শুভ জন্মদিন মহানায়িকা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তিনি সুচিত্রা সেন।বাংলা সিনেমার দর্শকদের কাছে চিরকালের রোমান্টিকতার প্রতীক।তিনি মোহাবিষ্ট করে রেখেছিলেন দর্শকদের।কয়েক বছর আগে পৃথিবীকে চিরবিদায় জানিয়েছেন তিনি। তার আগে দীর্ঘকাল ছিলেন অন্তরালে। কিন্তু আজো তাঁর নাম উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে তাঁর ভুবনমহিনি হাসি আর রহস্যেঘেরা জীবন।
হয়তো তার চেয়েও প্রতিভাবান অভিনেত্রী বাংলা চলচ্চিত্রে ছিলেন কিন্তু পর্দায় তার চেয়ে রহস্যময়ী ও রোমান্টিক আর কেউ ছিলেন না। তাকে কখনও মনে হয়নি পাশের বাড়ির সহজ সাধারণ মেয়েটি, বরং সর্বদাই তিনি ছিলেন অধরা নারীর প্রতীক।
১৯৫২ সালে তিনি কলকাতার চলচ্চিত্র অঙ্গনে প্রবেশ করেন। ‘শেষ কোথায়’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রূপালি পর্দায় তার যাত্রা শুরু হলেও ছবিটি মুক্তি পায়নি। ১৯৫৩ সালে উত্তম কুমারের বিপরীতে অভিনীত ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ তার প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি। ছবিটি ব্যবসা সফল হয়। তবে সেটি ছিল কমেডিনির্ভর ছবি এবং এর মূল আকর্ষণ ছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৫৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবিকে তার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট বলা হয়। এ ছবিতেই উত্তম- সুচিত্রা বাংলা সিনেমার ক্ল্যাসিক রোমান্টিক জুটিতে পরিণত হন। আশাপূর্ণা দেবীর উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি এ ছবিতেও সুচিত্রার চরিত্রটি ছিল গড়পড়তা বাঙালি নারীর চেয়ে ভিন্নতর। অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একের পর এক হিট সিনেমায় অভিনয় করে দর্শকদের মহানায়িকায় পরিণত হন সুচিত্রা সেন।
‘হারানো সুর’, ‘শাপমোচন’, ‘বিপাশা’, ‘ইন্দ্রাণী’, ‘শিল্পী’, ‘সাগরিকা’, ‘পথে হলো দেরী’, ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’, ‘কমললতা’, ‘গৃহদাহ’, ‘প্রিয় বান্ধবী’, ‘দত্তা’, ‘পথের দাবী’, ‘সবার উপরে’, ‘সপ্তপদী’, ‘দীপ জ্বেলে যাই’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’, ‘সাতপাকে বাঁধা’-সহ অসংখ্য ব্যবসাসফল ও শিল্পসম্মত ছবিতে অভিনয় করে বাংলা ছবির প্রধান নায়িকায় পরিণত হন তিনি।
সিনেমায় তার ব্যক্তিত্ব এবং সৌন্দর্য দুটিই দর্শককে মোহাবিষ্ট করে রাখে। তিনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অশোক কুমার, বসন্ত চৌধুরী, দীলিপ কুমারসহ অনেক বিখ্যাত নায়কের বিপরীতে অভিনয় করেছেন। কিন্তু উত্তম কুমারের বিপরীতে তার জুটি সবচেয়ে বেশি দর্শকনন্দিত হয় এবং উত্তম-সুচিত্রা জুটি চিরকালের সেরা রোমান্টিক জুটিতে পরিণত হয়।
তবে সুচিত্রা সেন নিজেকে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন উত্তম ছাড়া। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন উত্তম কুমার ছাড়া তিনি সাফল্য পান কি না। পঞ্চাশের দশকে যে সিনেমাগুলোতে অভিনয় করেছিলেন তিনি তার অধিকাংশেরই নায়ক উত্তম কুমার। উত্তম ছাড়া তার অভিনীত অন্য সিনেমা তখনও তেমন সাফল্য পায়নি।
সুচিত্রা সেনের ব্যক্তি জীবন নিয়ে দর্শকের কৌতূহল ছিল অপার। কিন্তু খ্যাতির শীর্ষে অবস্থান করার সময়ও সুচিত্রা সেন ব্যক্তি জীবনকে সযত্নে লুকিয়ে রাখতেন লোকচক্ষু থেকে। মিডিয়ায় তিনি কখনও সরব ছিলেন না। তাকে ঘিরে কোনো স্ক্যান্ডাল যেন না থাকে সে বিষয়েও তিনি ছিলেন সচেষ্ট। শুটিং শেষ করেই ‘মিসেস সেন’ যেন চলে যেতেন নিজের রহস্যময় জগতে।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অনেকটাই খেয়ালি। দিবানাথ সেনের সঙ্গে তার বিবাহিত জীবনও খুব সুখের হয়নি। তারা বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করতেন। দিবানাথ সেনের মৃত্যুর পরও তাদের দাম্পত্যজীবন সম্পর্কে কোনো কথাই মিডিয়ায় প্রকাশ করেননি সুচিত্রা। তাদের একমাত্র সন্তান মুনমুন সেন এবং নাতনি রিয়া ও রাইমা সেনও চলচ্চিত্রাভিনেত্রী।
১৯৭৮ সাল থেকে সুচিত্রা সেন চলচ্চিত্রজগতকে বিদায় জানিয়ে নির্জনে বসবাস শুরু করেন এবং রামকৃষ্ণ মিশনের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা বজায় রাখেন। সুচিত্রা সেনকে শেষ জনসম্মুখে দেখা গিয়েছিল উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর তার শবযাত্রায়। এর পর আর কখনও তাকে দেখা যায়নি। তিনি কখনও কোনো জনসমাগমে অংশ নেননি। জনসম্মুখে আসতে হবে বলে ২০০৫ সালে ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন । ২০১২ সালে ভারতের পশ্চিম বঙ্গ সরকার, রাজ্যের সর্বোচ্চ সম্মাননা বঙ্গ বিভূষণে ভূষিত করে সুচিত্রা সেনকে।
তিনি নায়িকা ছিলেন এবং নায়িকা চরিত্রেই অভিনয় করেছেন। পার্শ্ব-চরিত্রে তাকে কখনও দেখা যায়নি। তার তরুণীমূর্তিই দর্শকস্মৃতিতে অম্লান। ১৭ই জানুয়ারি ২০১৪ তে মৃত্যুর অন্ধকার জগতে চিরতরে প্রস্থান করলেও মহানায়িকা সুচিত্রা সেন দর্শকদের মনে চিরসবুজ, চিরতরুণ, রোমান্টিক নায়িকারূপে বেঁচে থাকবেন চিরকাল।
সুচিত্রা সেন ১৯৩১ সালের আজকের দিনে (৬ এপ্রিল) পাবনায় জন্মগ্রহণ করেন।

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com