সাদা মেঘের ভেলা আর তুমুল বৃষ্টি সাজেক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নিজামুল হক বিপুল

(পূর্ব প্রকাশিতের পর):মধ্য গগণে সূর্য মামা। তীব্র গরম ছড়িয়ে সবুজ পাহাড়কে করে তুলেছে উত্তপ্ত। এরই মধ্যে একটু ফ্রেশ হয়ে আমরা পেটপুজার প্রস্তুতি নিয়েছি। ট্যুর কোম্পানির পক্ষ থেকে আগেই জানিয়ে দেয়া হয়েছিল, সবাই ফ্রেশ হয়ে দ্রুত দুপুরের খাবার সেরে নেবেন। আমরা যে ট্রাইবাল কটেজ ইমানুয়েলে উঠেছিলাম সেই কটেজ মালিকের রেস্টুরেন্টে আমাদের দুপুরে খাবারের আয়োজন। হাত মুখ ধুয়ে রেস্টুরেন্টে গিয়ে দেখলাম বসার জায়গা নেই। অন্য লোকজন আগেই বসে গেছেন।
দেখতে সুশ্রী হোটেল মালিক তিন সন্তানের জননী মারোয়াতি মারমা একটি বাচ্চাকে কোলে নিয়ে আমাদেরকে বারান্দার একটি টেবিলে বসিয়ে দিলেন। অন্য দুই বাচ্চা তার পিছন পিছন ঘুরছে। প্রচন্ড ক্ষুধার্ত আমরা চারজন বসে গেলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবার সামনে চলে আসল। মেন্যু সাদা ভাত, মুরগীর মাংস, বাঁশের কর, সব্জি আর ডাল। কিন্তু খাবার মুখে নিয়ে গিলতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। ঝাল কাকে বলে মুরগীর মাংস মুখে দিতেই হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। বুঝতে পারলাম ঝালের সাথে অভ্যস্ত না হওয়ায় আমার আর পেটপুজা করা হল না। সব্জি আর ডাল দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করে উঠে পড়লাম।
বলছিলাম হোটেল মালিক মারোয়াতি মারমার কথা। তিনি সীমান্তের ওপাড়ের মিজোরামের বাসিন্ধা। বৈবাহিক সূত্রে এখন সাজেকের রুইলুই পাড়ায় বাস। তার বড় ছেলে মিজোরামের আইজল শহরে লেখা পড়া করে। চৎমকার বাংলা বলা মারোয়াতি মারমা জানালেন, তিনিই পুরো রেষ্টুরেন্ট সামাল দেন। তার প্রাণখোলা হাসি আর কথা বলার ভঙ্গিতে মুগ্ধ পর্যটকরা। শত শত পর্যটক খাবারের জন্য হাল্ল¬া চিৎকার করলেও কখনই তাকে রাগান্বিত হতে দেখা যায়নি।
গত পর্বেই বলেছি বিকেলে যখন বের হয়েছি পরিপাটি করে সাজানো সাজেকের রুইলুই পাড়া আর পাহাড়ের চূড়ায় গড়ে ওঠা কংলাক পাড়া ঘুরে দেখতে, তখনই আচমকা মেঘের হানা। অগত্যা রুইলুই পাড়ার রাস্তায়ই কেটে গেল পুরো বিকেল, সন্ধ্যা। এমনকি রাতঅব্দি ছিলাম সড়কের উপড়েই। রাতের খাবারও একই রেস্টুরেন্টে। মেন্যুও প্রায় একই। অগত্যা দোকানি মারোয়াতি মারমাকে বলে ডিম ভাজার ব্যবস্থা করা হল।
বিকেলেই আমরা কয়েকজন মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম রাতে হাঁসের মাংসের সঙ্গে পানি পানের। দুমুল বৃষ্টির মধ্যে আমরা তিন-চার জন মিলে আমাদের রেস্টেুরেন্টের পাশেই অপর একটি রেস্টুরেন্টে গেলাম। রেস্টুরেন্ট না বলে বলা ভাল একজন পাকা বাবুর্টির কাছে গেলাম। দরদাম করে আট শত টাকায় একটি আস্ত হাঁস রান্না করে দেয়ার অর্ডার দেওয়া হল। বলে দেয়া হল ঝাল কমিয়ে দেয়ার জন্য। পাহাড়ের লোকজন নাকি খুব বেশি ঝাল খান। তাদের ধারণা পাহাড়ে যারা বেড়াতে যান তারাও বুঝি ঝাল খাবার খেতে পছন্দ করেন। যাক রাতে কটেজের জানালা খুলে দিয়ে হাঁসের মাংসের জম্পেস আড্ডা বসলো। আমরা কয়েকজন মিলে গোগ্রাসে গিলতে লাগলাম…। ঝাল কম থাকায় রান্না সবার পছন্দ হল। এক দিকে আমরা মাংস ভক্ষণ করছি অন্যদিকে খোলা জানালা দিয়ে হু হু করে ঢুকছে দূর আকাশের মেঘ দল…। আহ্া কি চমৎকার দৃশ্য…। চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
