শুভ জন্মদিন মৃণাল সেন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাবলু ভট্টাচার্য

মৃণাল সেন বরাবরই বড় বেশি অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছেন বাঙালি মধ্যবিত্তকে। তার ছবি মাঝে মাঝেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে থাকে, আমাদের বেঁচে থাকায় কত রকমের অসঙ্গতি। যেমন, সাধারণের একটা বড় অংশ যখন বুভুক্ষাগ্রস্ত, এক শ্রেণির মানুষ তখন দিব্যি খেয়েপরে বেঁচে আছে, কী করে? বাজারে খাবার জোগান আছে, এক দলের দখল আছে সেই খাবারের ওপর, অথচ অন্য দলের নেই বলে তারা শুকিয়ে মরে যাচ্ছে, এ-ও বা হচ্ছে কী করে? অনেক সময় দেশে খাদ্যের প্রাচুর্য সত্ত্বেও বহু লোক ক্ষুধার্ত থাকতে বাধ্য হয়, কেন? খিদের অনুষঙ্গে এ সমস্ত প্রশ্ন তুলে গিয়েছেন মৃণাল সেন অবিরত।

‘কোরাস’-এ এক রাঁধুনির চরিত্রে গীতা সেন চুপচাপ নানান সুস্বাদু পদ রান্না করে চলেন ছিমছাম এক ফ্ল্যাটে, ভেসে-আসা ভাষ্যে শুনি তাঁর মনের কথা—‘কত কী রান্না করি এখানে, অথচ এর একটা টুকরোও দিতে পারি না আমার বাচ্চাগুলোর মুখে।’

‘কলকাতা ৭১’-এ চোদ্দো-পনেরো বছরের ‘স্মাগলার’ ছেলেটি, চলন্ত অবস্থায় ট্রেন বদল করে যে চাল পাচার করত, তার দলবলকে দেখে ভদ্রলোক ট্রেনযাত্রী বলে ওঠেন— ‘সারা দেশটা ছোটলোক বনে যাচ্ছে।’ ছেলেটি এ-সব কিছুই পরোয়া করে না, কাউকে ভয় পায় না, পুলিশকেও না, ভয় পায় শুধু একটা জিনিসকে। খিদে।

‘বাইশে শ্রাবণ’-এ তেরোশো পঞ্চাশের মন্বন্তর ঢুকে পড়ে প্রিয়নাথ-মালতীর সংসারে, তাদের সম্পর্কের ভিত নড়ে যায়। এক মধ্যাহ্নে গোগ্রাসে খেতে খেতে ভাতের হাঁড়ির দিকে তাকায় প্রিয়নাথ, মালতী হাঁড়ি থেকে চেঁচেপুঁছে তাকে ভাত দেয়। স্বামী উঠে গেলে হাঁড়িতে হাত ঢুকিয়ে এক মুঠো ভাতও পায় না, হাঁড়িতে জল ঢেলে দেয়, বলে— ‘বড়লোক মামার সংসারে লাথিঝাঁটা খেয়ে মানুষ, দু’চার বেলা খেতে-না-পাওয়া, ও আমার গা-সওয়া হয়ে গেছে।’

‘বাইশে শ্রাবণ’-এর কুড়ি বছর পর ১৯৮০-র সেপ্টেম্বরে কলকাতার কাছেই একটা গ্রামে ১৯৪৩-এর সেই আকাল নিয়ে ছবি করতে যান এক পরিচালক, সঙ্গে তাঁর ফিল্ম ইউনিট। ‘আকালের সন্ধানে’। হাইওয়ে থেকে গাড়িগুলো গ্রামে ঢোকার সময় এক হাড়-জিরজিরে বুড়ো বলে ওঠে ‘বাবুরা এয়েচেন আকালের ছবি তুলতে, আকাল তো আমাদিগের সব্বাঙ্গে।’ পরিচালক টের পান, আশির মধ্যে তেতাল্লিশ ঢুকে পড়ছে। তিনি তখন ইউনিটের মানুষজনকে দুর্ভিক্ষের ডকুমেন্টেশন আছে এমন ফোটোগ্রাফ দেখাতে শুরু করেন, আর বলতে থাকেন ‘এক বছরে মরে গেল পঞ্চাশ লক্ষ মানুষ, স্রেফ না খেতে পেয়ে…’

