শুভ জন্মদিন শিবরাম চক্রবর্তী

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

রাজ্যের যত পথের কুকুরকে নিয়ম করে খাইয়েছেন, মেসের ঘরের দেয়ালে লিখে রেখেছেন পরিচিত মানুষদের ঠিকানা ও ফোন নম্বর। রাজনীতি করেছেন, জেল খেটেছেন, রাস্তায় পত্রিকা বিক্রি করেছেন, সাংবাদিকতা করেছেন। কখনো পথে রাত্রিবাসও করেছেন। আর লিখে গেছেন অবিশ্রান্ত ধারায়। ভুলে যাবার আগে আরেকটা তথ্য তাঁর সম্পর্কে দিয়ে রাখি, শিবরাম বিয়ে করেন নি। এই একটা কাজই বোধ করি তাঁকে দিয়ে হয়নি।

এই অনন্য মানুষটি ১৯০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মদিনে প্রাণের বাংলার পক্ষ থেকে রইলো গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর বুকভরা হাসি।

শিবরাম সারাটা জীবন কাটিয়েছেন দুঃসহ সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে। চাঁচলের রাজবাড়ির উত্তরাধিকারী হয়েও উনি সবকিছু ছেড়েছুড়ে কলকাতায় পালিয়ে আসেন দেশের টানে এবং তাঁর কিশোরকালের প্রেমিকা রিনির টানে। অসহযোগ আন্দোলনের সময় জেলে গেলেন‚ কিন্তু জেল থেকে ফিরে রিনির বাড়ি গিয়ে জানা গেলো রিনির বিয়ে। রিনিকে হারিয়ে আশ্রয় নিলেন কলকাতার ফুটপাথে‚ খেতেন মল্লিকদের মার্বেল প্যালেসের লঙ্গরখানায়। কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় কাগজ ফেরি করেছেন আবার সেই কাগজে লিখেওছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে জেল খেটেছেন। যুগান্তর পত্রিকা নবরূপে প্রকাশ করে তাতে একটা প্যারোডি লিখে সিডিসানের দায়ে জেল হয় উনার । সমাজের নানান বিদ্বজ্জনদের সাথে পরিচয় থাকা সত্ত্বেও নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়ার সামান্যতম অভিপ্রায় ওনার কোনোদিনও হয়নি। আজীবন কাটিয়ে গেলেন ১৩৪ মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের দোতলার ঘরে দারিদ্র্যের সাথে তুমুল সংগ্রাম করে‚ শুক্তারাম আর রাবড়িচূর্ণ সম্বল করে। কাবুলিওয়ালার সুদ মেটানোর দায়ে লেখাটাকে নিজের বৃত্তি করলেন। বাংলা সাহিত্যে হাসির গল্পের সম্রাট নিজের লেখাতেও আনলেন এক অননুকরণীয় স্টাইল যা বহু পাঠক এবং লেখককের মনে যুগ যুগ ধরে সৃস্টি করে চলেছে বিষ্ময়। কলম ধরেছিলেন বলশেভিক আন্দোলনকে সমর্থন করে সেই সময়কার প্রতিক্রিয়াশীল লেখকদের বিরুদ্ধে। হাসির ছলে এক গভীর জীবনদর্শন উনার লেখার মধ্যে প্রচ্ছন্ন থাকে। নিজেকে ব্যঙ্গ করতেন নিজের লেখার মধ্যে দিয়ে‚ বলতেন‚ ” আমি সাহিত্যিক নই‚ মজদুর।গায়ে জোর নেই বলে রিক্সা টানতে পারিনা তাই কলম টানি। কলমের ওপর টান আমার ওইটুকুই।”
শৈশবে মা শিবরানির কাছে ঈশ্বর সম্পর্কে জ্ঞান পাওয়া এই মানুষটি পরে লিখেছিলেন‚ “বৈজ্ঞানিক ল্যাবরেটরিতে যেদিন ঈশ্বর আবিস্কার হবেন সেদিনই পৃথিবীতে ঈশ্বরের সত্যিকারের মুক্তি ঘটবে।” স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে সরকার যখন পেনশন দিতে চাইলেন উনি তা নিলেন না। দেশের জন্য স্যাক্রিফাইসটাকেও স্যাক্রিফাইস করে দিলেন – এর চেয়ে বড় স্যাক্রিফাইস আর কী হতে পারে!

