সাগর,পাহাড়ে দ্বীপেঃপর্ব দুই

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আন্জুমান রোজী,(কানাডা থেকে)

পরের দিন সূর্যআলো ফোঁটার আগেই আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। এমন ঘন জঙ্গলে সকালের রূপ দেখার ইচ্ছা মনের ভেতর চনমন করে উঠলো। ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে। গাছের পাতার ফাঁকেফাঁকে সূর্য উঁকিঝুঁকি মারছে। নয়নাভিরাম সকালের নরম পরিবেশ আমার চোখ, মনকে অবশ করে দেয়। চারদিকে সবুজ আভায় উদ্ভাসিত সজীব পরিবেশ। তা দেখে কবি ফেরদৌস নাহার বলেন, ‘ এমন বিশুদ্ধ সবুজ যত পারো চোখ পেতে তুলে নাও।” সকালের প্রাতরাশ সেরে প্রায় প্রতিদিনই নীনা আপার গাড়ি নিয়ে আমরা তিনজন বের হয়ে পড়তাম দ্বীপটি দেখার জন্য। নীনা আপার গাড়িকে নাম দিয়েছিলাম, আমাদের পঙ্খীরাজ। যেভাবে আমরা পাগলের মতো ছুটেছি পঙ্খীরাজকে নিয়ে, সে কিন্তু একটুও বিগড়ায়নি। সুবোধ বালকের মতো আমাদের সব অত্যাচার সহ্য করে নিয়ে গেছে কতকত জায়গায়! তবে নীনা আপার ড্রাইভিং এর প্রশংসা করতেই হয়। এমন উঁচুনীচু পাহাড়ী ঢালু পথ বেয়ে ড্রাইভ করা চাট্টিখানি কথা নয়, আপাকে যেন মনে হয় এক পাহাড়ীকন্যা। পাহাড়ের সঙ্গে মিলেমিশে এই নির্জন দ্বীপে একাকী কিভাবে থাকছেন, তা ভাবলে অবাকই লাগে!

আমরা বেশীরভাগ সময় হয় গাড়িতে নাহয় ফেরিতে থেকেছি। তবে জলেই ভেসেছি বেশি। কারণ, দূরদূরান্তে বা দ্বীপ থেকে দ্বীপান্তরে যাতায়াতের মূল বাহন হলো একমাত্র ফেরি। তাছাড়া পুরো ব্রিটিশ কলম্বিয়া সাগর আর পাহাড় বেষ্টিত। কি জলে, কি স্থলে ; চোখের সীমানায় শুধু জল আর পাহাড়ের দৃশ্য। আমাদের গাড়ি দ্বীপের সমতলে পিচঢালা পথঘেষে উঁচুনীচু পাহাড় ছাড়িয়ে দুপাশে সবুজের সারি ভেঙ্গে ছুটেছিল। হেঁটে যাওয়া পথচারীর সঙ্গে মাঝেমাঝে হাত নেড়ে নীনা আপা হাই হ্যালো করছিলেন। আর কখনো কখনো গাড়ি থামিয়ে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন। দ্বীপে বসবাসরত মানুষের আন্তরিকতা দেখে অবাকই হতে হয়। মনে হয় কত যুগযুগ ধরে তাদের আমরা চিনে এসেছি। এদের আবেগ যেন সাগরের মতো গভীর আর হৃদয় উপচানো আন্তরিক ভালোবাসা তাদের। সাগর, পাহাড়, প্রকৃতির সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে কেমন জড়াজড়ি করে আছে তারা! সবুজ প্রকৃতির প্রশান্তি নিয়ে আমরা ঘুরে বেড়াই। ঘুরতে ঘুরতে প্রায়ই সময় জর্জিনা পয়েন্টের লাইট হাউজের কাছে এসে বসি। যা দ্বীপের একপার্শ্বে দাঁড়িয়ে আছে।

গলফ আইল্যান্ডস অর্থাৎ .ব্রিটিশ কলম্বিয়া ২০০ এরও বেশি দ্বীপপুঞ্জে গঠিত। ব্রিটিশ কলম্বিয়ার উপসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জগুলি পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিদর্শক গন্তব্যস্থলগুলির একটি। এই দ্বীপগুলির মধ্যে রয়েছে  পাঁচটি প্রধান দ্বীপ যা ভ্যানকুভার এবং ভিক্টোরিয়ার মধ্যে দৈনিক ফেরিগুলি দ্বারা পরিসেবা প্রদান করে থাকে। সল্ট স্প্রিং, প্যান্ডার, মেঈন, গ্যালিয়ানো এবং সাটার্রনা সবচেয়ে জনপ্রিয় উপসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ।  এই দ্বীপগুলি মূলত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মনের প্রশান্তি ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত। সারাদিন এই দ্বীপে অনেকে পাথুরে শিলার সন্ধানে ব্যয় করছে। আবার কেউকেউ পানিতে কায়াকিং অর্থাৎ ক্যানভাস দিয়ে মোড়া ছইওয়ালা ছোট সরু নৌকা বইছে । আমরা আছি মেঈন্ আইল্যান্ডে যা ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার দক্ষিণ উপসাগরীয় দ্বীপের শাখা। ২১ বর্গ কিলোমিটার  অর্থাৎ ৮.১ বর্গ মাইলের এই দ্বীপটি। এটি ব্রিটিশ কলম্বিয়া ও ভ্যাঙ্কুভার দ্বীপের লোয়ার ম্যানল্যান্ডের মধ্যে অবস্থিত এবং  এর ১০০০ জনসংখ্যা রয়েছে। দ্বীপটির দক্ষিণে রয়েছে মাউন্ট পারেক নামে,৮৩৭ ফুট উঁচু এক শিখর।

