শুভ জন্মদিন স্যার এডমন্ড হিলারি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাবলু ভট্টাচার্য

মাউন্ট এভারেস্টের নাম কে না জানে? এটি হিমালয় পর্বতমালায় অবস্থিত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে শীর্ষবিন্দুর উচ্চতার হিসেবে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে এর উচ্চতা ৮,৮৪৮ মিটার (২৯,০২৯ ফুট)। এটি হিমালয় পর্বতমালার একটি অংশ, নেপাল এবং চীনের সীমানার মধ্যে এর অবস্থান।

যুগ যুগ ধরেই এই শৃঙ্গ জয় করার ইচ্ছা অনেকেরই। অনেক অভিযাত্রী জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছেন এই শৃঙ্গ জয় করতে গিয়ে।

স্যার এডমন্ড পার্সিভাল হিলারি ছিলেন নিউজিল্যান্ডের একজন পর্বতারোহী এবং অভিযাত্রী। ১৯৫৩ সালের ২৯ মে তিনি ব্রিটিশ অভিযাত্রী দলের অংশ হিসেবে নেপালী পর্বতারোহী শেরপা তেনজিং নোরগের সঙ্গে মাউন্ট এভারেস্ট শৃঙ্গ আরোহণ করেন।

তেনজিং নোরগে আরএডমন্ড হিলারি

স্যার এডমন্ড হিলারির পিতার নাম ছিল পার্সিভাল অগস্টাস হিলারি ও মাতার নাম ছিল গার্ট্রুড ক্লার্ক। হিলারির পিতামহ ও মাতামহ উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ার থেকে এসে নিউজিল্যান্ডের ওয়াইরোয়া নদী তীরে বসতি স্থাপন করেন। গ্যালিপলির যুদ্ধে অংশ গ্রহণের কারণে পার্সিভালকে টুয়াকাউ অঞ্চলে জমিদান করা হলে তাঁরা সপরিবারে সেখানে চলে আসেন।

হিলারি টুয়াকাউ প্রাথমিক বিদ্যালয় ও অকল্যান্ড গ্রামার স্কুল থেকে শিক্ষালাভ করেন। ষোল বছর বয়সে বিদ্যালয় থেকে মাউন্ট রুয়াপেহু পর্বতে ভ্রমণের সময় তিনি পর্বতারোহণের প্রতি উৎসাহিত হন। তিনি অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অঙ্ক ও বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক হন। ১৯৩৯ সালে তিনি দক্ষিণ আল্পস পর্বতমালার মাউন্ট অলিভিয়ার পর্বতশৃঙ্গে আরোহণ করার মাধ্যমে তাঁর জীবনের প্রথম শৃঙ্গজয় করেন।

তাঁর ভাই রেক্সের সঙ্গে হিলারি গ্রীষ্মকালে মৌমাছি পালক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন— যার ফলে শীতকালে তিনি পর্বতারোহণের জন্য প্রয়োজনীয় সময় অতিবাহিত করতে পারেন। তাঁর মৌমাছি পালনে আগ্রহের ফলে তিনি মাইকেল অ্যারিটনকে মৌচাকের আকৃতির একটি স্বর্ণাভ ভাস্কর্য্য নির্মাণের অনুরোধ করেন— যা পরবর্তীকালে তাঁর বাগানে স্থাপন করা হলে মৌমাছিরা এই ভাস্কর্য্যটিকে মৌচাক হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। হিলারি এই সময় রেডিয়ান্ট লিভিং ট্র্যাম্পিং ক্লাব নামক একটি সংস্থায় যোগ দেওয়ার পর এই ক্লাবের সঙ্গে উইটাকার পর্বতমালায় ভ্রমণের আনন্দ উপভোগ করতেন।

পর্বত চূড়ায় হিলারি ও তেনজিং

১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি হ্যারি এয়ার্স ও মিক সুলিভানের নেতৃত্বে হিলারি ও রুথ অ্যাডামস নিউজিল্যান্ডের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আওরাকি আরোহণ করেন। এছাড়া ১৯৫১ সালে এরিক শিপটনের নেতৃত্বে ব্রিটিশদের সন্ধানী এভারেস্ট অভিযানেও হিলারি অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫২ সালে এরিক শিপটনের নেতৃত্বে চো ওইয়ু শৃঙ্গ অভিযানে হিলারি অংশগ্রহণ করেন। নেপাল থেকে রাস্তা না পাওয়ার কারণে হিলারি ও জর্জ লো নুপ গিরিবর্ত্ম পেরিয়ে তিব্বত প্রবেশ করে উত্তর দিক থেকে দ্বিতীয় শিবির পৌছান।