খাওয়া পর্ব শেষে জানালা খুলে লেপমুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। কারণ সকাল ১০টার মধ্যেই আবার আমাদেরকে রওয়ানা হতে হবে খাগড়াছড়ি হয়ে ঢাকার পথে। ভোর রাতে টের পেলাম ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে পুরো ঘর। দ্রুত জানালা বন্ধ করে আবারো ঘুম। খুব সকালে উঠে আমরা কয়েকজন মিলে দ্রুত পায়ে হাঁটা শুরু করলাম কংলাক পাড়ার দিকে। কংলাক পাড়া হচ্ছে সাজেকের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়। সেই পাহাড়ে উঠলেই দুই নয়ন মেলে উপভোগ করা যায় চারপাশের অপূর্ব সুন্দর মনোরম পরিবেশ। আমরা হাঁটছি কংলাক পাড়ার দিকে, আর আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের ভেলা খেলা করছে আপন মনে। কখনও বা আমাদের শরীর ভেদ করে চলে যাচ্ছে অন্যপ্রান্তে।

এমন দৃশ্য উপভোগ করতে করতে আমরা ধীরে ধীরে উঠে গেলাম কংলাক পাড়ায়। সেখানে আদিবাসী জনগোষ্ঠির বাস। পাহাড় চূড়ায় পাহাড়ের কোল ঘেঁষেই ছোট ছোট বসত ঘর। কংলাক পাড়ায় সাত সকালেই চোখে পড়লো একাধিক দোকান। যেগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে পাহাড়ী কলা, ডাব, গুড়ের চা এমনকি পুরনো ভাত ও কলা দিয়ে তৈরি লোকাল পানীয়। দেখলাম পর্যটকদের অনেকেই এসবের টেস্ট নিচ্ছেন।
কংলাক পাড়ায় বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে সেলফি, উইলফি আর ডিএসএলআর এর ক্লিক ক্লিক শেষ করে আমি আর শাহেদ এরশাদ ধীরে ধীরে নেমে পড়লাম। বেলা অনেক হয়েছে এবার ফিরতে হবে কটেজে, পাহাড়কে বিদায় জানাবার সময় যে ঘনিয়ে আসছে। পাহাড় থেকে নেমে রুইলুই পাড়ার দিকে আসতেই আবারও মেঘ- বৃষ্টির খেলা। কখনও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি আবার কখনও সাদা মেঘের ভেলা পাহাড় থেকে পাহাড়ে ছুটে চলছে আপন মনে। তাদের পথ যেন কোনভাবেই আগলে রাখা যাচ্ছে না…।
কটেজে ফিরতেই শুরু হল তুমুল বৃষ্টি। অনেকেই আপন মনে বৃষ্টিতে গা হেলিয়ে দিয়েছেন। আমরা অপেক্ষায় বৃষ্টি থামার। প্রায় আধা ঘণ্টা পর বৃষ্টি থামতেই শুরু হল চান্দের গাড়িতে চড়া। তারপর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এক সঙ্গে খাগড়াছড়ির পথে যাত্রা করল শতাধিক চান্দের গাড়ি।
মাথার উপর সূর্যের তাপদাহ। এরই মধ্যে খাগড়াছড়ি ফেরার পথেই এক জায়গায় থামলো চান্দের গাড়ির দীর্ঘ বহর। সবাই দল বেঁধে নেমে পড়েছেন পাহাড়ী ঝর্ণার সন্ধানে। খাগড়াছড়ি-সাজেক মূল সড়ক থেকে নেমে পশ্চিম দিকে একটি পাচাড়ী ছড়া পার হয়ে সরু সড়ক ধরে যেতে হয় সেই ঝর্ণার কাছে। কিছু দূর সড়কের পর আবার ছড়া ধরেই পৌঁছা গেল ঝর্ণার কাছে। ঝর্ণার পথে হাঁটতে হাঁটতেই স্থানীয়দের কাছ থেকে জানলাম ওই ঝর্ণার নাম ‘হাজাছড়া ঝর্ণা’। দল বেঁধে শত শত পর্যটক ছুটলেন ঝর্ণার শীতল জলে নিজেদের একটু ভিজিয়ে নিতে। হাজাছড়া ঝর্ণার কাছে পৌঁছেই আমরা মুগ্ধ। প্রায় ৪০ থেকে ৫০ ফুট উপর থেকে অঝরো ধারায় লুটে পড়ছে শীতল পানি। অনেক পথ হেঁটে এই ঝর্ণা দেখতে গিয়ে সব ক্লান্তিদূর হয়ে গেল। তবে এই