শুভ জন্মদিন জে কে রাউলিং

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাবলু ভট্টাচার্য

বিশ্বের ক্ষমতাধর ব্যক্তির তালিকায় থাকা একজন ব্যক্তি যদি তার নাম গোপন করেন তাহলে নিশ্চয়ই অবাক না হয়ে উপায় নেই। জে কে রাউলিং যেটি ছিল তার ছদ্মনাম। তার পুরো নাম জোয়ান জো রাউলিং।

ইঞ্জিনিয়ার বাবা পিটার এবং মা অ্যানির ঘরে জন্ম নেন এই কল্পকাহিনীর লেখিকা। যদিও তাঁর ঔপন্যাসিক হয়ে উঠার পিছনে কিছুটা কৃতিত্ব ছিল তার ছোট বোনের কেননা ছোট বোনকে গল্প শুনাতে শুনাতেই তার প্রথম হাতে খড়ি হয়। বাবা ও মা দুজনেই কর্মব্যস্ত মানুষ হওয়ায় রাউলিং ও তার ছোট বোনের জন্য প্রচুর গল্পের বই কিনতেন আর সেখান থেকেই রাউলিংয়ের লেখক হয়ে উঠার স্বপ্ন মনের এক কোনে বাসা বাধতে থাকে।

অত্যন্ত দারিদ্র ও গ্রামীন পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই লেখিকার জীবনজুড়ে কেবল একটিই স্বপ্ন ছিল, এবং সবসময় কেবল একটি কাজই করতে চেয়েছিলেন- সেটি হচ্ছে উপন্যাস লেখা। যথারীতি তাঁর বাবা-মা’র এই ব্যাপারে কোন সমর্থন ছিল না! কেননা তারা দুজনেই উঠে এসেছিলেন অস্বচ্ছল পরিবার থেকে, কলেজ পর্যন্ত পড়ালেখাও করেননি দুজনের কেউ।

তাদের ইচ্ছা ছিল মেয়ে পড়াশুনা করে ডিগ্রী অর্জন করে ভাল চাকরি করে তাদের সহযোগীতা করবে তাই রাউলিংয়ের অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ভর্তি হন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা বিভাগে কিন্তু পরে অবশ্য তিনি বাবাকে না জানিয়েই ভর্তি হন ইংরেজী সাহিত্যে।

যখন তার বয়স ২৫ তখন  ১৯৯০ সাল সে সময় তার মা মারা যান। এটা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কষ্টকর অধ্যায়ের শুরু। এ সময়ই তিনি স্বল্প বেতনের চাকরী ছেড়ে পর্তুগালে ইংরেজীর শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৯২ এ পরিচয় হয় টেলিভিশন সাংবাদিক জর্জ অ্যারান্তিসের সঙ্গে। আর সেখান থেকেই পরিচয়-প্রণয়-বিয়ে আর পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯৩ এ জন্ম নেয় প্রথম কন্যাসন্তান জেসিকা মিটফোর্ড। একই বছর সংসার ভাঙে রাউলিংয়ের। মানসিক অসুস্থতা, একমাত্র সন্তান ও বিয়ে বিচ্ছেদের দুঃখ নিয়ে ফের ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন তিনি।

 

ফিরে এলেন, কিন্তু কোন চাকরী পেলেন না, ভর্তি হলেন টিচার ট্রেইনার কোর্সে। সরকারী ভাতার উপর নির্ভরশীল একজন সিঙ্গেল মাদার, পকেটে কোন টাকা নেই, বাসা ভাড়াটাও ঠিক মত দিতে পারেন না, এমনকি খাবারও কিনতে পারেন না… । ফলাফল যা হবার তাই হলো, মানসিক বিষন্নতায় রাউলিং আত্নহত্যার চেষ্টা করেন। তিনি এ সময়টাকে ব্যাখ্যা করেছেন, “আমি যতদুর জানি তার মধ্যে আমিই হচ্ছি একমাত্র সর্বশ্রেষ্ঠ অসফল মানুষ।”

১৯৯০ এর প্রথমদিকে একদিন রাউলিং ট্রেনে করে ম্যানচেষ্টার থেকে লন্ডন যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তার মাথায় একটা গল্পের ধারনা আসে যেখানের মূল চরিত্রটি ছিল মোটা ফ্রেমের চশমা পরা বিস্ময় বালক হ্যারি। তিনি লেখা শুরু করেন হ্যারি পটার সিরিজের প্রথম খণ্ড “হ্যারি পটার এন্ড দ্য ফিলোসফার’স স্টোন”। রাউলিং ততটা মেধাবি শিক্ষার্থী ছিলেন না, তার লেখা কখনো কোথাও প্রকাশ হয়নি, একটা গল্প লেখার চেয়েও চাকুরি খোঁজাটা তার জন্যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু তিনি সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় কাজটাই করলেন, তিনি লেখা শুরু করলেন। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, তিনি বেশিরভাগ সময় লিখতেন একটা লোকাল ক্যাফেতে যার নাম ছিল নিকলসন ক্যাফে। তার ক্যাফেতে লেখার কারণ ছিল, উনি চাইতেন ক্যাফেতে হেঁটে যাওয়ার ক্লান্তিতে তার মেয়ে ঘুমিয়ে পড়ুক আর তিনি একান্ত মনে লিখতে পারেন।