১৯৫৩ সালে জন হান্টের নেতৃত্বে ব্রিটিশদের মাউন্ট এভারেস্ট অভিযানে হিলারি অংশগ্রহণ করেন। এই অভিযানে দশ হাজার পাউন্ড মাল বহন করার জন্য ৩৬২ জন মালবাহক ও ২০ জন শেরপা সহ চার শতাধিক মানুষ অংশ গ্রহণ করেছিলেন। মার্চ মাসে বেস ক্যাম্প তৈরী করে ধীরে ধীরে দলটি ৭,৮৯০ মিটার (২৫, ৮৮৬ ফুট) উচ্চতায় আরোহণ করে সাউথ কলে তাদের অন্তিম শিবির স্থাপন করেন। ২৬ মেটম বুর্দিলঁ ও চার্লস ইভান্স শৃঙ্গজয়ের প্রচেষ্টা করে কিন্তু ইভান্সের অক্সিজেন সরবরাহকারী ব্যবস্থায় গোলোযোগ দেখা দিলে তাঁরা শৃঙ্গ থেকে ৩০০ ফুট নীচে থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। এরপর দলপতি হান্ট তেনজিং নোরগে ও এডমন্ড হিলারিকে শৃঙ্গ জয়ের চেষ্টা করতে নির্দেশ দেন। ২৮ মে তাঁরা আং ন্যিমা, আলফ্রেড গ্রেগরি ও জর্জ লোর সহায়তায় ৮,৫০০ মিটার (২৭,৮৮৭ ফুট) উচ্চতায় তাঁদের শিবির স্থাপন করলে ন্যিমা, গ্রেগরি ও লো নীচে ফিরে যান। হিলারির জুতো সারা রাত তাঁবুর বাইরে থাকায় পরদিন সকালে সেগুলি জমে গেলে দুই ঘন্টা ধরে দুইজনে মিলে চেষ্টা করে সেগুলিকে পূর্বাবস্থায় নিয়ে আসেন ও ত্রিশ পাউন্ড ওজনের সরঞ্জাম নিয়ে তাঁরা শৃঙ্গ আরোহণের চেষ্টা শুরু করেন।

শৃঙ্গের ঠিক নীচে চল্লিশ ফুটের খাড়া একটি পাথরের দেওয়ালে একটি খাঁজ ধরে এডমন্ড হিলারি ও তাঁকে অনুসরণ করে তেনজিং আরোহণ করে সকাল ১১:৩০ মিনিটে মাউন্ট এভারেস্ট শৃঙ্গ জয় করেন। পর্বতশৃঙ্গে তাঁরা পনেরো মিনিট ছিলেন। এই সময় হিলারি তেনজিংয়ের ছবি তোলেন। এই ছবিতে তেনজিংকে তাঁর বরফ-কুঠার তুলে ধরে থাকতে দেখা যায়। তাঁর বরফ-কুঠারে জাতিসংঘ, ইংল্যান্ড, নেপাল ও ভারতের পতাকা লাগানো ছিল।

তেনজিং-এর বর্ণনা অনুসারে হিলারি কোন কারণে নিজের ছবি তোলাতে অস্বীকৃত হন। তাদের শৃঙ্গজয়ের প্রমাণস্বরূপ শৃঙ্গ থেকে তাঁরা নীচের পর্বতগাত্রের ছবিও তোলেন। শৃঙ্গজয়ের ফলশ্রুতিতে পরবর্তীকালে তাঁদের দুইজনকে ঘিরে নেপাল ও ভারতে জনমানসে প্রচণ্ড উচ্ছাস তৈরী হয়। হিলারি ও হান্ট নাইট উপাধিতে ভূষিত হন এবং তেনজিংকে জর্জ পদক প্রদান করা হয়।

বিদ্যালয়ে শিক্ষালাভের সময় থেকেই পর্বতারোহণে উৎসাহী হিলারি ১৯৩৯ সালে মাউন্ট অলিভিয়ার শৃঙ্গে আরোহণের মাধ্যমে তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য শৃঙ্গজয় করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি রয়্যাল নিউজিল্যান্ড এয়ার ফোর্সে যোগদান করেন। ১৯৫৩ সালের ব্রিটিশদের মাউন্ট এভারেস্ট অভিযানের পূর্বে তিনি ১৯৫২ সালে চো ওইয়ু শৃঙ্গে আরোহণের প্রচেষ্টা করে ব্যর্থ হন।

কমনওয়েলথ ট্রান্স-অ্যাটলান্টিক অভিযানের অংশ হিসেবে তিনি ১৯৫৮ সালে দক্ষিণ মেরু পৌঁছান। পরবর্তীকালে তিনি উত্তর মেরু অভিযান করলে বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে পৃথিবীর দুই মেরু ও সর্বোচ্চ শৃঙ্গে পদার্পণের দুর্লভ কৃতিত্ব অর্জন করেন।

এভারেস্ট আরোহণের পর হিলারি নেপালের শেরপাদের উন্নতিকল্পে তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেন। তিনি হিমালয়ান ট্রাস্ট নামক একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে তাঁদের জন্য বিদ্যালয় ও হাসপাতাল নির্মাণ করেন।

স্যার এডমন্ড হিলারি ১৯১৯ সালের আজকের দিনে (২০ জুলাই) নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড শহরে জন্মগ্রহণ করেন।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com