সবুজকন্যা সাজেক..এক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নিজামুল হক বিপুল

‘সাজেক’। মানে সাজেক ভ্যালি। পাহাড় আর মেঘ যেখানে খেলা করে প্রতিনিয়ত। বৃষ্টি যেখানে নেমে আসে যখন তখন। যেখানে সুন্দর হয়ে উঠে ভীষণ রকম সুন্দর, অপূর্ব। যেখানে নয়ন জুড়ে যায় সবুজের সমারোহে। উঁচু-নিচু পাহাড়-টিলার পিচ ঢালা পথ ধরে দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি যেখানে মুহুর্তেই উবে যায় সবুজের আহবানে। সেই দুর্গম জনপদ হচ্ছে ‘সাজেক’। যাকে বলা হয় বাংলার দার্জিলিং।
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির মধ্যে প্রথম দুই জেলার দৃষ্টি নন্দন স্পট আগেই ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছিল। এমনকি একাধিকবার যাবার সুযোগ হয়েছিল ওই দুই জেলায়। শুধু বাদ ছিল খাগড়াছড়ির সবুজকন্যা ‘সাজেক’। সেই সাজেক আমার কাছে অদেখা ছিল, অধরা ছিল। তাই সময় ও সুযোগের মিলন ঘটার অপেক্ষায় ছিলাম। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে গত বছর আগস্টে।
দিনটি ছিল বুধবার। ২৫ আগস্ট। দুপুরে হঠাৎ করেই সেলফোন বেজে উঠলো। ওপ্রান্ত থেকে স্নহেভাজন ছোট ভাই সাংবাদিক শাহজাহান মোল্লার আমন্ত্রণ- ভাই সাজেক যাবেন নাকি? একটি ট্যুারজিম কোম্পানি নিয়ে যেতে চাচ্ছে। তাকে কিছুক্ষণের মধ্যে জানাচ্ছি বলে ফোন কেটে দিলাম। তারপর প্রায় ঘণ্টা তিন পর তাকে ফোন করে জানালাম আমার সম্মতি। সন্ধ্যার মধ্যেই নিশ্চিত হলাম সাজেক যাবার বিষয়টি।

আমাদেরকে নিয়ে রাত পৌনে ১২টায় রাজধানীর আরামবাগ থেকে শ্যামলী পরিবহনের বাস ছাড়বে খাগড়াছড়ির পথে। সাড়ে ১১টার মধ্যেই যেন সেখানে পৌঁছে যাই। সঙ্গী বাংলানিউজের রিপোর্টার ছোট ভাই শাহেদ এরশাদ। রাতের খাবার সেরে বাসা থেকে রওয়ানা হলাম আরামবাগের পথে। কাকরাইল মোড় পার হওয়ার পরই শুর হরু হলো তীব্র যানজট। অসহ্য যন্ত্রণা। গরমে হাপিয়ে উঠার অবস্থা। পাঁচ মিনিটের পথ। অথচ কাকরাইল মোড় থেকে আরামবাগ পর্যন্ত যেতে সময় লাগল পুরো পৌনে এক ঘণ্টা। প্রবাদ আছে, সকালের সূর্যই বলে দেয় দিনটা কেমন যাবে। বুঝলাম আমাদের সাজেক যাত্রায় সামনে অনেক দূর্গতি আছে।
অনেক ঝক্কি ঝামেলা অতিক্রম করে নির্ধারিত সময়ের ১৫মিনিট আগে রাত সাড়ে ১১টায় শ্যামলী কাউন্টারে পৌঁছলেও আমাদের বহনকারি গাড়িটি তখনও কোন খবর নেই। কাউন্টারের সামনেই পায়চারী। টানা এক ঘণ্টারও বেশি সময়। পৌনে ১২টার গাড়ি আসলো রাত পৌনে একটায়। অত:পর গাড়িতে নির্ধারিত আসনে বসলাম। গাড়ি ছাড়লো তারও ১৫ মিনিট পর রাত একটায়। গন্তব্য পাহাড় কন্যা খাগড়াছড়ি।
তীব্র যানজটে নাকাল রাজধানীর চৌহদ্দী পেরুতেই আমাদের কেটে গেল আরো দেড় ঘণ্টারও বেশি সময়। কাঁচপুর শীতলক্ষ্যা সেতু পার হয়ে মনে হল এবার বোধহয় যাত্রাটা নিরবিচ্ছিন্ন হবে। কিন্তু বিধিবাম! দুর্ভোগ পিছু নিলে যেন সহজে ছাড়তেই চায় না। সোনারগাঁও থেকে দাউদকান্দি মেঘনা সেতু পর্যন্ত টানা যানজট। গাড়ি চলছে ধীর লয়ে। যখন আমরা কুমিল্লা পৌঁছলাম রাত তখন ভোর হয় হয়। হোটেল ছাড়ার পর গাড়ি উর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে থাকলো পাহাড়ের পথে। ধীরে ধীরে ভোরের সূর্য উঁকি দিতে শুরু করলো। আমাদের গাড়ি ঢুকে গেল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বারৈরহাট থেকে খাগড়াছড়ির দিকে। পাহাড়ী আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটছে গাড়ি। সকাল সাড়ে আটটার দিকে আমরা পৌঁছলাম খাগড়াছড়ি শহরে। তারপর কিছুক্ষণের বিরতী, সকালের নাস্তা।
