সাগর, পাহাড়ে দ্বীপে: তৃতীয় পর্ব

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আন্জুমান রোজী,(কানাডা থেকে)

মেঈন আইল্যান্ডে জাপানি গার্ডেন নামে এক মেমোরেবল জায়গা আছে , যেখানে জাপানীদের স্মরণ করা হয়। জাপান-কানাডিয়ান সম্প্রদায় মেঈন আইল্যান্ডে ২০তম শতাব্দীর দিকে দ্বীপের অর্থনৈতিক ও সমাজিক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল। এই গোষ্ঠির সঙ্গে সমগ্র ইউরোপীয়-কানাডিয়ান জনগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, এমনকি গ্রিনহাউস খামারের মতো প্রধান অর্থনৈতিক উদ্যোগের সাথেও জড়িত ছিল। ১৯৪১ সালে মেঈন আইল্যান্ডে বসবাসকারী জাপানী নাগরিকদের সরকার কর্তৃক নিযুক্ত করা হয় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালের জন্য নিউ ডেঞ্জরে পুনর্বাসিত করা হয়। জমির ক্ষতি এবং তাদের সম্প্রদায়ের উপর অত্যাচারের কারণে অনেক জাপানী পরিবার কখনো দ্বীপে ফিরে আসে নাই । তারই স্মৃতি রক্ষার্থে ডিনার বে কাছাকাছি অবস্থিত এই জাপানি গার্ডেন, যা মেঈন আইল্যান্ডের জাপানি-কানাডিয়ান সম্প্রদায়ের মেমরি এবং উত্তরাধিকারকে নিবেদিত। মেঈন আইল্যান্ডের সর্বত্রজুড়ে আঁকিয়েদের রাজত্ব। জল আর তৈলচিত্রের ছড়াছড়ি ছিল বেশ।

সেইসঙ্গে ছিল ভাস্কর্য আর টোটেমের মূর্তি। এক স্বপ্নের মতো দ্বীপ বটে! কবিসাহিত্যিক শিল্পীদের সমাগমে গান, কবিতার এক আবহ অনুভব করা যেত। আমাদের মধ্যেও সেই আলোড়ন ছিল। কখনো জলের ধারে , কখন গাছের ছায়ায় আমরা কবিতা আড্ডা দিয়েছি । গানেগানে গুঞ্জরনও ছিল আমাদের চারপাশ। আসলে পরিবেশ মানুষের অনুভূতিতে অনেককিছু ঢেলে দেয়। আমরাও সেই অনুভূতিতে সাড়া দিয়ে ছুটে বেড়িয়েছি ইচ্ছেমতো। ডেকে বসে পাহাড়ের বুকচিরে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখে কবি ফেরদৌস নাহার কেঁপেকেঁপে উঠছিলেন। বললেন,’প্রকৃতির এমন অপার সৌন্দর্যের কাছে এলে আমার ভেতরটা কেমন হাহাকার করে উঠে!’ বিশাল এই সৌন্দর্যের কাছে মানুষ তো কিছুই না, এর কাছে আমরা যে কত ক্ষুদ্র, ভাবা যায়!’ ইচ্ছে ছিল বোট নিয়ে পাঁচটি আইল্যান্ড ঘুরেঘুরে দেখবো। কিন্তু সাগরের অথৈই জলের কথা ভেবে এই প্ল্যান মাথা থেকে ঝেড়েফেলি। তবে অন্য একটি আইল্যান্ড ঠিক করি দেখার জন্য।

যে আইল্যান্ডটি অন্যান্য আইল্যান্ড থেকে একটু ভিন্ন আবহের। নাম সাটার্না আইল্যান্ড। এই আইল্যান্ডের বৈশিষ্ট্য হলো; এর পুরোবিষয়টা ওয়াইল্ড টাইপের; অর্থাৎ প্রকৃতির নিজস্ব রূপেই সাগরের বুকে দ্বীপটি দাঁড়িয়ে আছে। শহর বা নগরের কোনো ছাপ নেই। জনকোলাহল একেবারেইনেই। ছোট্ট একটি ফেরিঘাট। মানুষের যাতায়াতও অনেক কম। শুধুমাত্র প্রাইভেট বোট যাদের আছে; তাদেরই আসাযাওয়া। স্নিগ্ধ নির্মল এবং নির্জন এক বিশুদ্ধ প্রকৃতি। নীনা আপার গাড়ি নিয়ে ফেরি করে সাটার্নাতে যাই। ফেরি থেকে নেমে গাড়ি নিয়ে আমরা চলতে শুরু করি। পাহাড়ের ঢাল ঘেঁষেঘেঁষে পথ চলেগেছে। তার ওপরদিয়ে আমাদের গাড়ি ছুটেছে। গাড়ি জানালা দিয়ে সেই ঢালের দিকে চোখ পড়তেই গা শিউরে ওঠে। কোথাও-কোথাও থেমে- পাহাড়ের উচ্চতা মাপার চেষ্টা করেছি। সেইসঙ্গে ক্যামেরা বাটন ক্লিক ক্লিক বেজেই চলেছে। অনেকদূর যাওয়ার পর শুরু হয় পায়ে হাঁটার পথ।

