শুভ জন্মদিন প্রসাদ

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার

‘আমি তোমারি তোমারি তোমারি নাম গাই

আমার নাম গাও তুমি’

প্রসাদের শেষ গান। এই গান যখন প্রথম শুনি তখন ও আর নেই। শোনার পরই চমকে উঠেছিলাম। তারপর থেকে যত শুনি ততই নতুন করে চমকে উঠি। কী নেই এই গানটায়! ওর সমস্ত ভালোবাসা, সমস্ত অনুভব, সমস্ত প্রজ্ঞা, যেন উজাড় করে দিয়েছে এই গানে। এই গানটি ভাবতে বসলে আমার ভাবনা ফুরোয় না। বলতে শুরু করলে বলা শেষ হয় না। সব বলার পরও মনে হয় অনেক কিছু বলা বাকি রয়ে গেলো। কখনো মনে হয়, এই গানটা যেন মাইকেলের ‘দাঁড়াও পথিকবর’ এর মত জীবদ্দশায় লিখে যাওয়া নিজের এপিটাফ। বাংলা গানের আবহমানতায় আমি এই গানকে রবীন্দ্রনাথের ‘মধুর, তোমার শেষ যে না পাই’ ও কবীর সুমনের ‘অমরত্বের প্রত্যাশা নেই’ গানের পাশেই স্থান দিই। কত কত গানের স্মৃতি, কত কত স্মৃতির গান, কত কত উপলব্ধির স্বাক্ষর যে বহন করছে এই গান! প্রথম চমক, ‘আমি তোমারি নাম গাই’ কথাটি। ‘তুমি’ নামের উদ্দিষ্টটি আমাদের ধর্মে আছে, লোকায়তে আছে, ধর্ম-উদাসীন আধুনিক উচ্চারণেও আছে। প্রকৃতপক্ষে ‘তুমি’ ছাড়া আমাদের কোনো গীত নেই। প্রসাদ এই সমস্ত ‘তুমি’র মধ্যে একটা সেতু করে নিয়েছে এই গানে। এর আগে আর কোনো আধুনিক সৃষ্টিতে ‘তুমি’-র নাম ‘গাওয়া’ শুনেছি কি? আধুনিক কবিতা ও গানে সাধারণত ‘তোমার’ নাম লিখতে বা বলতে বা ভাবতে শুনেছি আমরা এতদিন। এই প্রথম বাংলা আধুনিক গান ‘তুমি’-র নাম গাইলো। এটা প্রথম প্রসাদই করেছে। এভাবেই কথা বা সুর নয়, কীর্তনের অনুভব চলে এসেছে বাংলা আধুনিক গানে। প্রসাদ জানত একটি গান বা কবিতার শব্দ একটু পাল্টে গেলে কেমন একটা নতুন কথার জন্ম হয় বা একটা সুর বা তালে আলতো মোচড় দিলে কেমন অবিস্মরণীয় নতুন রূপের জন্ম হয়। চায়ের দোকানের এক আড্ডাতেই একবার বলেছিলো ওর বিস্ময়কর পর্যবেক্ষণে, ‘বল তো শুভদা, পাগলা হাওয়া বাদল দিনে গানটার তাল পাল্টে দিলে কী হয়?’ বলে পরক্ষণেই বললো, ‘ ভজ গৌরাঙ্গ হয়ে যায় না? ‘ এভাবে যে ও শুধু দেখতে পারতো না, নতুন সৃষ্টির জন্মও দিতে পারতো তার প্রমাণ, আমি তোমারি নাম গাই। যাঁরা কীর্তন শোনেন তাঁরা বুঝবেন ‘আমি তোমারি তোমারি তোমারি নাম গাই’ গানের তালটা একটু পাল্টে দিলেই কেমন ‘নিতাই, গৌর হরি বোল, গৌর হরি বোল, গৌর হরি বোল, গৌর হরি বোল’ হয়ে যায়। ‘তোমারি’ কথাটির পরপর পুনরাবৃত্তি এবং তোমার নাম ‘গাওয়া’ ব্যাপারটি যেন আবহমান কীর্তন থেকেই উঠে এসেছে। তারপরই আছেন রবীন্দ্রনাথ। কাল ঋতচেতা বলছিলো একটি অনুষ্ঠানে, ‘জলে কেন, ডাঙায় আমি ডুবতেও রাজি আছি’ কথাটির মধ্যে ‘টুকরো করে কাছি আমি ডুবতে রাজি আছি’ লুকিয়ে আছে। ‘তুমি এসো ফসলের ডাকে বটের ঝুরির ফাঁকে’ থেকে তাঁর একটি গভীর রাজনৈতিক প্রত্যয়ের কথা আছে, আবার সেখানেও আছেন রবীন্দ্রনাথ। আমাদের এগোবার পথ কোথায়, ফসলের মাঠে, নাকি কৃষকঘাতী চিমনির ধোঁয়ায়, এই বিতর্কে যখন তোলপাড় আমাদের প্রতিবেশ, তখন প্রসাদের জোরালো অবস্থান ছিলো ফসলের মাঠের স্বপ্ন জাগরণে। গানের এই পংক্তিতে যেন শুনতে পাই রক্তকরবীর নন্দিনীর ডাক, ‘তুমিও বেরিয়ে এসো, রাজা। তোমাকে মাঠে নিয়ে যাই।’ গানের শেষ স্তবক নিয়েই বোধহয় একটি পূর্ণাঙ্গ লেখা তৈরি হতে পারে। ‘কবিতা গেল মিছিলে, মিছিল নিয়েছে চিলে, অসহায় জন্মভূমি’ এখানে একই সঙ্গে স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের আখ্যান। প্রথম তিনটি শব্দে জেগে ওঠে অশোক মিত্রের ‘কবিতা থেকে মিছিল’, মানে চল্লিশের প্রগতি সাহিত্য সংস্কৃতি আন্দোলনের স্বপ্ন। তারপরের তিনটি শব্দে সেই স্বপ্নভঙ্গের প্রলম্বিত দীর্ঘশ্বাস। প্রসাদ এই বিশ্বাসে গভীরভাবে স্থিত ছিলো যে আমাদের পঙ্গু নাগরিকতায় যদি লোকায়তের অন্তর্ঘাত ঘটে তবেই মুক্তি। উল্টোটায় নয়। ‘আজ একতারার ছিলা তোমার স্পর্শ চায়/ যদি টংকার দাও তুমি’। সব মিলিয়ে গানটা প্রসাদের জীবনের ম্যানিফেস্টো। আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি, শুধু এই গানটির জন্যেই সে বাঙালির কাছে চিরজীবী হতে পারে।

