শুভ জন্মদিন নির্মলেন্দু গুণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাবলু ভট্টাচার্য

এক সময় ভাবতেন বড় হয়ে সন্ন্যাসী হবেন। তার জ্যাঠামশাই সন্ন্যাস ব্রত নিয়েছিলেন। জ্যাঠামশাই কেন সন্ন্যাসী হয়েছিলেন খুব জানার ইচ্ছে ছিল তার। তবে তিনি তা জানতে পারেননি। কিন্তু কাব্যকে আশ্রয় করে তিনিও তো সন্ন্যাসী হয়েছেন। কবিতার প্রেরণায় ছুটেছেন পথ থেকে পথে। লিখতে পেরেছেন ‘ধাবমান হরিণের দ্যুতি’ বা ‘অগ্নি সঙ্গম’-এর মত চিন্তার খোরাক জোগানো কাব্য। প্রতিষ্ঠা করেছেন নিজের কাব্য দর্শন। শ্বেত শুভ্র চুল দাড়ির এ কাব্য অন্বেষক, কাব্য দার্শনিক প্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণ।

কতই বা বয়স তখন তার? ছয় বছর! বাবার কন্ঠে রবি ঠাকুরের ‘দেবতার গ্রাস’ কবিতার আবৃত্তি শুনে, কেঁদে বুক ভাসাতেন রাখালের জন্য। সমুদ্র দর্শনের আনন্দ নিয়ে রাখালকে মাসীর বুকে ফিরিয়ে দিলে কী ক্ষতি হতো? কেন এত দুঃখের ভেতর দিয়ে মানুষকে আনন্দ দেয়া? শুভ্র চুল দাড়ির রবীন্দ্রনাথকে বড় নিষ্ঠুর মনে হতো তার। এই কি কবির কাজ?

পড়ার টেবিলে

বাবার মুখে কবিতা শুনতে গিয়ে কবিতার চরিত্রদের সঙ্গে, এভাবেই ভালোবেসে ফেলেছিলেন কবিতাকেও। মা ছিলেন অষ্টগ্রামের দত্ত বংশীয়া। মনসামঙ্গলের আদি কবি কানাহরি দত্ত ছিলেন দত্তদের পূর্ব পুরুষ। সেখানেই কি প্রথিত ছিল বীজ? বাবা ছিলেন চিত্রশিল্পী। কিন্তু কলকাতা আর্ট স্কুলের ছবি আঁকার পাঠ শেষ করতে না পারায় মনের অজান্তেই তিনি হয়তো চেয়েছিলেন— তার ছেলে-মেয়েদের কেউ একজন শিল্পী হোক। তাই হয়ত সচেতনভাবেই এক সন্তানের নামও রেখেছিলেন মহাকবি কালিদাসের নামে, যে মাত্র ৩ বছর বয়সেই মারা গিয়েছিল। আর ছোট ছেলের মাঝে কবিতাগুণের প্রকাশ দেখে, শিল্পী হতে সহায়তা করতে দিয়েছিলেন স্বাধীনতার বিশাল আকাশ। যে আকাশকে ক্যানভাস করে তার ছেলে আঁকবে কাব্যচিত্র। তার সেই স্বাধীনতার আকাশ পাওয়া ছেলেটির নাম নির্মলেন্দু প্রকাশ গুণ চৌধুরী।

মাত্র ৪ বছর বয়সেই মা বীণাপনিকে হারান নির্মলেন্দু গুণ। মা মারা যাবার পর বাবা আবার বিয়ে করেন। লেখাপড়ার হাতেখড়ি নতুন মা চারুবালার হাতেই। ৩য় শ্রেণীতে, প্রথম স্কুলে ভর্তি হন বারহাট্টা স্কুলে। পুরো নাম করোনেশন কৃষ্ণপ্রসাদ ইন্সটিটিউট। ক্লাসে বসেই স্কুলকে নিয়ে একদিন লিখে ফেলেন একটি ছড়া। শুরুটা এভাবেই। ক্লাস এইটে পড়ার সময় স্কুলে বাংলার নতুন শিক্ষক মুখলেসুর রহমান স্যারের মাধ্যমেই মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নজরুল ইসলামের পর কবি জীবনানন্দের সঙ্গে প্রথম পরিচিত হন তিনি। এসময় বারহাট্টার বিখ্যাত রামমঙ্গল গায়েন ছিলেন নরেন্দ্র গায়েন। বিভিন্ন পার্বণে নরেন্দ্র গায়েনের গান অবাক হয়ে গভীর আগ্রহে শুনতেন নির্মলেন্দু গুণ। গেরুয়া রং-এর ধুতি, পাঞ্জাবী ও উত্তরীয় পরা নরেন্দ্র গায়েন যখন হারমোনিয়াম, খোল, করতাল বাদ্যসহকারে আবেগপূর্ণভাবে রামমঙ্গল পরিবেশন করতেন, তখন সেই কাব্য ও ছন্দের মাধুর্য তাকে নতুন জগতের সন্ধান দিত। কাব্য আর ছন্দের প্রেরণা সেখান থেকেও তিনি পেয়েছিলেন।