একে একে বারোটি প্রকাশনা সংস্থা তার “হ্যারি পটার এন্ড দ্য ফিলোসফার’স স্টোন” প্রকাশে অনীহা দেখিয়েছিল। যেটি হয়তো দুর্বল হৃদয়ের মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়টা অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার তারপরও রাউলিং সবকিছুকে পিছনে ফেলে অনেক কষ্টে একজন এজেন্টকে খুজে পান তার নাম ছিল ব্যারি ক্যানিংহাম যিনি রাউলিংকে উপদেশ দিয়েছিলেন বই না লিখে তার বরং একটা চাকুরির চেষ্টা করা উচিত। এবং তার মাধ্যমেই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ব্লুমসবেরি তার বইটি প্রকাশের আগ্রহ দেখায়। মাত্র ১৫০০ পাউন্ড অগ্রিম অর্থ নিয়ে তিনি পাণ্ডুলিপিটি প্রকাশনীর কাছে হস্তান্তর করেন। তারা মাত্র এক হাজার কপি বই প্রকাশ করে। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি জে কে রাউলিংকে।

বইটি প্রকাশের পর ছেলেবেলার স্বপ্ন যেন বাস্তবে রূপ নেয়। প্রকাশের বছরেই বইটি জিতে নেয় ‘নেস্লে স্মার্টিস বুক প্রাইজ’ এবং শিশু সাহিত্য বিভাগে ‘ব্রিটিশ বুক অ্যাওয়ার্ড’। এছাড়াও চারটি হুইটেকার প্লাটিনাম বুক এওয়ার্ডস, তিনটি নেসলে স্মার্টিস বুক প্রাইজ, দুটি স্কটিশ আর্টস কাউন্সিল বুক এওয়ার্ডস , উদ্বোধনী হুইটব্রেড বর্ষসেরা শিশুতোষ গ্রন্থ পুরষ্কার, ডব্লিউ এইচ স্মিথ বর্ষসেরা বই।

২০০৭ সালে হ্যারি পটার সিরিজের সর্বশেষ খণ্ডটি প্রকাশিত হয়। এই খণ্ডের নাম ছিল ‘হ্যারি পটার এন্ড ডেথলি হ্যালোস’। হ্যারিপটার সিরিজের চতুর্থ বইটি প্রকাশের প্রথম দিন তিন লাখ কপি বিক্রি হওয়ার অনন্য নজির স্থাপন করেছে ইতিমধ্যে। হ্যারি পটার সিরিজের মাধ্যমে জে কে রাউলিং শুধু লেখক খ্যাতিই নয় বরং প্রভাবশালী ও অর্থশালীদের তালিকায়ও স্থান করে নেন।

এই সিরিজের ৭টি বই ৪০০ মিলিয়ন কপিরও বেশি বিক্রি হয়েছে, যা সিরিজ বইয়ের ক্ষেত্রে অলটাইম রেকর্ড। এই সিরিজের মুভির আয়ও রেকর্ড বইয়ের পাতা নতুন করে লিখিয়েছে।

জে কে রাউলিং এখন ইংল্যান্ডের অন্যতম ধনী মানুষ। ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ফোর্বস পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে তার সম্পত্তির পরিমাণ £৫৭৬ মিলিয়ন (১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কিছু বেশি), যা তাকে বই-লিখে বড়লোক হওয়া প্রথম বিলিয়নিয়ার (আমেরিকান ডলারে) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। ২০০৬ সালে ফোর্বস পত্রিকা তাকে অপরাহ উইনফ্রের পর পৃথিবীর দ্বিতীয় সেরা মহিলা ধনী হিসেবে তথ্য প্রকাশ করেছে। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠান দরিদ্র এবং শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করে।

২০০১ সালে নিল মিখাইল মুরিকে দ্বিতীয়বারের মতো বিয়ে করেন রাউলিং। এই দম্পতির একমাত্র পুত্রসন্তান ডেভিড গর্ডন রাউলিং মুরি। এক সাক্ষাৎকারে রাউলিং বলেন- ‘জীবনের স্বপ্ন এবং সম্ভাবনার কথাগুলোই আমি লিখি। আমাদের পৃথিবীকে পাল্টে ফেলতে কোনো জাদুর প্রয়োজন নেই। অন্তরে আমরা সব শক্তিকেই ধারণ করি। ভালো কিছু করার কল্পনা শক্তিই শুধু আমাদের প্রয়োজন।’

জে কে রাউলিং ১৯৬৫ সালের আজকের দিনে (৩১ জুলাই) ইংল্যান্ডের গ্লুসেস্টারশায়ারের ইয়েটে শহরে জন্মগ্রহণ করেন।

ছবিঃ গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com