সাপ্তাহিক বিচিত্রার সংসারে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইরাজ আহমেদ

শাহাদত চৌধুরী

একটা সময়ে ‘বিচিত্রা পড়ুন’ এই বিজ্ঞাপনটি চোখে পড়তো। এই তো বছর কুড়ি আগে বিচিত্রা নামের সাপ্তাহিক পত্রিকাটি প্রকাশিত হতো এই ঢাকা শহরে। প্রকাশিত হতো ১ নং ডিআইটি এভিনিউ থেকে। মতিঝিলের একেবারে কেন্দ্রে বিশাল দৈনিক বাংলা(লুপ্ত) ভবনে ছিল বিচিত্রা পত্রিকার সংসার। নিজের সাংবাদিকতা জীবনের একেবারে সূচনালগ্নে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল এই কিংবদন্তিসম পত্রিকায়।দৈনিক বাংলা ভবনের সরু সিঁড়ির অনেক ধাপ টপকে অথবা পুরনো দিনের একটি নড়বড়ে লিফটের বদান্যতায় ভবনের তিন তলায় অবতরণ করলেই ছিলো বিচিত্রা অফিস। দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেই অপরিসর একটি ঘরে ছড়ানো ছিটানো চেয়ার টেবিলে বসে কাজ করতেন বাংলাদেশের এক সময়ের খ্যাতিমান সব সাংবাদিক। বড় ঘরটার পরেই আরেকটি বন্ধ দরজা। দরজার পেছনে একটা রিভলভিং চেয়ারে বসে থাকতেন সাপ্তাহিক বিচিত্রা নামের প্রতিষ্ঠানটির স্বপ্নদ্রষ্টা, চালক, অধিনায়ক সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী।
বিচিত্রার বড় ঘরে বসতেন, সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ, শাহরিয়ার কবির, কাজী জাওয়াদ, আলমগীর রহমান, চন্দন সরকার, মাহমুদ শফিক, মঈনুল আহসান সাবের, চিন্ময় মুৎসুদ্দী, উর্মি রহমান, কবি ও অধ্যাপক শামীম আজাদ। বহু তরুণ সাংবাদিকের ক্যারিয়ারের সূচনা হয়েছিল এই পত্রিকাটির হাত ধরেই। বহু সাংবাদিক নিয়মিত প্রদায়ক হিসেবে এখানে কাজ করতেন, লেখা দিতেন।
কে আসতেন না এই বিচিত্রায়? যে সময়ের কথা বলছি সেটা আশির দশকের সূচনালগ্ন। ঘটনাচক্রে পত্রিকাটিতে সাংবাদিকতায় হাত পাকানোর সুযোগ পেয়েছিলাম। আর তারপরেই চারপাশে নিজের চেনা জানা পৃথিবীতে লাগলো অদ্ভূত এক আন্দোলন। নিজস্ব ভাবনার গতিপথ গেলো বদলে। দেশের খ্যাতিমান সাহিত্যিক, নাট্যকর্মী, সিনেমার পরিচালক, বিপ্লবী, কবি, শিল্পী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাজনীতিবিদ সবাইকেই তখন ভীড় জমাতে দেখেছি বিচিত্রা সম্পাদকের সেই ছোট্ট ঘরটিতে। প্রয়াত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, মুনতাসীর মামুন, প্রয়াত অভিনেতা হুমায়ূন ফরীদি, অভিনেতা আফজাল হোসেন, চলচ্চিত্র পরিচালক প্রয়াত চাষী নজরুল ইসলাম, কবি নির্মলেন্দু গুণ, প্রয়াত কবি রফিক আজাদ, কবি মহাদেব সাহা, ঢাকার বর্তমান মেয়র আনিসুল হক, নাট্যজন নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুকে ওই ছোট্ট ঘরে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিতেও দেখা যেতো। বিচিত্রার সেই আড্ডার খ্যাতির কথা শোনা যেত এই নগরের বিভিন্ন প্রান্তে। মাঝে মাঝে অসহায়ের মতো মনে হতো, এতো মানুষ যদি সারাদিন বসে আড্ডাই দেয় তাহলে কাজটা হবে কখন! কিন্তু পরে বুঝতে পেরেছি বিচিত্রা অফিসে সিগারেটের ধোঁয়া আর ওই কোলাহলের ভেতর থেকেই তৈরী হয়ে গেছে অসাধারণ সব প্রচ্ছদ কাহিনির প্লট, রিপোর্টের বিষয়বস্তু।
বিচিত্রা অফিসের সকাল শুরু হতো সম্পাদকের নিউজপ্রিন্টের প্যাড ছেঁড়া দিয়ে। তখনও সাংবাদিকতায় কম্পিউটার আসে নি। আমরা লিখতাম খবেরের কাগজ ছাপা হওয়ার পর উদ্বৃত্ত নিউজপ্রিন্ট দিয়ে তৈরী করা এক ধরণের প্যাডে। সকালবেলা বিচিত্রার পিওন মনির শাহাদত ভাইয়ের টেবিলে খুব যত্নে একখানা মোটা প্যাড রেখে যেতো। শাহাদত ভাই অফিসে ঢুকে এক কাপ চায়ের অর্ডার দিতেন। তখন অফিসে কেউ উপস্তিত থাকলে তাকেও কা্লামের সেই বিখ্যাত ট্যালটেলে দুধ চা খেতে হতো। শাহাদৎ ভাই চায়ে চুমুক দিয়েই শুরু করতেন প্যাডের পাতা ছেঁড়া। এটা ছিল তার মুদ্রাদোষ। তার এই মুদ্রাদোষের বলি হয়েছে অনেক প্রতিবেদন, অফিসের চেক, জরুরী কাগজ। এই ছেঁড়ার সময়ে শাহাদত ভাই খুব অনমোনা থাকতেন। ফলে কী ছিঁড়ে ফেলছেন সেটা খেয়াল করতেন না। এখন বুঝতে পারি তখন তিনি ভাবতেন। ভাবতেন হয়তো বিচিত্রার আগামী প্রচ্ছদ কাহিনি নিয়ে, রিপোর্ট নিয়ে, লেখার বিষয়বস্তু নিয়ে।
