শুভ জন্মদিন জিম করবেট

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাবলু ভট্টাচার্য

পৃথিবীতে এমন অনেক ব্যক্তি আছেন যারা স্বীয় যোগ্যতা, মেধা, সাহস, বীরত্ব ও দেশপ্রেমের জন্য অমর হয়ে আছেন। এদের মধ্যে ভারতের দুঃসাহসী শিকারী জিম করবেটের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।জিম করবেটের পুরো নাম এডওয়ার্ড জেমস করবেট। তবে তাকে ‘জিম করবেট’ নামেই সকলে চেনে। তার বাবা ক্রিস্টোফার গার্নি, জাতিতে আইরিশ ছিলেন এবং তিনি নৈনিতালে পোস্টমাস্টারের চাকরি করতেন। জিম করবেটের মায়ের নাম মেরী জেন এবং বড় ভাইয়ের নাম টমাস বা টম। করবেটের বয়স যখন চার বৎসর তখন তার বাবা মারা যান। বড় ভাই টম পোস্টমাস্টারের চাকরি পান এবং তিনি পরিবারের দায়িত্ব নেন। করবেটের পিতা নৈনিতালের আয়ারপাটায় ‘গার্নি হাউস’ নামে যে ভবন তৈরি করেন সেখানেই করবেট শৈশব কাটে।

ছোটবেলা থেকেই করবেট শিকার করতেন। বড় হয়ে তিনি বিখ্যাত শিকারী হয়ে উঠলেন। তবে, তিনি এসব শিকার কাহিনী মোটেও লিখতে চাননি। কিন্তু বন্ধুদের বিশেষ অনুরোধে তিনি লিখে ফেললেন তার জীবনে ঘটে যাওয়া সব রোমাঞ্চকর শিকার কাহিনী। তিনি সহজ করেই লিখে বসলেন ভয়ঙ্কর সব মানুষখেকোদের কথা, যাদের তিনি শিকার করেছেন।

১৯৪৬ সালে ম্যান ইটার্স অফ কুমায়ুন’ নামে শিকার কাহিনী নিয়ে লেখা তার প্রথম বইটি প্রকাশিত হয়। বইটি খুব দ্রুত সারাবিশ্বে শিকারকাহিনী হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। এর পর তিনি শিকার কাহিনী নিয়ে একে একে লিখে ফেললেন ‘ম্যান ইটিং লেপার্ড অব রুদ্রপ্রয়াগ’ (১৯৪৮) ‘মাই ইন্ডিয়া’ (১৯৫২), ‘জঙ্গল লোর’ (১৯৫৩), দ্য টেম্পল টাইগার অ্যান্ড মোর ম্যান ইটার্স অব কুমায়ন’ (১৯৫৪)-এর মতো লোমহর্ষক সব শিখার কাহিনীগুলো।

করবেট তার লেখায় নিজের জীবনের সব কথাই বর্ণনা করেছেন। তার লেখা থেকে জানা যায়, বড় ভাই টমের উৎসাহে ছোটবেলা থেকেই শিকারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ছোট জিমকে শিকারে নিয়ে যেতেন টম। বন্দুক সঙ্গে নিয়ে দু’ভাই শিকারে বেরিয়ে পড়তেন। একবার এক বুনো ভাল্লুক শিকারে যান টম। ছোট ভাই জিমকেও সঙ্গে নিয়ে যান টম। ছোট ভাই জিম করবেটকে এক জায়গায় একটি বন্দুকসহ অপেক্ষা করতে বলে টম শিকারের সন্ধানে অগ্রসর হন। ঘন অন্ধকারে ছোট জিম লক্ষ্য করলেন কিছু প্রাণী নড়াচড়া করতে করতে তার দিকে এগিয়ে আসছে। জিম ভয় পেলেন, দৌড়ে পালানোর পথও নেই। প্রাণীগুলো কাছাকাছি চলে এলে জিম টের পেলেন, এগুলো ভয়ঙ্কর মানুষখেকো নেকড়ে। ছোট জিম ভয়ে কাঁপতে শুরু করল। দূর থেকে ছোট ভাই জিমের অবস্থা দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন বড় ভাই টম।