ঝর্ণা দেখা থেকে নিজেদের বঞ্চিত রেখেছিলেন অনেকেই। অবশ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শারমিন সুলতানা শান্তা তার স্বামী কাজী রায়হান উদ্দীনকে অনেকটা জোর করেই নিয়ে গেলেন গভীর পাহাড়ের ভিতরে ঝর্না দেখতে। সঙ্গে তার ছোট ভাই শাহরিয়ার আহমদ। ঝর্ণার কাছে পৌঁছে রীতিমত উত্তেজিত শান্তা ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আবার আমাদের সঙ্গী ঢাকা থেকে যাওয়া সাউথ ইস্ট ব্যাংকের কর্মকর্তা লোকমান হোসেন, মতিউর রহমান, তারেকসহ আরও অনেকে না গিয়ে আফসোস করলেন।
সাজেক যাবার পথেই দেখা মিলেছিল একটি নদীর। পূর্ব দিক থেকে আসা নদীটি খাগড়াছড়ি-সাজেক সড়ক পার হয়েই একটু পশ্চিয়ে গিয়ে দু’ভাগ হয়ে দুই দিকে চলে গেছে। তাই খাগড়াছড়ি ফেরার পথে সেতুতে দাঁড়িয়েই ক্যামেরাবন্দী করলাম চমৎকার পাহাড়ী নদীকে।
ঝর্ণা দর্শন পর্ব শেষ করে আমরা আবারো ছুটলাম পাহাড়ী শহর খাগড়াছড়ি পথে। সেখানেই দুপুরের খাবার। কিন্তু ঘঁড়ির কাটায় তখন প্রায় তিনটা। খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছতে তখন ঢের বাকি। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে শহওে পৌঁছেই আমাদের সঙ্গে থাকা ট্যুর কোম্পানির গাইড নিয়ে গেলেন একটি হোটেলে। যেখানটায় আগে থেকেই খাবারের আয়োজন করে রাখা হয়েছে। কিন্তু হোটেলে ঢুকে দাঁড়ানোর জায়গা নেই। অগত্যা কী আর ভক্ষণে ব্যস্ত লোকজনের পিছনেই দাঁড়িয়ে থাকলাম। তাদের খাওয়া শেষ হতেই তড়িগড়ি করে চেয়ারের দখল নিলাম। অতপর ধীরে ধীরে খাবার আসলো আমাদের সামনে। ভর্তা, সব্জি আর মুরগীর মাংস। সুনির্দিষ্ট খাবার। ট্যুর কোম্পানির সাথে কোথায়ও ভ্রমণে গেলে এই একটা সমস্যা। নির্দিষ্ট হোটেলে নির্দিষ্ট মেন্যুতে খাবার সারতে হবে। গত ডিসেম্বরে মরক্কোর মারাকাশ শহরে গিয়ে এটলাস এবং সাহারা মরুভূমি ভ্রমণের সময়ও একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল। তবে একটু তফাৎ ছিল, সেখানে ভ্রমণের সময় ট্যুর অপারেটর একটি নির্দিষ্ট হোটেলে নিয়ে খাবারের মেন্যু নিজেরা পছন্দ করে খেতে পেরেছিলাম। টাকা গুণতে হয়েছে নিজেদেরকেই। এখানে অবশ্য একটা বিষয় আছে। আমাদেরও দেশের ট্যুর অপরারেটররা ঢাকা থেকে কোথাও নিয়ে গেলে যাওয়া-আসা এবং থাকা-খাওয়ার সকল খরচ তারাই ভ্রমণ করেন।
যাকগে দুপরের খাবার খেয়ে আমরা দ্রুত বেরিয়ে পড়লাম খাগড়াছড়ি শহরের কাছেই রিচাং ঝর্ণা দেখতে। দুই স্টেপের এই জলপ্রপাত প্রথম স্টেপে পাহাড় চূড়া থেকে নিচে আরেকটি পাথুরে পাহারে পড়ে সেখান থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে একটু দূরে গিয়ে নিচে পড়ছে। সেখান একটি ছড়ার দিয়ে ছলাৎ ছলাৎ শব্দে জলপ্রপাতের শীতল পানি চলে যাচ্ছে দূরে বহুদূরে…।
এই যাত্রায় রিচাং জলপ্রপাত দেখতে দেখতেই সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়লো। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা জার্নির পর আমরাও এবার ঢাকার পথে যাত্রার প্রস্তুতি নিলাম। রাতেই শ্যামলী পরিবহণের ভাঙাচোরা গাড়িতে চড়ে তুমুল হট্টগোল আর নানা বিতিকিচ্ছার মধ্য দিয়ে শেষ হল আমাদের সাজেক ও খাগড়াছড়ি ভ্রমণ।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com