সাহিত্য সম্পাদকের ঘরে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইরাজ আহমেদ

আমার লেখালেখির শুরু কবিতা দিয়ে। সময়টা আশির দশকের গোড়ার দিক।সবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় পা রেখেছি। কবিতাটা আরেকটু আগে থেকেই লিখতাম। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে গুছিয়ে লেখার চেষ্টার শুরু। সে গুছিয়ে ওঠাটা অবশ্য আজো হয়ে ওঠেনি। এবার প্রসঙ্গে ফিরি। কবিতা ছাপাতে হবে দৈনিক কাগজের সাহিত্য পাতায়। হন্যে হয়ে ফিরি এখানে ওখানে। একদিন সে সুযোগ এসে গেলো হাতে। একজনের সুপারিশে চলে গেলাম লুপ্ত ‘দৈনিক দেশ’ অফিসে। সেখানে সাহিত্য পাতা সম্পাদনা করতেন প্রখ্যাত কবি হেলাল হাফিজ। দৈনিক দেশ অফিস ছিল সেগুন বাগিচায়। তখনও ওই এলাকা এতো বড় বড় বাড়ি আর মানুষের ভীড়ে চাপা পড়ে যায় নি।

সাবেক দৈনিক দেশ অফিস

বুদ্ধদেব বসুর স্মৃতিঘেরা সেগুন বাগিচা অথবা সেগুন বাগান তখন বিকেলে খুব নির্জন হয়ে থাকতো। চারপাশে পুরনো একতলা বাড়ি, বন্ধ অফিস আর শান্ত গলি। দৈনিক দেশ অফিসটা ছিলো পুরনো একটি দোতলা বাড়িতে। সামনে ছোট্ট উঠান। এখন সেই বাড়িটাই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। হেলাল হাফিজ বসতেন একতলার একটা ঘরে। আমি সেই ঘরের দরজায় গিয়ে যখন দাঁড়ালাম তখন বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে সন্ধার দিকে। ছোট একটি ঘর। দরজা দিয়ে ঢুকলেই সাহিত্য সম্পাদকের টেবিল। পাশে আরেকটি ছোট টেবিলে অন্য কারুর সংসার। সেই আমার প্রথম দেখা সাহিত্য সম্পাদকের দফতর। নিজের চেয়ারেই বসে ছিলেন সাহিত্য সম্পাদক। মনে আছে, ভীষণ আলতো ভঙ্গীতে বসে ছিলেন তিনি। গালে দাড়ি। সামনের টেবিলে রাখা একটা বক্স থেকে লেখা বের করে পড়ছিলেন মাথা নিচু করে। সামনে গিয়ে তাঁর পরিচিত সেই মানুষটির কথা বলতেই বসতে বললেন চেয়ারে। আমি দেখা করার উদ্দেশ্য বলতেই কবিতা চাইলেন। আমিও দুরুদুরু বক্ষে একটা কবিতা বের করে তাঁর সামনে রাখলাম।হেলাল হাফিজ কবিতাটা পড়ে হেসে বলেছিলেন, একটা কবিতা পড়ে তো কবিকে বোঝা যায় না, তুমি কাল আরো কয়েকটা কবিতা নিয়ে চলে এসো। ভয় পেয়েছিলাম এই ভেবে যে, লেখা বোধ হয় আর ছাপা হবে না।

আহসান হাবীব

এক দুই কথায় পরিচয়ের বাদাম ভাঙ্গার পর চা এলো। সাহিত্য সম্পাদকের চা। মন সেদিন অদ্ভূত আনন্দে ভরে গিয়েছিলো। ঠিক তখন থেকেই নিজেকে কবি ভাবতে শুরু করে দিয়েছিলাম। চা খাবার ফাঁকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে সাহিত্য সম্পাদকের ঘর দেখছিলাম। অনেক কাগজপত্রে ঠাসা শেলফ. লেখার কাগজ, বক্স ফাইলে জমা লেখার স্তুপ। ঘরের মধ্যে সিগারেট আর কাগজের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছিলো। সেদিন আরো কিছু সময় নানা কথায় কাটিয়ে ফিরে এসেছিলাম। তারপর আমার কবিতা দৈনিক দেশের পাতায় ছাপা হয়েছিলো। একসঙ্গে চারটি কবিতা।
তখন দেশ অফিসে প্রায়ই যেতাম। সাহিত্য সম্পাদকের ঘরে আড্ডায় অংশ নিতাম। সেই সময়ে সাহিত্য সম্পাদকদের ঘরে লেখক আর কবিদের ছোটখাট আড্ডা হতো। এক সময় আমিও সেই আড্ডাগুলোর অংশ হয়ে গিয়েছিলাম।সেসব আড্ডায় চা আর সিগারেটই ছিলো প্রধান আকর্ষণ। এখন সাহিত্য সম্পাদকদের ঘরে সেরকম জমাট আড্ডার কথা খুব বেশী শুনতে পাই না।
যতদূর মনে পড়ে আশির দশকে প্রয়াত কবি রফিক আজাদ ছিলেন ‘সাপ্তাহিক রোববার’ পত্রিকার সম্পাদক অথবা ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকা’র অফিস ছিল তখন হাটখোলা রোডে। ওই ভবনের চার অথবা পাঁচ তলায় সাপ্তাহিক রোববারের অফিস।বেশ অদ্ভূত ধরণের ছিল অফিসটা। বড় একটা ঘর। সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সাংবাদিকদের বসার চেয়ার টেবিল। পাশের ছোট্ট একটি দেয়ালঘেরা ঘরে বসতেন রফিক আজাদ।
সেই ঘরে তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ সেই আশির দশকের শুরুতেই।