শেষতক জিম মোটেও নড়াচড়া করলেন না। বরং সাহস করে বন্দুক উঁচিয়ে ধরলেন। নেকড়েগুলো তাকে আক্রমণই করল না, আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলেন জিম। তিনি গুলী চালাবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছিলেন। আত্মবিশ্বাসী জিম সাহস দিয়েই জয় করলেন জঙ্গলের ভয়। টম ফিরে এসে জিমকে বললেন, সে ভয় পেয়েছে কিনা। জিম নির্বাক। এতক্ষণে তার হুশ হলো যে শিকারে এসেছে। জিম বাল্যকালে নৈনিতালের স্কুলে পড়ার সময়ই বন্দুক চালানোয় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। সে সময় অভিজাত পরিবারের সব সন্তানকেই বন্যপ্রাণীর হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য বন্দুক চালানো শিখে নিতে হতো। তাছাড়া সে সময় শিকারটাই ছিল অবসর কাটানোর সময়।

তিনি ১৯০৭ সালের দিকে মানুষ খেকো চম্পাবতের বাঘিনী শিকার করেন। এটাই তার কর্মজীবনের প্রথম বাঘ শিকার। নিছক শিকারের রোমাঞ্চ আর আনন্দ পাওয়ার জন্য জিম করবেট শিকার করতেন না। যে সব প্রাণী মানুষের জন্য ত্রাস কিংবা হুমকি সৃষ্টি করত তিনি কেবল সেসব প্রাণীই শিকার করতেন। জিম করবেট এমন সব ভয়ঙ্কর প্রাণী শিকার করেছিলেন সেসব প্রাণীর নাম মুখে আনতেও সাধারণ মানুষ ভয় পেতো। তারা বিশ্বাস করতো এগুলো এমনই ভয়ঙ্কর যে, এদের নাম মুখে আনলেও সর্বনাশ হবে। আর এ প্রাণীগুলো বাস্তবিক অর্থেই ছিল ভয়ঙ্কর। কেউ সামনে পড়লে তার রেহাই ছিল না। যেমন তাদের ভয়ঙ্কর চেহারা তেমনি তাদের আচরণ। প্রয়োজনে সামনে গিয়ে এসব প্রাণী শিকার করতেন। তার শিকারে যেমন চাতুর্য ছিল তেমনিই ছিল দূরন্ত সাহস। বৎসরের পর বৎসর ধরে বিশাল এলাকাজুড়ে এসব প্রাণী ত্রাসের সৃষ্টি করত।

এই মানুষখেকো বাঘগুলো শত শত মানুষ আর গবাদিপশু হত্যা করে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় হুমকি সৃষ্টি করত। কেবল তাই নয়, এদের যারা শিকার করতে ফাঁদ পাততো, সেসব ফাঁদও অদ্ভুত কৌশলে এ প্রাণীগুলো এড়িয়ে যেতো। এসব প্রাণী ছিল যেমন ধূর্ত তেমন ভয়ঙ্কর। সবাই যখন শিকারে ব্যর্থ হতো তখনই জিম করবেটের ডাক পড়তো। জিম শিকারী হিসেবে ছিলেন খুবই সাহসী এবং তিনি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে ভালোবাসতেন। তিনি কেবল এলাকাবাসীর বা সরকারের অনুরোধেই শিকারে যেতেন।

আর তিনি শিকারে কখনো ব্যর্থ হননি। তার শেষ মানুষখেকো বাঘিনী শিকারের ঘটনা ছিল ১৯৩৮ সালে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণেও তার বিরাট অবদান ছিল। ভারতের সব বন, এমন কি সংরক্ষিত বন যেখানে ঢোকার পূর্বে অনুমতি নিতে হয়, সেখানেও তার ছিল অবাধ প্রবেশাধিকার। কেন না তার মতো শিকারী বনে প্রবেশ করলে বনের তো কোন ক্ষতি হবে না বরং বন ভবনের আশপাশের মানুষগুলোর উপকারই হবে।

১৯৪৭ সালে জিম করবেট আফ্রিকার কেনিয়ায় গিয়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনে শরিক হন। তার নেতৃত্বে এ আন্দোলন বিরাট জনপ্রিয়তা লাভ করে। কেনিয়াতে অবস্থানকালে তিনি ‘ট্রি টপস’নামে একটি বই লিখে শেষ করেন। এই মহান ও দুঃসাহসী শিকারী ১৯৫৫ সালের ১৯ এপ্রিল পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। তাকে সমাহিত করা হয় সেন্ট পিটার্স অ্যাংকলিন চার্চ সিমেট্রিতে।

জিম করবেট ১৮৭৫ সালের আজকের দিনে (২৫ জুলাই) ভারতের নৈনিতালে জন্মগ্রহণ করেন।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com