‘খারিজ’-এর অঞ্জন দত্ত শিক্ষিত, ভদ্র মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহস্বামী, পালান নামে তার ‘কাজের ছেলে’টির উপর তিনি বা তার স্ত্রী মমতা কখনও কোনও দুর্ব্যবহার বা অত্যাচার করেননি। কিন্তু পালান মারা যাওয়ার পর অঞ্জন যখন বলতে থাকেন— ‘ও আমাদের বাড়ির লোকের মতোই ছিল’, কিংবা বাড়িওয়ালার ঘাড়েও দোষ চাপানোর চেষ্টা করেন— ‘ওই রান্নাঘরে যদি একটা ভেন্টিলেটার থাকত তা হলে হয়তো’; তখন স্পষ্ট হয়ে আসে গৃহস্বামী তার ভদ্রতার আড়ালে ‘পালানে’র প্রতি তাদের যে অনাদর, সেটাকে নির্মমতা বলে স্বীকার করতে পারছেন না। আবার লজ্জাও পাচ্ছেন, মমতাশংকরকে বলছেন, ‘যে ভাবে মারা গেল, সে আমাদের লজ্জা। আর হাজার লোকের হাজারটা প্রশ্ন!’

আমরা যাতে হাঁফ ছাড়তে না পারি, লজ্জাবোধ থেকে কখনও রেহাই না পাই, সে বন্দোবস্তই করে চলেন মৃণাল সেন। ‘একদিন প্রতিদিন’-এ হাসপাতালে প্রতীক্ষারত বেশ কয়েকটা পরিবার, তাঁদের নিরুদ্দেশ মেয়ের খোঁজ করতে এসেছেন। নার্স এসে যখন মেয়েটির মৃত্যুসংবাদ দিয়ে তাকে শনাক্ত করতে বলেন, এক-এক জন করে এগিয়ে আসেন, দেখেন, আর নিজের পরিবারের মেয়ে না হলেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে চলে যান। শেষমেশ পড়ে থাকেন শুধু এক জন, আশিসবাবু, শনাক্ত করতে পারেন এ তার বোনেরই মৃতদেহ। একা অসহায় দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। আমরা লজ্জায় মাথা নামাই।

তিনি কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা বিষয়ে পড়াশোনা করেন। ছাত্রাবস্থায় কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সরাসরি কখনও কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হননি। চল্লিশের দশকে তিনি সমাজবাদী সংস্থা আইপিটিএ’র (ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন) সঙ্গে যুক্ত হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালে তিনি একজন সাংবাদিক, একজন ওষুধ বিপণনকারী এবং চলচ্চিত্রের শব্দ কলাকুশলী হিসেবে কাজ করেন।

১৯৮১ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘পদ্মভূষণ’ লাভ করেন। ২০০৫ সালে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘দাদা সাহেব ফালকে’ পান। ১৯৯৮-২০০৩ সালে তিনি ভারতীয় সংসদের সাম্মানিক সদস্যপদ লাভ করেন। ২০০০ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তাকে ‘অর্ডার অব ফ্রেন্ডশিপ’ সম্মানে ভূষিত করেন। মৃণাল সেনকে ফরাসি সরকার তাদের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘কমান্ডার অব দ্য আর্টস অ্যান্ড লেটারস’-এ ভূষিত করে।

মৃণাল সেন ১৯২৩ সালের আজকের দিনে (১৪ মে) বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্মগ্রহণ করেন।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com