সেই পথ ধরেই আমাদের হাইকি করা। উপরে উঠতে উঠতে একেবারে শূন্যের কাছে যাওয়া আবার নিচে নামতে নামতে একেবারে জলের কাছে চলে আসা। সে এক অভূতপূর্ব অনুভূতি। সাটার্না দ্বীপটি ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় উপসাগরীয় দ্বীপের শৃঙ্খলে প্রায় ১২ বর্গমাইল আয়তনের একটি পাহাড়ী দ্বীপ। এটি বিট্রিশ কলম্বিয়ার লোয়ার মেইনল্যান্ডের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। ভ্যানকুভার আইল্যান্ড, এবং উপসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জগুলির সবচেয়ে পূর্বে এই দ্বীপটি। এটি কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা দ্বারা তিনপাশ বেষ্টিত। উত্তর থেকে পয়েন্ট রবার্টস, ওয়াশিংটন, এবং পূর্ব ও দক্ষিণে সানজুয়ান দ্বীপপুঞ্জ। স্থায়ী বাসিন্দা রয়েছে ৩৫০জনের মতো, যদিও এই সংখ্যাটি ব্যস্ত গ্রীষ্মের মৌসুমে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। দ্বীপটির আনুমানিক অর্ধাংশ উপসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের ন্যাশনাল পার্ক রিজার্ভ (জিআইএনপিআর) -এর মধ্যে অবস্থিত যা ২০০৩ সালে বিদ্যমান প্রাদেশিক উদ্যান; অর্থাৎ ইকোলোজিক্যাল রিজার্ভ এবং অন্যান্য ক্রাউন ল্যান্ড থেকে গঠিত হয়েছিল।

এই দ্বীপটি প্রথম আদিবাসীদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছিল, যারা দ্বীপটিকে “লং নোজ”(“Long Nose) নামে অভিহিত করেছিল। ১৮০০-এর দশকে প্রথম ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারীরা আসে। কিন্তু দ্বীপটির আপেক্ষিক বিচ্ছিন্নতা এবং পর্বতশৃঙ্গ স্থলচিত্রের কারণে প্রতিবেশী দক্ষিণাঞ্চলীয় উপসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের চেয়ে এর বিকাশের গতি কম ছিল। ইস্ট পয়েন্টে মোবি ডল অর্থাৎ হত্যাকারী তিমিকে ( ১৫ ফুট লম্বা আর একটন ওজনের এক পুরুষ তিমি) ১৯৬৪ সালে প্রথম অ্যাকুয়ারিয়ামে রাখা হয়। সাটার্না দ্বীপের হেরিটেজ কমিটি পূর্ব পয়েন্টের প্রাক্তন ফগ এলার্ম ভবনটিতে একটি ছোট জাদুঘর পরিচালনা করে; যেখানে দর্শকরা জানতে পারে মোবি ডল এবং সা্টার্নার অনন্য ইতিহাস সম্পর্কে।

সাটার্না দ্বীপে আমরা গাড়িতেই ঘুরেছি বেশি। ম্যাপ ধরেধরে দ্বীপের এপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে চলে যাই। আমাদের নেভিগেশনে ছিলেন কবি ফেরদৌস নাহার। ম্যাপ দেখেদেখে গাইড করছিলেন। নীনা আপা ড্রাইভিং এ ছিলেন আর আমার কাজ ছিল ছবি তোলা। সাটার্না থেকে আমরা সন্ধ্যা হওয়ার আগেই ফিরে আসি। দিন শেষে নীনা আপার নীড়ে ফেরা।বনজঙ্গলে সেই নীড়ে পাখির মতো ঘুমিয়ে পরেরদিন আবার ছুটতে বের হওয়া। কী যে দুরন্তপনা আমাদের উপর ভর করেছিল! মেঈন আইল্যান্ডে আমরা মূলত প্রকৃতিকে বেশি অনুভব করেছি। বিশাল আকৃতির গাছের সমারোহ আর পাহাড়ের গা-ঘেঁষে বৃক্ষরাজির রাজত্ব ছিল মনোমুগ্ধকর। বেশ দূরেদূরে বাড়িঘরের অবস্থান লক্ষ করছিলাম। শেষবিকেলে সূর্যাস্তের নয়নাভিরাম দৃশ্য অবলোকন। ডেকে বসে জাহাজের আসাযাওয়ার দৃশ্য, মনে হয় ঘন্টার পর ঘন্টা এভাবেই কাটানো যায়। দ্বীপের মানুষগুলোকে দেখেছি শুধু ফার্মাস মার্কেটে আর কনসার্টে, তাছাড়া ফেরিঘাটে এলে দেখা যায় কিছু মানুষের আনাগোনা। এমনিতে কোথাও তেমন মানুষের শব্দ পাওয়া যায়না। নীরব শান্ত এমন দ্বীপে শুধু নিজেকেই অনুধাবন করা যায়। (চলবে)

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com