শুভ জন্মদিন নেলসন ম্যান্ডেলা (মাদিবা)

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাবলু ভট্টাচার্য

অন্ধকারাচ্ছন্ন আফ্রিকার কালো মানুষদের তিনি মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। শৃঙ্খলিত দক্ষিণ আফ্রিকাকে তিনি মুক্ত করেছেন। সাদা চামড়ার ঔপনিবেশিক শোষকদের দ্বারা লালিত বর্বর বর্ণবাদকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে সকল জাতি-বর্ণের মানুষকে তিনি শিখিয়েছেন ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য ও সংহতির মহৎ আদর্শ। এইভাবে তিনি হয়ে উঠেছেন কেবল দক্ষিণ আফ্রিকারই নয়, সারা বিশ্বের মানবজাতির মুক্তির সেনানী, অগ্রপথিক। সেই মহানায়ক হলেন নেলসন ম্যান্ডেলা— যিনি ‘মাদিবা’ নামেও পরিচিত।

বর্ণবাদ ছিল শ্বেতাঙ্গ সাম্রাজ্যবাদীদের মতাদর্শগত হাতিয়ার। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও সাম্রাজ্যবাদের লুন্ঠনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আসলে একই সূত্রে গাথা। তাই ম্যান্ডেলার সংগ্রামের ইতিহাস জানতে হলে সাম্রাজ্যবাদের শোষণ-লুন্ঠনের ইতিহাসও জানতে হবে।

ইউরোপীয় দস্যুর দল পশু শিকারের মতো মানুষ শিকার করতো আফ্রিকায়, তারপর তাদের হাতে পায়ে গলায় শিকল পরিয়ে আমেরিকায় ‘দাসের হাটে’ বিক্রি করত। এদেরকেই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, মানুষ ধরার দল।

সপ্তদশ শতাব্দীতেই প্রতি বৎসর আমেরিকার দাসের বাজারে গড়ে বিক্রি হতো পঞ্চান্ন হাজার আফ্রিকার কালো মানুষ। পরবর্তী শতাব্দীতে এই দাস ব্যবসা আরো বৃদ্ধি পায়। আফ্রিকায় মানুষ শিকারের সংখ্যাও দারুণভাবে বৃদ্ধি পায়। বুর্জোয়াদের জন্য এটা ছিল লাভজনক ব্যবসা। শুধুমাত্র ব্রিটিশ কলোনিতেই ১৬৮০ থেকে পরবর্তী একশ বছরে ২১ লাখ আফ্রিকানকে দাস বানিয়ে চালান দেয়া হয়েছিল।

বুয়ার্সদের পরাজিত করার পর ইংরেজরা দক্ষিণ আফ্রিকার পুরো অঞ্চলটি দখলে আনলো। কৃষ্ণবর্ণের মানুষরা নিজ দেশেই পরাধীন হয়ে রইল। বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার ছিল চরমভাবে ফাসিস্ত। এমনকি হিটলারের চেয়েও নিকৃষ্ট। কৃষ্ণবর্ণ আফ্রিকান জনগণের কোনো অধিকারই ছিল না। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ দেশটির জনগণ ছিল শোষিত ও চরমভাবে দরিদ্র। তাদের জন্য না ছিল স্বাস্থ্যসেবা, না ছিল শিক্ষার সুযোগ। বর্ণবাদ ছিল নিকৃষ্ট ধরনের।

মতাদর্শ (প্রতিক্রিয়াশীল ও বর্ণবাদী) এক হওয়ায় দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসকদের পরিপূর্ণ সমর্থন দিয়ে এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটেন, ফ্রান্স প্রভৃতি ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদও বর্ণবাদী রাষ্ট্রকে মদদ দিয়ে এসেছে। বস্তুত দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী রাষ্ট্র তো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদেরই তৈরি।

এইরকম এক ঘোর বর্ণবাদী ঔপনিবেশিক যুগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা।

সেই সময় কৃষ্ণ-আফ্রিকানদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার হয়নি। অধিকাংশ কালো মানুষ ছিল সস্তা শ্রমের সরবরাহকারী। তখন অল্পসংখ্যক আফ্রিকান, যারা শিক্ষার সুযোগ পেয়েছিলেন ম্যান্ডেলা তাদের একজন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে ডিগ্রি লাভ করেন এবং আইন ব্যবসা শুরু করেন জোহেন্সবার্গে। এই সময় তিনি আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসে (ANC) যোগদান করেন; ১৯৪৪ সালে। নেলসন ম্যান্ডেলা একই সঙ্গে শ্রমিক আন্দোলনেও জড়িয়ে পড়েন এবং নেতৃত্ব প্রদান করেন, যে কারণে দক্ষিণ আফ্রিকার ফাসিস্ত সরকার তাঁর বিরুদ্ধে আনীত মামলায় ‘শ্রমিকদের উসকানি’র অভিযোগও এনেছিল। পঞ্চাশের দশকে ম্যান্ডেলা মার্কসবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং পরে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। ১৯৫০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল। কয়েক বৎসর পর আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসও নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল।

