সামনে দাঁড়া…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আজ প্রাণের বাংলা পাঠকদের জন্য গীতিকারের গল্পে সামনে দাড়া গানের গল্প। এই গানটা আমার লেখা গানের মধ্যে প্রিয় তালিকায় থাকবে সবসময়। সেটা হয়তো শব্দচয়নের জন্য, অথবে অদ্ভুত এক টানা পোড়েন সময়ে লেখা লিরিকের জন্য।

 

শেখ রানা (এডিনবরা, স্কটল্যান্ড থেকে)

২০০৯ এর মার্চ এর দিকে দেশে ফিরে আসি হুট করেই। হঠাৎই মনে হয়েছিলো, আমার নির্বাসন দন্ড শেষ। আমার বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত হুট-হাট নেয়া, ভাবনাকে ভাববার অবকাশ না দিয়ে।

দেশে ফিরেই বাপ্পা ভাই এর স্টুডিও। সেই পরিচিত জায়গা, পরিচিত সব মুখ কিন্তু অপরিচিত আমি।

দেশে ফিরে নিজেকে অপরিচিত লাগতে শুরু করে আমার কোনো এক অজানা কারণে। নিজেকে ভীড়ের মানুষ মনে হতে শুরু করে। অদ্ভুত এক অভিমানবোধে আক্রান্ত হই আমি। নিজেকে নিজে বুঝে উঠতে পারিনা, নিজেকে বুঝতে চাইওনি কোনোদিন। কিন্তু এবার নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথন শুরু হতেই চমকে উঠি। এই আমাকে আমি চিনি না, দেখি নি আগে…
নিজেকে কিচ্ছু মনে হয় না, শুধু মনে হয় ভীড়ের মানুষ হয়ে গেছি আমি।

এতদিনের প্রিয় শহরটাকে চিনতে পারিনা আর। শহরে শুধু ভীড় আর কর্মব্যাস্ত দিন শেষে ত্রস্তপায়ে, উপচে পড়া বাসে বাড়ি ফেরার তাড়ায় নির্জীব অনুভুতিশূন্য এক এক মুখ। দেশে ফেরার আনন্দটা আমার খুব তাড়াতাড়ি মিলিয়ে যায় হাওয়ায়। বাতাসও কেমন গম্ভীরমুখে জানান দেয়- প্রান্তবদলে বদলে গেছি আমিও …

শহর ছেড়ে বেড়িয়ে পড়ি আগের মত। সেই আগের বোহেমিয়ান জীবনে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে জাগে। সেই আগের দিনের মত প্রিয় ছোট ভাই রুপমকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ি। কমলাপুর স্টেশন এ গিয়ে ট্রেনে উঠে বসি। গন্তব্য সিলেট। রুপম এখন পুরোপুরি সংসারী। ফিরে আসে, আমার সঙ্গে যায় না। সেই রাতের ট্রেন যাত্রায় নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধ হয় আমার। নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করি কতশত, উত্তর পাইনা একটিরও। বারে বারেই মনে হয়, ভীড়ের মানুষ হয়ে গেছি আমি…

সিলেট থেকে চলে যাই চট্টগ্রাম। উঠি গিয়ে ছোটো আপা, দুলাভাই এর বাড়িতে। ছোট্ট ভাগ্নে-র নিষ্পাপ মুখ দেখে মন ভালো হতে শুরু করে, একটু একটু করে মন শান্ত হতেও শুরু করে অদ্ভুত সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে। বহুতল ফ্ল্যাট বাড়ির ব্যালকনিতে দাঁড়ালেই অপার্থিব এক অনুভুতি হয় আমার। সামনেই সবুজ গাছ। আর গায়ে গায়ে লেগে থাকা বাসা-বাড়ি ছাড়িয়ে অনেক দূরে নাফ নদী আর পাহাড়।
সেদিন ভোরবেলায় অচেনা এক অনুভুতি সর্বগ্রাসী হয়। নিজেকে ফিরে পেতে থাকি। ভোরবেলাতেই লিখে ফেলি-