 একদিন লাইট হাউজের কাছে  কিছুক্ষণ বসে থাকার পর দুজন আগন্তকের সাথে পরিচিত হলাম। তারা মেঈন আইল্যান্ডের বাসিন্দা। তাদের একজন বললেন, ‘তিনদিন পর দেখবে, তুমি কেমন হালকা অনুভব করছো। সবরকম জরাযন্ত্রণা মাথা, শরীর থেকে দূর হয়ে যাবে।’ কথাটা সত্য, তেমনই অনুভব করতে করতে আমরা ফিরে এলাম । এদের সাথে গল্প করেও দ্বীপটি সম্পর্কে অনেককিছু জানতে পারলাম। মূলত বেশীরভাগ মানুষ গ্রীষ্মের ছুটিতে এখানে অবকাশ যাপন করতে আসে। অনেকে পুরো পরিবার নিয়ে এসে সম্পুর্ণ গ্রীষ্মটা উপভোগ করে যায়। তাদের বেশীরভাগেরই নিজস্ব বাড়ি আছে এই দ্বীপে। গ্রীষ্মে অবকাশ যাপনের অনেকরকমের সুবন্দোবস্তও রয়েছে। যেমন, হাইকিং, বাইকিং, ফিশিং এবং বোটিং। তাছাড়া পুরো দ্বীপটি জুড়ে রয়েছে আর্ট কালাচারের বিভিন্ন শপ। যেখানে রয়েছে শতশত বছরের ইতিহাস।

একটি মিউজিয়াম রয়েছে, যেটি একসময় জেল ছিল। উনিশ শতকের দিকে অপরাধীদের ও্খানে বন্দী করে রাখা হত। প্রতি শনিবার ফার্মার্স মার্কেট বসে। আমরা এমন এক শনিবার পেয়ে যাই। সুন্দর পরিপাটি ছিমছাম পরিবেশে মার্কেটটি। সব পসরাতে হাতের তৈরী জিনিস। খাবার সামগ্রী থেকে শুরু করে সবরকম আর্ট , জুয়েলারি ছিল হাতের তৈরি। সবচেয়ে যে বিষয়টি আমি আবিস্কার করতে পেরেছি এই দ্বীপটিতে , তাহলো, এখানে বেশিরভাগ বসবাসকারী মানুষ কেউ না কেউ কোনো না কোনো সৃষ্টিশীল কাজ নিয়ে আছেন। কবি, সাহিত্যিক, আর্টিস্ট, গায়ক এদের আনাগোনাই বেশি দেখলাম। এদের ভিড়ে আবার ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেকচার , চাটার্ড একাউন্টেন্ট  এদেরকেও পেয়েছি। এমনি আরো অনেক প্রতিষ্ঠিত লোকেদের সমাগম এখানে। অনেকের সাথে কথা বলে যেটা বুঝলাম, অন্য দ্বীপের সাথে  মেঈন আইল্যান্ডের পার্থক্য হলো, এই দ্বীপটি খুব বেশি সাজানো, পরিপাটি এবং শিল্পস্বত্ত্বায় পূর্ণ। যাকে বলা যায়, শান্তিপুর্ণ, স্বস্তিদায়ক এক সাংস্কৃতিক  ক্লাসিক পরিবেশ।

এক বিকেলে ফান্ড রাইজিং এর জন্য একটি কনসার্ট ছিল। দ্বীপের বিভিন্ন পয়েন্ট অর্থাৎ দ্বীপ রক্ষাণাবেক্ষণের জন্য কয়েকটি পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়। তেমনই একটি পয়েন্ট, সেন্ট জন পয়েন্টের জন্য এই কনসার্ট ছিল। চৌঠা জুলাই পর্যন্ত ২ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। ২০১৭ এর ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪.৩ মিলিয়নের টার্গেট নিয়ে এই দ্বীপের কমিউনিটি চূড়ান্ত প্রচারাভিযান নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বসেবসে অনুষ্ঠানটি দেখার সময় আমার দুখী সুন্দরবনের কথা ভাবছিলাম। বাংলার মানুষ এখনো বুঝেনি প্রকৃতি মানুষকে কিভাবে আগলে রেখেছে। মেঈন আইল্যান্ডে মানুষের প্রকৃতিপ্রেম দেখে বিস্ময় প্রকাশ করতে হয়। কিভাবে সন্তান সমতুল্য করে আগলে রেখেছে এই প্রকৃতিকে।(চলবে)

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com