সাম আনরেড লাইনস ফ্রম অ্যা ব্রেইল নোটবুক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সুব্রত গোস্বামী, কলকাতা থেকে

অন্ধ হওয়ার বেশকিছু সুবিধেও আছে। সবচেয়ে বড় সুবিধেটা হল আমরা কতটা বুঝতে পারি সেটা অন্যরা বুঝতে পারেনা। আন্দাজই করতে পারেনা। আমায় একলা ঘরে পেয়ে আমার বুক টিপে নিস্তব্ধে পালিয়ে যাওয়া ছোটোমেসো আজও জানেনা যে আমি তা সেদিনই জেনে ফেলেছিলাম। সে অনেক বছর হয়ে গেছে। আমি সেদিন চিৎকার চ্যাঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় করতেই পারতাম। করিনি। কেন করিনি সে হিসেব আজও আমার কাছে অজানা। মাসির বিয়ে ভাঙা না নিজের সম্মান, কোনটা আমার অবচেতনে টোকা মেরেছিল মনে নেই। তবে মাসির বিয়ের কথা যদি সত্যিই ভেবে থাকব তাহলে তোতার বেলা কেন চুপ থেকেছিলাম? চৌবাচ্চা ওয়ালা বড়সর বাথরুম আমাদের। আমার খুড়তুতো ভাই তোতা আমি ঢোকার অনেক আগে থেকেই বাথরুমের এককোণে লুকিয়ে ছিল হয়ত। মানুষের শরীরের সুক্ষ্ম গন্ধগুলো যে অন্যদের থেকে আমাদের মত মানুষেরা বেশি চেনে সেটা সেদিন সাতচল্লিশের ছোটোমেসোই আন্দাজ করতে পারেনি, আর তোতা তো তখন সবে সতেরো-আঠেরো। আর সেদিন থেকে ক্যান্থারাইডিন আজও আমার অসহ্য। আমি ঘেন্না করি ওই তেলটাকে। আমাদের সারা বাড়িতে তোতাই একমাত্র ক্যান্থারাইডিন মাখত। আমি ঠিক না ভুল যাচাই করার জন্য সেদিন বাথরুমে দরজা বন্ধ না করে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার বুঝে ফেলা, তোতাকে বুঝতে না দিয়ে বললাম,”ও, তোতা তোর হয়নি এখনও? আচ্ছা আমি ঘুরে আসছি।” কোনও সাড়াশব্দ পাইনি। শুধু ক্যান্থারাইডিনের গন্ধটাকে ধীরপায়ে মিলিয়ে যেতে দেখেছিলাম সেদিন। এই ‘দেখা’ শব্দটা আমাদের সঙ্গে ঠিক যায়না, তাইনা? স্বপ্নদেখাকে কী বলব তবে? মায়ের আদরের স্বপ্ন, মেঘ ডাকার স্বপ্ন, রেলের কুঝিকঝিকের স্বপ্ন, আরো ছোটোবেলার হামাম সাবানের স্বপ্ন। শীতের বিকেলে মায়ের গায়ের তুহিনার গন্ধের স্বপ্ন। মায়ের ওপর আমার বড্ড রাগ।  আমার নামটা যে মায়েরই দেওয়া। বে-আক্কেলে মা আমার, তার জন্মান্ধ মেয়ের নাম রেখেছিল নয়নতারা। নয়নতারা সাধুখাঁ। কী আয়রনি, না? কেউ ডাকলেই কান্না পেত। তবে এখন আর কষ্ট নেই। কলেজ পেরোনোর পরদিন থেকে ওই নামটা না শোনার হাজার চেষ্টা করে গেছি। বাবার দেওয়া নাম মিমিকে বারবার লড়িয়ে দিয়েছি নয়নতারার সাথে। মিমি জেতেনি কোনওদিন। ব্রেলে লেখা বইগুলো বারবার আমার আঙুলে খোঁচা দিয়ে বলতে চেয়েছে যে আমি নয়নতারা। খুব ছোটোবেলায় যেদিন প্রথম ছবি আঁকব বলে মায়ের কাছে রং তুলি কাগজ চেয়েছিলাম, মা আমায় কটা খবরের কাগজ আর একটা তুলি দিয়েছিল শুধু। বিছানা নোংরা হওয়ার ভয়ে রং নয়। বাবার সেদিনের খেদোক্তি আমার আজও মনে পড়ে। “নিজের মেয়েটাকে তুমি নিজের কাছেও অন্ধ করে রাখলে গার্গী!” পরদিনই বাবার এনে দেওয়া আঁকার খাতা আর মোমরং আনন্দের তোড়ে একদিনেই শেষ করে ফেলেছিলাম। খাতাটা আজও আছে। মোমরং-এর দাগগুলোর ওপর হাত বুলিয়ে আজও মাঝেমাঝে দেখে নিই আমার সেদিনের আঁকাদের। ঠিক যেমন সেদিন মায়ের গালে হাত বুলিয়ে তার নির্বাক কান্না দেখেছিলাম। তবু এতকিছুর পরেও আমার আজও বাবার আফটারশেভের গন্ধওলা স্বপ্নটা দেখা হলনা।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com