রফিক আজাদ

কবিতা নিয়ে গিয়েছিলাম।পত্রিকা সম্পাদনার পাশাপাশি সাহিত্য বিষয়টাও ছিলো তার দেখাশোনার মধ্যেই। কবিতাটা রেখে চায়ের অর্ডার দিয়েছিলেন মনে আছে। তার ছোট ঘরে সেদিন অনেক মানুষের ভীড়। বেশীরভাগই লেখক ও অফিসের সহকর্মী। এরপর বহুদিন গেছি রোববার অফিসে কবিতা ছাপা হওয়ার বদৌলতে। সবসময়ই ওই ঘরটা থাকতো ভর্তি। চলতো জমজমাট আড্ডা। রফিক ভাই ভীষণ খোলামেলা মানুষ ছিলেন। ওই ঘরে পরে বাংলাদেশের সাহিত্যের বহু উজ্জ্বল নক্ষত্রকে আড্ডা দিতে দেখেছি।সেইসব প্রাণবান আড্ডার আয়ু থাকতো ঘন্টার পর ঘন্টা। সঙ্গে সেই চা, সিগারেট।রফিক আজাদের দফতরের পিওনের নাম ছিলো মাখন। গল্প প্রচলিত ছিল, রফিক ভাই হাত তুলে চায়ের অর্ডার দিলে মাখন চা না-এনে অফিসের বাইরে চলে যেত। কারণ তখন ঘর বোঝাই মানুষ। আড্ডায় চায়ের বিল টানতে টানতে ক্লান্ত হয়ে পড়তেন হয়তো কবি। আবার যেদিন হাত টেবিলের ওপর রেখে তিনি চায়ের জন্য হাঁক দেবেন সেদিন চা চলে আসবে ঠিক সময়ে।
একটা মজার ঘটনা এখনো মনে পড়ে। প্রথম দিন রফিক আজাদের সঙ্গে দেখা করতে যাবার সময় আমার পরনে ছিল পাঞ্জাবী আর প্যান্ট। কাঁধে কবিসুলভ কাপড়ের ঝোলা ব্যাগ। উঠে আসার সময় রফিক ভাই হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘‘কাঁধে ঝোলা নিয়ে ঘুরলে কবিতা হবে না। এরপর থেকে জিন্সের প্যান্ট আর টি-শার্ট পড়বা, বুঝলা মিয়া।’’

হেলাল হাফিজ

সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কবি আহসান হাবীব ছিলেন একেবারেই অন্য মেরুর। তার দফতরে খুব একটা আড্ডার সুযোগ কখনোই ছিলো না। গম্ভীর, শান্ত প্রকৃতির সেই মানুষটির মতোই ছিল লুপ্ত ‘দৈনিক বাংলা’ পত্রিকায় তার সাহিত্য সম্পাদকের ঘর। পর্দা টানা দরজা। জানালার দিকে পিঠ দিয়ে বসতেন আহসান হাবীব।পরিচ্ছন্ন টেবিলের ওপর দামি সিগারেটের প্যাকেট রাখা। কাচের পেপার ওয়েটে চাপা দেয়া প্রয়োজনীয় কাগজপত্র।প্রথমদিন দরজার পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই মোটা ফ্রেমের চশমার কাচের ভেতর দিয়ে ভীষণ উজ্জ্বল দৃষ্টি হেনে বলেছিলেন, ‘‘ভেতরে এসো।’’
সেই প্রথম দেখা কবি আহসান হাবীবের সঙ্গে। তিনি বেঁচে থাকতে দৈনিক বাংলার সাহিত্য পাতায় একবারই আমার কবিতা ছাপা হয়েছিল। মনে আছে গম্ভীর গলায় বলেছিলেন, কবিতা এনেছো? রেখে যাও। প্রথম দিন চা খেতে বলেছিলেন। ভয়ে সায় দিতে পারিনি সেই প্রস্তাবে। পরে অবশ্য লেখা ছাপা হবার পর চা খেয়েছিলাম।আহসান হাবীবের ঘরের বাইরে দৈনিক বাংলার টানা বারান্দায় মাঝে মাঝেই অনেক কবি ও লেখকের ভীড় চোখে পড়তো।
সাহিত্য সম্পাদকদের ঘরগুলো ছিল বিচিত্র। সেখানকার আড্ডা, হাসি, আনন্দের চরিত্রও ছিল নানা ধরণের। একদা এই শহরে লেখলেখির সূত্রে এমন অনেক সাহিত্য সম্পাদকের ঘরে আড্ডা দেয়ার সুযোগে লেখকদের বিচিত্র স্বভাব আর একান্ত ভাবনার সঙ্গী হতে পেরেছিলাম। সেইসব উন্মাতাল দিনের কথা আজকাল ফিরে ফিরে মনে পড়ে।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com