গানটা আমি মঞ্চে প্রায় গাইই না। ওর চলে যাওয়ার মার্চেই বাংলাদেশের ঢাকা ও সিলেটে ওর স্মৃতিতে গান গাইতে গিয়েছিলাম। সিলেট ও ঢাকায় ওর প্রথম যাওয়া আমার সঙ্গেই ২০০১ সালে। ঢাকার শহীদ মিনার, বাংলা একাডেমি,কুষ্টিয়ায় লালনের মাজার আর শিলাইদহের কুঠিবাড়ি আমরা একসঙ্গে গিয়েছি। সিলেটে রুহিদার সঙ্গে অন্তহীন কথা, করিম ভাইয়ের সঙ্গে একটি গোটা দুপুর ও সন্ধ্যা একসঙ্গেই কাটিয়েছি। ২০১৭ এর মার্চের সিলেটের সেই অনুষ্ঠানে সব শেষে গেয়েছিলাম এই গানটি। যে কথাগুলো বললাম, তার বেশিরভাগ উপলব্ধি সেদিন গাইতে গাইতে অনুভব করেছিলাম। বারবার গলা বুজে আসছিলো। প্রেক্ষাগৃহের উপচে পড়া ভিড় সঙ্গে গলা মেলাচ্ছিলো। ভাগ্যিস, শাওন, সিলেটের কমলজিৎ শাওন সেদিনের গাওয়াটি ধারণ করেছিলো।

জন্মদিনে প্রসাদকে এটাই দিলাম।

যদি শুনতে পেতো!!

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com