সম্পর্ক গড়তে গেলে শুধু ভালবাসাই লাগে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

আমাদের এ প্রজন্মের একটা বড় অংশের অন্যতম ক্রাইসিস, নিঃসঙ্গতা…। বিচ্ছিন্নতা বা একাকীত্ব…এ ধরনের নিঃসঙ্গতা নয়…। সত্যিকারের নিঃসঙ্গতা…। মা-বাবার পরে আর ‘নিজের’ বলতে কেউ না থাকা…। নিজের কারও সঙ্গ না-পাওয়া…।
এ একাকীত্ব আমি আশৈশব অনুভব করে আসছি…। এই শূন্যতাবোধে আজও এতটুকু আদরমাটির প্রলেপ পড়েনি…।

তখন আমি ছোট…। ক্লাস ওয়ান-টু হবে…। হিন্দি সিনেমা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে এমন কোনও এক অ্যাডভান্সড সহপাঠী শেখাল, চোখের পাতা পড়ে গেলে, তাকে হাতের ওপরে রেখে, চোখ বুজে কিছু উইশ করে, এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিতে পারলে, সে উইশ নাকি পূরণ হয়ই…।
মনে আছে, এটা শেখার পর প্রায়ই চোখ কচলে চোখের পাতা হাতে নেওয়ার চেষ্টা করতাম, আর চোখ বুজে চাইতাম একটা ভাই দাও, একটা বুনু দাও…।
প্রতিটা পাতাই উড়ে গিয়েছিল সেই বিশ্বাসী শৈশবে…। কিন্তু উইশ পূরণ হয়নি…।
তখনও জানতাম না, আমার উইশের কথা জানার আগেই তা পূরণের চেষ্টা ছিল বাবা-মায়েরও…।

রক্ত-কান্না-যন্ত্রণায় সে চেষ্টা নষ্ট হয়েছিল কোনও এক বর্ষাদিনে…।

জানতাম না, তাই অভিমান হতো…।
বিশেষ করে যখন খানিক লাইফ সায়েন্স আর খানিক লাস্ট বেঞ্চ টিউটোরিয়ালের কল্যাণে জেনে ফেলেছিলাম, কেবল মা-বাবা চাইলেই আমার ইচ্ছেটুকু পূরণ সম্ভব…। অনেক পরে, ঠুনকো অথচ তীক্ষ্ণ কিশোরীবেলায় যখন আসল সত্যিটা জেনেছিলাম, তখন অদ্ভুত এক দমচাপা বিস্ময় দলা পাকিয়ে গিয়েছিল আলজিভের নীচে…এমনটাও হয়…! সে বিস্ময়ের ভাল নাম কষ্ট…। না ছুঁতে পারা সেই ভাই বা বুনুর জন্য আলাদা করে একটা কষ্ট সে দিনই তুলে রেখেছিলাম বুকের বাঁ দিকের কুঠুরিতে…।

যাই হোক, ছোটবেলা জুড়ে তো বটেই, খেলতে-পড়তে-হাসতে-কাঁদতে-ভাঙতে-গড়তে-লড়াইয়ে-আপসে……আজও, এই মুহূর্তেও, নিজের একটা কেউ না-থাকার এক বুক হু হু নিয়ে বাঁচি আমি…। এ শূন্যতা গোপন না হলেও, বড্ড ব্যক্তিগত…।

এই ক্রাইসিসের জায়গা থেকেই হয়তো খুব সহজে জুড়ে যাওয়ার আর অনায়াসে জুড়িয়ে নেওয়ার একটা প্রবণতা রয়েছে…। জানি না…। দূরের মানুষদের শত আঘাত আর কাছের মানুষদের শত সতর্কতার পরেও নানা রকমের সম্পর্কের ধাপে হ্যাঁচোড় প্যাঁচোড় করে চড়তে গিয়েছি…। অবধারিত ভাবে ফের পড়েছি, একটু কাতরে উঠে পড়েছি…। আর বারবার নির্লজ্জের মতো, লোভীর মতো…একটু একটু করে ঘেঁষে গিয়েছি…।

আমি জানি, এ কথাগুলো, এই অনুভূতিগুলো আমার একার নয়…। আশপাশে চেয়ে দেখি যখন, সবাই একসঙ্গে কাজ করি যখন, সময় কাটাই যখন, পাশাপাশি চুপ করে বসে থাকি যখন….বুঝতে পারি, কী ভীষণ রকম অসহায় একটা অসুখ বয়ে বেড়াচ্ছে এ প্রজন্ম…। নিঃসঙ্গতার সে অসুখে কত কত ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে মরে বেঁচে রয়েছে আমার সহযোদ্ধারা…!

তবু আমি ভাগ্যবান, সব কিছুর মধ্যেও ভিড় করে থাকে ভালবাসারা…। যতই নিঃসঙ্গতা থাক, হিসেববিহীন মামা-মাসি-কাকু-পিসিদের সৌজন্যে ভাই-বোনের সংখ্যায় কখনও টান পড়েনি…।
তার পর তো এমন একটা সময় পার করে ফেলেছি, ‘রক্তের সম্পর্ক’ নামের শব্দবন্ধটা অর্থহীন প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে…। প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে, সম্পর্ক গড়তে গেলে শুধু ভালবাসাই লাগে…। রক্ত ফক্ত নয়..।

আর এই সমস্তটা নিয়ে পেরিয়ে গেল আরও একটা ভাইফোঁটা…। আমার নিঃসঙ্গতার চাদরে এলোমেলো রঙ মাখা একগাদা তুলি ঘষে গেল আরও এক বার…। গভীরতম আর নিজেরতম শূন্যতায় আদরমাটির প্রলেপ পড়ল না ঠিকই, কিন্তু এত আদরমাটি জমিয়ে দিল, তা দিয়ে আমি একটা ছোট্ট, নরম পাহাড় বানিয়ে রেখেছি হৃদয়ের উঠোনে…।
এই প্রাণ ঢালা উৎসবের মরসুমে, মুহূর্তেরা মুহূর্তের কাছে ঋণী হয়ে আরও এক বার মনে করিয়ে দিল, বাঁধনবিহীন অকারণ বাঁধনেরাই আদতে বেঁধে রাখতে পারে…। শুধু মনের পাশে মন সাজাতে জানা চাই…।

শুভ ইচ্ছেরা ফোঁটায় ফোঁটায় আপনিই ছেয়ে যায় কপাল জুড়ে…।

 ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com