সকাল ১০টার দিকে চান্দের গাড়িতে করে রওয়ানা হলাম স্বপ্নের গন্তব্য সাজেকের পথে। সাজেক হচ্ছে রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার একটি ইউনিয়ন। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য হাতছানি দিয়ে ডাকে দেশি-বিদেশী পর্যটকদের। এক সময় এই সাজেক ছিল দূর্গম জনপদ। ছিল পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠনগুলোর নিরাপদ আবাসস্থল। শান্তি বাহিনী আর সশস্ত্র বাহিনীর সংঘাত লেগেই ছিল এই অপরূপ সৌন্দর্য্যরে লীলাভূমিতে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এখন সেই অশান্ত জনপদে এখন শান্তরি হাওয়া বইছে। আগের চেয়ে যাতায়াত সুবিধাও এখন অনেক সহজ। এ কারণে বাংলার দার্জিলিং খ্যাত ‘সাজেক’ এখন পর্যটকদের কাছে সবুজ খনি। এখানে গেলে এক সঙ্গে উপভোগ করা যায় ‘মেঘ’ এবং ‘পাহাড়’কে। প্রাণভরে নেয়া যায় নির্মল নিঃশ্বাস।
চান্দের গাড়ির চালক অল্প বয়সী মুন্না। তার পাশেই বসলাম। গাড়ি চলছে আর মুন্না আমাদের সঙ্গে কথা বলছে। কথার ফাঁকে ফাঁকে সাজেকের টুকিটাকি কিছু তথ্য জেনে নিলাম তার কাছ থেকে। খাগড়াছড়ি থেকে দীঘিনালা। মুন্না জানালো প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগবে দীঘিনালা পৌঁছতে। উঁচু-নিচু পাহাড়ী সড়ক। পিচঢালা। মাঝে মাঝে খানাখন্দক। মুন্না অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে খানাখন্দক এড়িয়ে তার চান্দের গাড়িতে আমাদেরকে নিরাপদে নিয়ে ছুটে চলছে। দিঘীনালা পৌঁছে হঠাৎ করেই দেখলাম মুন্নার চান্দের গাড়ি টার্ন নিয়েছে লংগদুর পথে। জিজ্ঞেস করতেই বললো স্যার, দিঘীনালা বাজার থেকে গাড়ির জ্বালানী নিতে হবে। বুঝতে বাকি থাকল না দিঘীনালা বাজারের উল্টো পথে অর্থাৎ লংগদুমুখি পথেই জ্বালানী তেলের দোকান।
রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলাও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে জন্য বিখ্যাত। দিঘীনালা বাজার থেকেই সহজে লংগদু পৌঁছা যায়। এখান থেকে শান্তি পরিবহণের বাস লংগদু পর্যন্ত যেয়ে থাকে। আর দূরত্বও কম। মাত্র ৩৪ কিলোমিটার। এখানকার সৌন্দর্য্যও পর্যটকদের কাছে টানে।
যাকগে, জ্বালানী নিয়ে আমাদের বহনকারী চান্দেও গাড়িটি আবারো ছুটে চললো সাজেকের পথে। দিঘীনালার পর গাড়ি থামলো বাঘাইহাট সেনা ক্যাম্পের চেকপোস্টে। চোখে পড়লো চান্দের গাড়ির দীর্ঘ সারি। শুধু চান্দের গাড়িই নয়, অনেক প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাসও দাঁড়িয়ে আছে লাইনে।
চালক মুন্না জানালো, এখান থেকে সব গাড়ি এক সঙ্গে যাবে সাজেকের পথে। থাকবে সেনা টহল। এর আগে সেরে নেয়া হবে চেকিং পর্ব। পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থেই এই সেনা স্কট। আর এখান থেকে সাজেক পৌঁছতে সময় লাগবে আরো অন্তঃত দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা।
চেকপোস্টে আইনী আনুষঙ্গিক কাজ শেষে চোখে পড়লো প্রায় শ’তিনেক গাড়ির দীর্ঘ সারি। টানা তিন দিনের ছুটির সুযোগে পর্যটকরা দলবেঁধে ছুটেছেন বাংলার দার্জিলিং সাজেক দর্শন করতে। সাজেকের সুউচ্চ পাহাড় থেকে মেঘের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে। সবুজ অরণ্যের নির্মল বাতাস গ্রহণ করতে দীর্ঘ পাহাড়ী পথ অতিক্রম করে হাজারো পর্যটক ক্লান্তেিক ছুটি দিয়েছেন।