১৯৬১ সালে নেলসন ম্যান্ডেলা আত্মগোপনে যান। ১৯৬২ সালে গ্রেফতার হবার সময় তিনি কেবল এএনসির নেতা ছিলেন তাই-ই নয়, তিনি গোপন কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যও ছিলেন।

১৯৬২ সালের ১১ জানুয়ারি ম্যান্ডেলা গোপনে ডেভিড মোৎসামাই ছদ্মনামে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে আসেন। সশস্ত্র সংগ্রামে সমর্থন জোগাড় করার জন্য তিনি আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন। ইংল্যান্ডেও গিয়েছিলেন। নিজে গেরিলা যুদ্ধের জন্য সামরিক প্রশিক্ষণ নেন ইথিওপিয়া ও মরক্কোতে অবস্থিত আলজিরিয়ান ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের বিভিন্ন শিবিরে।

ক্যাস্ত্রোর সঙ্গে

ছয় মাস বিদেশে থাকার পর ম্যান্ডেলা ১৯৬২ সালের জুলাইয়ে দেশে ফিরে আসেন। ম্যান্ডেলার গতিবিধির ওপর নজর রাখছিল যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ।

সিআইএ তাদের বন্ধু সরকার দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকারকে তথ্য সরবরাহ করে এবং তারই ভিত্তিতে ম্যান্ডেলাকে গ্রেফতার করা হয়। তারপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় প্রিটোরিয়ায়। বর্ণবাদী ফাসিস্তদের বিচারে তাঁকে দেয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদন্ড (১২ জুন, ১৯৬৪)।

২৭ বছরের জেলজীবনে তাকে অধিকাংশ সময় নিঃসঙ্গ থাকতে হয়েছিল। নির্যাতনও কম হয়নি। ওরা তাঁকে মেরেই ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ ফ্যাসীবাদের ইচ্ছানুযায়ী ইতিহাস পরিচালিত হয় না। এএনসি ও কমিউনিস্ট পার্টির যৌথ সংগ্রাম, সমাজতান্ত্রিক শিবিরের কার্যকর সহযোগিতা, তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের দৃঢ় সমর্থন এবং বিশ্বজনমতের পরিপ্রেক্ষিতে ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও দক্ষিণ আফ্রিকার ফাসিস্ত সরকার পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল। ১৯৯০ সালে মাদিবা মুক্তিলাভ করেন।

কারাগারে থাকলেও নেলসন ম্যান্ডেলা ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষের হৃদয়ে। তিনি ছিলেন সশস্ত্র সংগ্রামীদের প্রেরণাদাতা। ১৯৯৪ সালে সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গ শাসনের বদলে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত হলো। ম্যান্ডেলা ছিলেন প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। ১৯৯৯ সালে তিনি বয়সের কারণে স্বেচ্ছায় প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে আসেন। এরপর সরাসরি রাজনীতি না করলেও আফ্রিকার সামাজিক-অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে ভাবতেন এবং কাজও করতেন। তাঁর সেই সকল মতামতের মূল্য ছিল অপরিসীম।

নেলসন ম্যান্ডেলা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এরই স্বীকৃতি হিসাবে ১৯৯৩ সালে তাঁকে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।

নেলসন ম্যান্ডেলার বাবা ছিলেন ইস্টার্ণ কেপ প্রদেশের থেম্বো রাজকীয় পরিবারের কাউন্সিলর। তিনি ছেলের নাম রেখেছিলেন রোলিহ্লাহলা ডালিভুঙ্গা ম্যান্ডেলা। স্কুলের এক শিক্ষক তার ইংরেজী নাম রাখলেন নেলসন। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার আপামর মানুষের কাছে তিনি ছিলেন ‘মাদিবা’।

নেলসন রোলিহালালা ম্যান্ডেলা ১৯১৮ সালের আজকের দিনে (১৮ জুলাই) দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রান্সকিতে জন্মগ্রহণ করেন।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com