আধাঁর শেষে, আলোয় হেসে
সুর্য আকাশ বুকে ধরে
সামনে দাঁড়া …
ভিড়ের মানুষ, আর কতকাল
ওঠ জেগে ওঠ, নতুন সকাল
অপেক্ষাতে তোরই জন্য 
হাজার অযুত নাড়ছে কড়া
ভীড় ঠেলে আয়, সামনে দাঁড়া

ফিরে আসি ঢাকায়। চট্রগামে বসে আরও কিছু লিরিক লিখি, ভালোবাসার শব্দচয়নে। কিন্তু সেই লিরিকগুলো শব্দকে আকড়ে অযত্নে ঘুমিয়ে পড়ে।
জেগে থাকে শুধু সামনে দাড়া …
বাপ্পা ভাই এর স্টুডিয়োতে যাই লিরিকটা নিয়ে। বাপ্পা ভাই এর পছন্দ হয়। অনেক গান করার কথা হয় বাপ্পা ভাই এর সঙ্গে।
কিছুদিন পর দলছুট এর নতুন অ্যালবাম এর কাজ শুরু হয়। আয় আমন্ত্রণ। বেশ কয়েকটা গান হয়ে যাওয়ার পরে বাপ্পা ভাই সামনে দাঁড়া গানটার সুর করা শুরু করে। আমার ভেবে রাখার একদম বাইরে কিছু হয়। যেই গুনগুনটা আমার মাথায় ছিলো লেখার সময় তার ঠিক উল্টো পথে হেটে অদ্ভুত সুন্দর একটা কম্পোজিশন হতে থাকে। গানটার মুখটাই লেখা ছিলো শুধু। বাকি কথাগুলো লিখতে বলে বাপ্পা ভাই। কিছু গান আমি মাসের পর মাস ধরে লিখি। কিছুতেই প্রিয় শব্দগুলো দেখতে পাইনা। কিন্তু সেই সন্ধায় বাপ্পা ভাই এর স্টুডিয়োতে বসে কাগজ আর কলম তুলে নিতেই শব্দরা আমার চারপাশে ভীড় জমাতে থাকে। আমি একদম একটানে, অন্তরাটা লিখে ফেলি।

অন্য কোথাও পুড়ুক রোদে
বিপন্ন সুখ অচীন ক্রোধে
সামনে দাঁড়া,
ভুল ধারাপাত, অনেক হলো
অনেক হলো জোছনা তারা
ওঠ জেগে ওঠ, ব্যাকুল ভোরে
হাতটা হাতে দিস, দিস ইশারা
অপেক্ষাতে তোরই জন্য,
হাজার অযুত নাড়ছে কড়া
ভীড় ঠেলে আয়, সামনে দাঁড়া …

লেখাটা শেষ করে বাপ্পা ভাইকে দেই। তখনই ডেমো ভয়েস-ও দেয়া হয়ে যায়। নির্ভার মন নিয়ে রাস্তায় নেমে আসি। বাড়ি ফিরবো। প্রিয় শহরটাকে অচেনা মনে হয় না আর। গানটা শেষ হতেই নিজেকে ফিরে পাই আমি।

আয় আমন্ত্রণ রিলিজের পর অনেকে আমাকে সামনে দাঁড়া গানটার জন্য অভিনন্দন জানায়। ভালো লাগে তো অবশ্যই, তার চেয়েও ভালো লাগে, সামনে দাঁড়া আমাকে মনে করিয়ে দেয়, সামনে অনেক কাজ বাকি। ভীড়ে মিশে যাওয়া যাবে না কিছুতেই।

আমার লেখা অনেক গানের ভিতর সামনে দাঁড়া হয়ে যায় আমার অন্যতম প্রিয় একটা গান।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com