তিনি বাঙলা ভাষায় অসাধারণ হাসির গল্পের কারিগর। কিন্তু শুধুই কি হাসির গল্প? শিবরাম চক্রবর্তীর লেখক জীবনের সূত্রপাত কিন্তু কবিতা দিয়ে।প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় তৎকালীন ‘ভারতী’ পত্রিকায়। প্রথম প্রকাশিত বই দুটিও কাব্যগ্রন্থ।দুটিই প্রকাশিত হয় ১৯২৯ সালে। তারপর অজস্র লেখা লিখেছেন। প্রবন্ধ, নাটক এবং তুলনাহীন অজস্র হাসির গল্প। লিখেছেন ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা ও ভালবাসা পৃথিবী ঈশ্বর নামের অনন্য স্মৃতিকথামূলক দুটি বই। প্রবন্ধের বই : মস্কো বনাম পন্ডিচেরি ও ফানুস ফাটাই।শিবরামের হর্ষবর্ধন আর গোবর্ধন চরিত্রটি যে কোনো বয়সের হাসির গল্পের পাঠকের কাছে ভীষণ প্রিয় সে কথা চোখ বন্ধ করেই বলে দেয়া যায়। লেখার বিষয়ে শিবরাম কোনো বাধা রীতি বা প্রচলিত কাহিনীর বুননে ধরা দেননি। তাৎক্ষণিক বুদ্ধি এবং ভাষার উদ্ভাবনী প্রয়োগে গল্প ও উপন্যাসে তিনি একেবারেই নিজস্ব মেজাজ তৈরী করেছেন।
শেষ বয়সে প্রবল আর্থিক অনাহারে ভুগছিলেন‚ ওষুধ কেনারও পয়সা ছিল না। সেই সময় আনন্দবাজার পত্রিকায় শিবরামের আর্থিক অনটন নিয়ে একটা লেখা বেরোয় যার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এবং কিছু সংস্থা শিবরামের সাহায্যার্থে আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু সেই টাকাটাও ঠিকমতো ওনার কাছে পৌঁছতে না। ও্ই সময় তাঁর মেসের ঘরের একান্ত নিজস্ব স্বাধীনতাও হারিয়ে গিয়েছিল।প্রায়ই বলতেন‚ বাক্সপ্যাটরা সব বাঁধা হয় গেছে‚ একটা ট্যাক্সি পেলেই চলে যাব। অবশেষে একদিন রাতে মেসের কলঘরে অচৈতন্য হয়ে পড়েন শিবরাম। পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় উনাকে উনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ৭৭ বছর বয়সেজীবনে কী করেননি শিবরাম চক্রবর্তী? কলকাতা শহরের একটি মেস বাড়িতে গোটা জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন।

এক সময়ে মূলত তাঁর লেখাই পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। নানা চাকরি, অর্থ উপার্জনের নানা পথ তাঁকে স্থায়ীভাবে বাঁধতে পারেনি। জীবনকে তিনি খুব সহজ ও সুন্দরভাবে

গ্রহণ করেছিলেন। ছিলেন অগোছালো-মর্জিমাফিক চলনে অভ্যস্ত। জীবনে আর্থিক সমস্যা ছিলো, কষ্ট ছিলো, কিন্তু মুক্ত মনের আনন্দে কোনো উৎকন্ঠিত ভবিষ্যতকে সামনে দাঁড়াতে দেন নি। এরকম বৈচিত্রময়, প্রকৃত বোহেমিয়ান লেখক-চরিত্র বাংলাদেশে আর দ্বিতীয়টি আসেনি একথা বলা যায়।

নিজের লেখা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে শিবরাম চক্রবর্তী নিজেই লিখেছেন, ‘‘ সার্কাসের ক্লাউন যেমন সব খেলাতেই ওস্তাদ। কিন্তু তার দক্ষতা হলো দক্ষযজ্ঞ ভান্ডার। সব খেলাই জানে, সব খেলাই সে পারে, কিন্তু পারতে গিয়ে কোথায় যে কী হয়ে যায়, খেলাটা হাসিল হয় না; হাসির হয়ে ওঠে। আর হাসির হলেই তার খেলা হাসিল হয়। কিন্তু আমি তা পেরেচি কি!’’।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ শিরোণাম শিবরাম

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com