর অবস্থান ঠিক নেই অথবা নাড়ি শিশুর গলায় জড়িয়ে আছে। এ ক্ষেত্রে সিজারিয়ান না করলে শিশুর প্রাণহানি ঘটবে। অনেক সময় নাড়ি ছোট হলেও তার সিজারিয়ান করতে হয়। কারণ প্রসব বেদনা শুরু হলে ছোট নাড়ির জন্য সন্তান নিচে নামতে পারে না। ফলে সন্তানের নাড়িতে টান পড়ে গর্ভফুল আলগা হয়ে যেতে পারে। এ জন্য সিজারিয়ান সেকশনের প্রয়োজন হয়।

কখনো কখনো দেখা গেছে, সন্তান প্রসবের জন্য সব কিছু স্বাভাবিক আছে, আর আধা ঘণ্টা পরই হয়তো স্বাভাবিক প্রসব হবে। কিন্তু হঠাৎ করে চিকিৎসক ঘোষণা করলেন সিজারিয়ান করতে হবে। এর কারণ কী?

# মেডিক্যাল পরিভাষায় যে সমস্যার জন্য চিকিৎসক এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন সেই সমস্যাটিকে বলে কর্ডপ্রোল্যাপস। অর্থাৎ নাড়ি হঠাৎ করে স্থানচ্যুত হয়ে শিশুর মাথায় বা গলায় পেঁচিয়ে যায়। এটা অপারেশনের জন্য একটি জরুরি অবস্থা। এ ক্ষেত্রে অপারেশন না করলে, সন্তান প্রসবে ১০-১২ মিনিট দেরি হলে সন্তানের প্রাণহানি ঘটতে পারে। তাই জরুরিভাবে সিজারিয়ান অপারেশন করে শিশুর জীবন রক্ষার জন্য চিকিৎসক এ ধরনের ঘোষণা দেন।

অনেক সময় সন্তান প্রসবের আগে চিকিৎসককে বলতে শোনা যায় শিশুর অবস্থা ভালো না, এখনই সিজারিয়ান করতে হবে। সন্তানের অবস্থা ভালো না বলতে কী বোঝানো হয়?

# মেডিক্যাল পরিভাষায় এটাকে বলে ‘ফিটাল ডিসট্রেস।’ প্রসব ব্যথা শুরু হওয়ার আগে এটা বোঝা যায় না। প্রসব ব্যথা শুরু হলে জরায়ু সঙ্কুচিত ও প্রসারিত হতে থাকে। সন্তান বের করার জন্য প্রতিবার জরায়ু সঙ্কুচিত হওয়ার সাথে সাথে গর্ভফুলের মধ্য দিয়ে রক্ত চলাচল কমে যায়। রক্ত চলাচল কমে যাওয়ার অর্থ শিশুর অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যাওয়া। স্বাভাবিক ও সুস্থ শিশু এটা সহ্য করতে পারে, কিন্তু যেসব শিশু আগে থেকে অক্সিজেন কম পেয়ে আসছে তারা বর্তমান অবস্থা সহ্য করতে পারে না। ফলে শিশুর হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক শোনা যায়। আবার অনেক সময় জরায়ু বেশি সঙ্কোচনের কারণে শিশুর মাথায় চাপ পড়ে, সন্তান প্রসবে বিলম্ব ঘটে। এ জন্য চিকিৎসক সিজারিয়ান করতে চান।

অনেক সময় দেখা গেছে, চিকিৎসক গর্ভবতী মাকে পরীক্ষা করে বললেন, ‘অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে স্বাভাবিক প্রসব হবে না, সিজারিয়ান করাতে হবে- তবু একবার ট্রায়াল দিয়ে দেখতে চাই।’ এই ‘ট্রায়াল’ শব্দটির মানে কী?