দুই বিষয়ে লেটারসহ মেট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ পান ১৯৬২ সালে। মেট্রিক পরীক্ষার আগেই নেত্রকোণা থেকে প্রকাশিত ‘উত্তর আকাশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় নির্মলেন্দু প্রকাশ গুণের প্রথম কবিতা ‘নতুন কান্ডারী’। মেট্রিকের পর আই.এস.সি. পড়তে চলে আসেন আনন্দমোহন কলেজে, ময়মনসিংহ। থাকেন হিন্দু হোষ্টেলে। নতুন জীবনের স্বাদ এবার এখানে— স্বাধীনতা। যা খুঁজেছেন এতদিন। দেরীতে হোষ্টেলে ফেরা শুরু হয় নিত্যদিন। ২য় বর্ষে উঠেই হোষ্টেলের ম্যানেজার নির্বাচিত হন এবং বাজারের টাকা মারা ও জুয়া খেলার অপরাধে হোষ্টেল ত্যাগের নির্দেশ পান। ফিরে যান নেত্রকোণা কলেজে।

লেখালেখি করছেন

মেট্রিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্টের সুবাদে পাওয়া রেসিডেন্সিয়াল স্কলারশিপসহ পড়তে থাকেন সেখানেই। ১৯৬৪ সালের জুন মাসে আই.এস.সি. পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডের ১১৯ জন প্রথম বিভাগ অর্জনকারীর মাঝে তিনিই একমাত্র নেত্রকোণা কলেজের।

সকলে খুশি। বাবা খুশি। এবার ছেলের সামনে উচ্চশিক্ষার সুগম পথ। ভালো ফলাফল তার যাত্রাকে বেগবান করবে এমনটাই আশা। বাবা চাইতেন ডাক্তারী পড়া। তিনি সুযোগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগে। ভর্তির প্রস্তুতি নেন নির্মলেন্দু গুণ। হঠাৎ হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা শুরু হয় ঢাকায়। দাঙ্গার কারণে তিনি ফিরে যান গ্রামে। ঢাকার অবস্থার উন্নতি হলে ফিরে গিয়ে দেখেন তার নাম ভর্তি লিষ্ট থেকে লাল কালি দিয়ে কেটে দেওয়া হয়েছে। আর ভর্তি হওয়া হয় না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফিরে যান গ্রামে। আই.এস.সি.-তে ভালো রেজাল্ট করায় তিনি ফার্স্ট গ্রেড স্কলারশিপ পেয়েছিলেন মাসে ৪৫ টাকা, বছর শেষে আরও ২৫০ টাকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হতে পারায় একবার ভেবেছিলেন পড়াশুনার ইতি টানবেন। কিন্তু ভালো রেজাল্টের সুবাদে পাওয়া ফার্ষ্ট গ্রেড স্কলারশিপ মিস্ না করতে আবার ফিরতে হয় সেই আনন্দমোহন কলেজে। ভর্তি হন পাস কোর্সে বি.এস.সি.তে। যদিও এ পরীক্ষায় আর উত্তীর্ণ হওয়া হয়নি তার। কিন্তু ১৯৬৯ সালে প্রাইভেটে বিএ পাশ করেন তিনি।

শুরু হয় নতুন জীবন। নির্মলেন্দু গুণ অফুরন্ত আনন্দের উৎসে অবগাহনে উন্মুখ হয়ে ওঠেন। আনন্দ সমুদ্রে অবগাহনের চেয়ে মহৎ অর্থ আর কী আছে? মৃত্যু নামক নিশ্চয়তা যেখানে থাবা পেতে দাঁড়িয়ে, যেখানে একদিন নিঃশেষ হতে হবেই, তবে কেন বিমূর্ত এক জীবন আনন্দের আশায় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আনন্দকে অস্বীকার করে কষ্ট পাওয়া। ধরণীর আনন্দ আবাহনে সাড়া দেন তিনি। মদ্য-পদ্য-সিদ্ধি-গণিকা-জুয়া এই পঞ্চভূতের পাদপথে উৎসর্গ করেন নিজেকে। আর সেই সঙ্গে চলে সর্বদা কাব্য চর্চার সঞ্জীবনী খুঁজে ফেরা। প্রকাশিত হয় কবিতা। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫ সালে ঢাকার ‘সাপ্তাহিক জনতা’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয় ‘কোন এক সংগ্রামীর দৃষ্টিতে’। এই সংকলনের বিভিন্ন কবিতায় ফুটে ওঠে বিদ্রোহ— যা শাসক শ্রেণীর পছন্দ হয় না। তাই মামলা হয়। জারি হয় নির্মলেন্দু গুণের নামে গ্রেফতারী পরোয়ানা।