সেনা টহলে আবারো পাহাড়ী পথ ধরে ছুটতে থাকলো আমাদের বহনকারী চান্দের গাড়ি। গাড়িতে থাকা ১২ যাত্রীর কয়েকজন ভাদ্রের কাঠ ফাটা রোদ আর তীব্র গরমকে চোখ রাঙানি দেখিয়ে গাড়ির ছাদে চড়েছেন। শুধু আমাদের গাড়িরই নয়, প্রায় প্রতিটি গাড়ির ছাদেই চড়েছেন পর্যটকরা। আমরা কয়েকজন ভিতরে বসেই উপভোগ করার চেষ্টা করছি দু’পাশের ঘন সবুজ অরণ্যকে।
বাঘাইহাট থেকে সিজক পৌঁছে আরেক দফা বিশ্রাম চান্দের গাড়ির। এখানেও প্রায় সব গাড়ি লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সিজকে রাস্তার পাশেই ছোট একটি ঝর্ণা। আট-দশ ফুট উপর থেকেই পাথুরে পাহাড় ঘেষে ছলাৎ ছলাৎ শব্দে পানি পড়ছে অবিরাম। সেই ঝর্ণার শীতল জলে তীব্র গরমে অতিষ্ঠ পর্যটকরা শরীর ভিজিয়ে নিচ্ছেন। আহা কি শান্তি…।
মুন্না জানালো, স্যার, এবার এখান থেকে একদম খাড়া তিন কিলোমিটার পাহাড়ী সড়ক বেয়ে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এরপরই দেখা মিলবে…। টের পেলাম আমরা কাংখিত গন্তব্যের অতিসন্নিকটে। ‘সাজেক’ নামের ঘন সবুজ পূর্ণ যৌবনা পাহাড়ী জনপদ হাতছানি দিয়ে ডাকছে তার সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য। যেখানে পৌঁছলেই সব ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে। গাড়ি ছুটে চলছে অপেক্ষাকৃত সরু খাড়া আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পিচঢালা রাস্তা বেয়ে। এই রাস্তা দিয়ে দু’টি গাড়ি ক্রসিং খুবই বিপদজনক। রাস্তার নিচে গভীর খাদ। একবার ফসকে গেলে আর ফিরে আসার সুযোগ নেই। তবে দুই পাশে শুধুই সবুজ আর সবুজ। এমন দৃশ্য দেখে যেতে যেতে ধীরে ধীরে চোখে পড়ছে সাজেকের হƒদয় জুড়ানো সৌন্দর্য্য।
দুপুর দেড়টায় যখন সাজেকের উচুঁ পাহাড়ে চান্দের গাড়ি পৌঁছল তখন ভাদ্রের তালপাকা গরম আর তীব্র রোদ।
গাড়ি থেকে নেমেই আমরা ছুটে চললাম আমাদের জন্য আগে থেকেই সংরক্ষিত ট্রাইবাল কটেজ ইমানুয়েল এ। প্রথমেই গোসল সেরে নিয়ে দুপুরের খাবার সাবার করলাম। তারপর একটু বিশ্রাম।
বিকেল চারটার দিকে যখন বের হলাম সাজেক’কে নিজের মত করে উপভোগ করতে তখনই আকাশে মেঘের ঘনঘটা। অদূরেই সীমান্তরে ওপাড়ে মেঘালয় পাহাড়ের দিকে চোখ পড়তে দেখা গেল ঘন মেঘ। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝুম ঝুম বৃষ্টি। তুমুল বৃষ্টিতে সব প্রায় পন্ড। কিন্তু পর্যটকরা রোদ-গরমের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে যেভাবে সাজেক পৌঁছেছেন, ঠিক সেভাবেই বৃষ্টিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দল বেঁধে নেমে পড়েছেন সাজেক এর রুইলুই পাড়ার শান্ত সড়কে।
টানা প্রায় দুই ঘণ্টার বৃষ্টি শেষে জমে উঠলো পাহাড়ের সঙ্গে মেঘের মিতালী। বৃষ্টি থেমে যাবার পর পুরো এলাকা জুড়ে সাদা মেঘের ভেলা। কী দারুণ সে দৃশ্য। চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। সেই মেঘকেই দারুণ উপভোগ করেছেন শত শত পর্যটক। গাড়ি হেড লাইট জ্বালিয়ে ছুটছে রুইলুই পাড়া থেকে কংলাক পাড়া এলাকার দিকে।
এর আগে এই মেঘ দেখতেই আমি ছুটে গিয়েছিলাম বান্দরবানের নীলগিরি আর নিলাচল-এ। কিন্তু মেঘের দেখা মিলেনি। এবার সেই মেঘ আমাকে হতাশ করেনি। সাজেক এ যাওয়া পর্যটকরা মেঘ এর মধ্যেই যেন হারিয়ে গিয়েছিলেন।
শুধু বৃহস্পতিবার বিকেলই নয়, শুক্রবার সকালেও মেঘ খেলা করেছে পাহাড় জুড়ে। এমনকি ঢুকেছে কটেজের খোলা জানালা দিয়ে একেবারে পর্যটকের বিছানা পর্যন্ত। প্রকৃতির এমন সৌন্দর্য্য দারুণ উপভোগ করেছেন। (চলবে)

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com