# কখনোই চিকিৎসক চান না যে, আগে রোগীর সিজারিয়ান করা হোক। চিকিৎসক সর্বদা চেষ্টা করেন রোগীর স্বাভাবিক প্রসব ঘটাতে। এই চেষ্টা করাটাই ট্রায়াল। এ ক্ষেত্রে মাকে প্রসবের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঘন ঘন পরীক্ষা করা হয়। সময়টা উত্তীর্ণ হয়ে গেলে যদি প্রসব না ঘটে তবে সিজারিয়ান করা হয়।

বেশি বয়সে সন্তান নিলে চিকিৎসকেরা বলে থাকেন সিজারিয়ান করাতে হবে। এর কারণ কী?

# এর কারণ হলো বেশি বয়সে মা হলে স্বাভাবিক প্রসবে বিঘœ ঘটতে পারে। কারণ বেশি বয়সী মায়ের পেলভিসের অস্থি শক্ত হয়ে যায়। পেশির ইলাস্টিসিটি ক্ষয় হয় বলে প্রসবের সময়ে যোনিপথের সঙ্কোচন ও প্রসারণ ঠিকমতো ঘটে না, ফলে সন্তান নিচে নামতে পারে না। এতে শিশুর প্রাণহানির সম্ভাবনা থাকে বলে চিকিৎসকেরা সিজারিয়ানের সিদ্ধান্ত নেন।

অনেকেরই ধারণা একবার সিজারিয়ান হলে পরবর্তী সময়ে সব প্রসবই সিজারিয়ানের মাধ্যমে করাতে হয়। এই ধারণা কি ঠিক?

# না, এই ধারণা ঠিক নয়। তবে আগে যদি সিজারিয়ান করানোর ইতিহাস থাকে এবং পরবর্তী সময়ের সন্তানটা যদি বড় হয় এবং যদি মনে হয় শিশুর তুলনায় যোনিপথ সরু তবেই কেবল সিজারিয়ান করাতে হবে।

প্রথম সিজারিয়ানের সাধারণত কত দিন পর আবার সন্তান নেয়া যাবে?

# প্রথম সিজারিয়ানের সাধারণত তিন থেকে চার বছর পর সন্তান নেয়া উচিত। এর আগে সন্তান নেয়া উচিত নয়। কিন্তু যদি এমন হয় যে, মায়ের আগের কোনো সন্তান নেই, বর্তমান সিজারিয়ানের সন্তানটিও বেঁচে নেই, এ দিকে মায়ের জরায়ুতে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে সে ক্ষেত্রে জরুরিভাবে সেলাই শুকিয়ে যাওয়ার পর এক থেকে দু’বছরের মধ্যে গর্ভধারণের চেষ্টা করা যেতে পারে।

সিজারিয়ান সেকশনের পরে অনেকেই বলে থাকেন টক জাতীয় ফল না খেতে। এতে নাকি ঘা কাঁচা থাকে এবং পেকে যায়। এটা কি ঠিক?

# না এটা ঠিক নয়। বরং সিজারিয়ান সেকশনের পর মাকে বেশি করে টক জাতীয় ফল খেতে হবে। কারণ টক জাতীয় ফলে থাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, যা মায়ের ক্ষতস্থান তাড়াতাড়ি শুকাতে সাহায্য করে।

সিজারিয়ান সেকশনের কত দিন পর যৌনমিলন করা যাবে?

# সিজারিয়ান সেকশনের সাধারণত দেড় মাস পর যৌনমিলন করা যাবে। তবে স্বামীকে কনডম ব্যবহার করতে হবে। মা যেন গর্ভবতী হয়ে না পড়ে সে ব্যাপারে কঠোরভাবে দৃষ্টি দিতে হবে।

সিজারিয়ান সেকশনের পর কী ধরনের গর্ভনিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত?

# এ ক্ষেত্রে কনডম সবচেয়ে উত্তম ব্যবস্থা। প্রথম কয়েক মাস স্বামীকে বাধ্যতামূলক কনডম ব্যবহার করতে হবে কিংবা যৌনমিলনে নিবৃত্ত থাকতে হবে। কয়েক মাস অতিবাহিত হলে মা স্বল্পমাত্রার গর্ভনিরোধ বড়ি ব্যবহার করতে পারেন। তবে কখনোই তাকে কপারটি পরানো উচিত হবে না।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমাটোলজি বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল
চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিঃ, ২ ইংলিশ রোড, ঢাকা।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com