পরে অবশ্য প্রভাবশালী মুসলিম লীগ নেতা খুরশেদ চৌধুরী ও মৌলনা ফজলুর রহমান সাহেবের মধ্যস্থতায় মামলা প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু এর পরই আসে অনাকাঙ্ক্ষিত আঘাত। ডাকাতির মামলা হয় তাকে আসামী করে, আবার গ্রেফতারী পরোয়ানা। হুলিয়া। পলাতক জীবন। কখনও গৌরীপুর, শ্যামপুর। আবার কখনো জারিয়া-ঝাঞ্ছাইল। একসময় চলে আসেন ঢাকা। থাকতে শুরু করেন নাট্যকার বন্ধু মামুনুর রশীদের সঙ্গে পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট-এর হোষ্টেলে। কাজ শুরু করেন আব্দুল্লাহ্ আবু সায়ীদের ‘কন্ঠস্বর’ পত্রিকায়। যে কবিতার জন্য হুলিয়া মাথায় নিয়েছেন সে কবিতাকে আর সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয় না। নির্মলেন্দু গুণ ঠিক করেন সাহিত্যের সঙ্গেই সংযুক্ত থাকবেন। সর্বক্ষণ তার ধ্যান জ্ঞানে কবিতা তখন ডালপালা মেলছে।

ঢাকা শহরে নির্মলেন্দু গুণের নির্দিষ্ট কোন ঠিকানা ছিল না। কবিতা লিখতেন, ঘুরে বেড়াতেন, আড্ডা দিতেন, প্রকাশকদের বইয়ের প্রুফ দেখতেন। আর টাকা পেলে নিয়মিত যেতেন ঠাঠারিবাজারের হাক্কার জুয়ার আড্ডায়।

একমাত্র মেয়ের বিয়েতে

‘৬৯-এর প্রথম দিকে রেডিওতে কবিতা পাঠের আসরে ডাক পান নির্মলেন্দু গুণ। ঢাকায় তার প্রচুর কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে। তিনি লিখতেন ‘সংবাদ’, ‘আজাদ’, ‘পাক জমহুরিয়াত’, ‘জোনাকী’ প্রভৃতি পত্র-পত্রিকাতে। প্রকাশিত হয় তার কলাম ‘ফসল বিনাসী হাওয়া’।

২১ জুলাই ১৯৭০। তরুণ কবিদের কবিতা পাঠের আসরে পাঠ করেন তার বিখ্যাত কবিতা ‘হুলিয়া’। হুলিয়া তাকে কবি খ্যাতি এনে দেয়। বড় বড় লেখকরা তার কবিতার প্রশংসা করেন। সমালোচনা লেখেন আব্দুল গাফফার চৌধুরী ‘তৃতীয় মত’ কলামে। খান ব্রাদার্স বের করে তার প্রথম কাব্য গ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’। পশ্চিমবঙ্গের শক্তিমান লেখক শক্তি চট্টোপাধ্যায় ‘পূর্ব বাংলার শ্রেষ্ট কবিতা’ গ্রন্থে ছাপেন ‘হুলিয়া’ কবিতাটি। এর পর আর থেমে থাকার সময় কোথায়? প্রেম ও গণমানুষকে তার কবিতার বিষয়বস্তুতে পরিণত করে একে একে লিখে চলেন কবিতা— ‘অমীমাংসিত রমণী’, ‘চৈত্রের ভালোবাসা’, ‘তার আগে চাই সমাজতন্ত্র’সহ আরও অনেক কবিতার বই।

১৯৭১ সালে যুদ্ধকালীন কলিকাতাস্থ আকাশবাণী ভবনে ‘বেতার জগত’ পত্রিকার সম্পাদক ডা. গাঙ্গুলীর সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নির্মলেন্দু গুণ। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কবিতাকে অস্ত্রে পরিণত করেন। তার নিজের ভাষায়— ‘কবিতা আমার নেশা, পেশা, প্রতিশোধ গ্রহণের হিরন্ময় হাতিয়ার।’ তার কবিতায় আছে দেশপ্রেম, সংগ্রাম, রাজনীতি। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে সমাজ জীবনের উজ্জীবন ও সাধারণ জীবনযাত্রাকে ধরতে সক্ষম ছিল তার কবিতার ফ্রেম।

মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল তার। অ্যালেন গিন্সবার্গ ছিলেন বাংলাদেশের একজন পরম সুহৃদ। যিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতা লিখে তাতে সুরারোপ করে গেয়ে বেড়িয়েছেন মিছিলে মিছিলে। প্রচারণা চালিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে।

নির্মলেন্দু গুণ সাহিত্য সাধনার জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমী পুরষ্কার, একুশে পদক, আলাওল সাহিত্য পুরষ্কার, কবি আহসান হাবীব সাহিত্য পুরষ্কার।

নির্মলেন্দু গুণ ১৯৪৫ সালের আজকের দিনে (২১ জুন) ময়মনসিংহের বারহাট্টার কাশবন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com