বিচিত্রায় আশির দশকে অনেক তরুণ সাংবাদিকতা করতে ঢুকে পড়েন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন প্রয়াত সাংবাদিক মিনার মাহমুদ। তরুণদের মধ্যে আরও কাজ করেছেন জসিম মল্লিক, আরিফুর রহমান শিবলী, ফয়জুল আহসান শামীম, মাহফুজুর রহমান, আসিফ নজরুল, আশরাফ কায়সার, মিজানুর রহমান খান, গোলাম মুর্তোজা প্রমূখ। এদের মধ্যে অনেকে এখন সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে আর জড়িত নন।
এই পত্রিকার বিশেষ সংখ্যার শিল্প নির্দেশক হিসেবে কাজ করেছেন শিল্পী রফিকুন্নবী ওরফে রনবী। নিয়মিত কাজ করতেন শিল্পী লুৎফুল হক, অলকেশ ঘোষ, মাসুক হেলাল, বাশিরুল হক।
শাহদত চৌধুরী বিচিত্রাকে বলতেন বিচিত্রা পরিবার।আসলেই গোটা একটা পরিবারের মতো ছিলো সেই বিচিত্রা। যেখানে আড্ডার ভেতর দিয়ে তরুণ প্রজন্ম কাজ শিখতো। শাহাদত চৌধুরী সবসময় বলতেন মানুষের কাছে যেতে, মানুষের কথা শুনতে। ওখানেই লুকিয়ে আছে অসাধারণ সব খবরের বিষয়।
বিচিত্রা কর্তৃপক্ষ তখন দেশের খ্যাতিমান সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে বিভিন্ন ধরণের লেখা লিখিয়ে নিতেন।তাদের সঙ্গে অনেক সময় জুড়ে দেয়া হতো তরুণ সাংবাদিকদের মাঠ পর্যায়ের কাজটা করার জন্য।শেখার জায়গাটা সম্পাদক ওখানেই তৈরী করে দিতেন আমাদের জন্য।এখন এই শহরে কোন পত্রিকার অফিস অথবা সম্পাদকের দপ্তরে এরকম আড্ডার কথা আর শোনাই যায় না। খবরের কাগজের অফিসে এখন সংবাদকর্মীরা গলায় পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে মাথা নিচু করে কাজ করে।সেই বিচিত্রার এলোমেলো দিন আর কোথাও খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। সব কিছুতেই এক ধরণের কর্পোরেট ধারণা সওয়ার হয়ে বসেছে।
একটা সময়ে বিচিত্রা অফিসে বহু ছাত্র নেতাকে আসতে দেখেছি। তারা নিছক গল্প করতেই চলে আসতেন। ওই কথা আর আড্ডার সূত্রে কতদিন প্রতিবেদনের বিষয় তৈরী হয়ে গেছে। অনেক সময় অনেক ব্যবসায়ীকে আসতে দেখা গেছে। তারাও ছিলেন খবরের উৎস।তখন বিচিত্রায় প্রকাশিত একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদন সরকারের ভিত পর্যন্ত নাড়িয়ে দিতো। এখন সেইসব দিন হারানো হাওয়ার মতো পলাতক এই শহর ছেড়ে।
বিচিত্রা সপ্তাহে একদিন প্রকাশিত হতো। কিন্তু আমাদের কাছে সপ্তাহে সাত দিনের সঙ্গী ছিলো পত্রিকাটি। একবেলা বিচিত্রায় না গেলে মনে হতো খাবার হজম হচ্ছে না। এই সাপ্তাহিক কাগজটি বন্ধ হয়ে গেছে বহুকাল আগে। হয়তো কিছু মানুষের বাড়িতে যত্নে বাঁধাই হয়ে রক্ষিত আছে প্রাণের বিচিত্রা। পাঠক এই বিচিত্রাকে এক কালচারে পরিণত করেছিলো। আর সেই কালচার তৈরী করতে পেছনে কাজ করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে আসা একদল অকুতোভয় মানুষ। যারা বাংলাদেশের জন্য স্বপ্ন তৈরী করতে চেয়েছিলেন, পাঠককে চিন্তাশীল করে তুলতে চেয়েছিলেন।
আজও মতিঝিল দিয়ে যাবার সময় তাকাই দৈনিক বাংলার সেই বিশাল ভবনটির দিকে। হয়তো অজান্তে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। ঘার ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখতে চেষ্টা করি বিচিত্রার তেতলার সেই জানালা। একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা আমাকে এই পৃথিবীর পথে এগিয়ে দিয়েছিল অনেকখানি।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com