সংসার সুখের হয় নারীমানুষের গুনে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

কনকচাঁপা

 আগেই বলেছি আমি একজন পর্যবেক্ষক ধরনের মানুষ। একদম শিশু বয়স থেকেই এই আগে পিছে ডাইনে বায়ে চোখ রাখা আমার অভ্যাস। আমরা সংসার করতে গিয়ে সব বাজার ঘাট হাতের কাছে না পেলে অস্থির হয়ে যাই,কাগজে কলমে সব কিছু হিসেব মত চাই।কিন্তু যাদের কথা বলবো তারা,খুব অল্প বা একদমই নাই নাইয়ের মধ্যেও পরিবারের সবার চাহিদা সময়মত মিটিয়েছেন।আসলে এটাই একজন মহীয়সীর কাজ। আমার দাদীমার গল্প বলি।তিরিশ বত্রিশ বছর বয়সে বিধবা হন তিনি।অসম্ভব স্বচ্ছল অবস্থা থেকে একটা নিদারুণ অবস্থায় পড়লেন।দাদাভাইয়ের কর্মস্থল জলপাইগুড়ি থেকে একেবারে ঘরের সৌখিন জিনিসপাতি বিক্রি করে সিরাজগঞ্জ এর গ্রামে চলে এলেন। ইচ্ছে করলে বিয়ে কর

বড়বোন পারুল আপার সঙ্গে ধান ক্ষেতে লেখক

তে পারতেন।কিন্তু একমাত্র খোকাকে বুকে নিয়েই শশুর বাড়িতেই থেকে গেলেন।একা মহিলা মানুষ, গুছিয়ে সংসার করা চাট্টিখানি কথা নয়।খোজা টাইপ একজন লোক নিয়োগ করলেন সার্বক্ষণিক সাহায্যকারী হিসেবে। ছেলেকে ভালো ইস্কুলে পড়ানোর জন্য দুরগাঁয়ে জায়গীর রাখলেন।একলা মানুষ, ওই টাবু দাদাকে দিয়েই ঘরের সব কাজ করাতেন।হাট থেকে সদাই আসতো সন্ধ্যাবেলা। কলাপাতায় মোড়ানো সব বাজার।ছোট মাছ গোস্ত,মুরগী, কবুতর। কখনোই তাকে অস্থির হতে দেখিনি।

কেরাসিন এর কুপি হাতে নিয়েই ধীরে ধীরে সব গুছিয়ে ফেলতেন।আম্মা তার একমাত্র পুত্রবধূ ছিলেন বলে তাকে তেমন কাজ করতে দিতেন না।কোন সময় মশলা বাটতেন কোন সময় পিয়াজ কাটতেন টেরই পাওয়া যেতো না।খেতে বসলে বুঝতাম এই রান্না স্বর্গ থেকে আসে।খুব কম মশলায় রাধা মোমের মত বেগুন আলুর মাছ চচ্চড়ি, মাশকলাইয়ের ডাল,কিছু ভর্তা,আহা!!!! আমার দাদীমার হাতের গোস্ত না খেলে সে কখনোই বুঝবেনা আসলে একটা ডিশ কিভাবে এমন মজা হতে পারে! তার সারাবছরের সেমাই লাচ্ছা চিনি চা পাতা আম্মা পাঠাতেন।কিন্তু আর বাকি কিছু খুব নিপুণ হাতে তিনি ম্যানেজ করতেন কিভাবে এটা ভেবেই আমি হয়রান।আমরা বাড়ি গেলে অনেক মেহমান আসতো। তাদের সার্বক্ষণিক চা নাস্তাও কিভাবে জোগাতেন আমি বুঝতেই পারিনা।এ জায়গাতেই আমার পর্যবেক্ষণ ফেল করেছে।আমার নানীমা ছিলেন খুবই সাদাসিধা মানুষ। নানাভাই ছিলেন ভয়ানক রাগী মানুষ। নানাভাই ইচ্ছেমত সারাদিন একটার পর একটা সদাই নিয়ে আসতেন।কিন্তু হয়তো রশুন ফুরিয়ে গেছে,এই কথাটাই বলার সাহস পেতেন না নানীবুজি!!! প্রতি বেলার ভাত সময় ধরে জোহর আর এশার অব্যবহিত পরেই গুছিয়ে দিতে হতো।ভর্তা নানাভাই নিজ হাতে মাখাতেন।তার উপকরণ সব গুছিয়ে অনেকজন ছেলে মেয়ে চাকরবাকর সহ সবার ভাতই একজায়গায় কোন শব্দ ছাড়া গুছিয়ে দিতে হত।ভুলভাল হলে রামধমক! নানীবুজি কিভাবে এতকিছু ম্যানেজ করতেন আল্লাহই জানেন।আর একটা ব্যপার ছিল,স্কুল কোয়াটার এ থাকতেন তারা।পাশেই ছিল গোসাইবাড়ি হাট।রোজ বুধবারে হাট বসতো।হাটে ক্লান্ত আত্মিয়স্বজন সব নানীবুজির সঙ্গে দেখা করতে যেতেন।নানীবুজি তাদের দলবেঁধে ভাত খাওয়াতেন।দু একদিন এমন হলে হয়,বছরভর এমন হলে নানাভাইয়ের বিরক্ত হওয়াই স্বাভাবিক, নানীবুজি নানাভাইকে ভয় পেতেন,কিন্তু এই কাজগুলো নীরবেই একরোখা ভাবে করে যেতেন। কোন ভিক্ষুকক এলে তাকে খাওয়ানো নাওয়ানো নানীবুজির প্রিয় কাজ ছিল।আমার নানীবুজি অনেকগুলো ভিক্ষুকের সন্তানকে নিজ সন্তানের মত মানুষ করেছেন! এভাবেই আমার দেখা মহীয়সী গন নাই নাইয়ের মধ্যে থেকে নিজের সংসার নিজ সন্তান,নিজ প্রতিবেশী, আশেপাশের সমাজ সংসার কে নিজ দায়িত্বে ভালবেসে আপন করে আশ্রয়, সেবা দিয়ে পুরো পরিবেশ কে বদলে দিয়েছেন।তারা কখনোই বলেননি বাজার থেকে জিরা না আনলে আজ ভাত রাধবোই না! হাহাহা।আমার মা এবং শাশুড়ির কথা আরেকদিক বলবো।

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com