শুভ জন্মদিন ওরহান পামুক

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাবলু ভট্টাচার্য

সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছিলেন কাবুল শহর পরিভ্রমণে গেলে একখানা পুস্তক সঙ্গে নিলেই চলে এবং তা নেওয়া অবশ্য কর্তব্য, সম্রাট বাবরের আত্মজীবনী ‘বাবুরনামা’। সেই মোগল বাদশার আমল থেকে কাবুলের চেহারা বা রীতিনীতি নাকি এমন কোন পরিবর্তন হয় নি, কাজে কাজেই বাবুরনামা সঙ্গে থাকছেই কাবুলের যাত্রাপথে সঙ্গী হয়ে যাযাবরদের কলিযুগেও ।

এই বিষয়ে কোনরূপ তুলনার ধৃষ্টতা নেই, কিন্তু বিশ্বের যে শহরটি সম্ভবত সবচেয়ে বেশী সময় জানা বিশ্বের রাজধানী বা কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, যে একটি মাত্র শহর দুই দুইটি মহাদেশ জুড়ে অবস্থিত, সেই ইস্তাম্বুল ঘুরতে গেলে সঙ্গে যে বইটি নিয়ে যাওয়া অবশ্য কর্তব্য সেটি ওই মহানগরীরই বাসিন্দা ওরহান পামুকের আত্মজীবনী— ‘ইস্তাম্বুল’।

ফেরিত ওরহান পামুক যিনি সাধারণত ‘ওরহান পামুক’ নামে পরিচিত। তিনি তুরস্কের অন্যতম প্রধান লেখক। তিনি ২০০৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। বিশ্বের ৬০টিরও বেশি ভাষায় তাঁর ১১ মিলিয়নের (১কোটি ১০ লক্ষ) বেশি বই বিক্রি হয়েছে— যার ফলশ্রুতিতে তিনি পরিণত হয়েছেন তুরস্কের সবচেয়ে প্রচারিত কথাসাহিত্যকে।

ওরহান পামুক ‘The White Castle’, ‘The Black Book’, ‘The New Life’, ‘My Name Is Red’, ‘Snow’ ও ‘The Museum of Innocence রচনা করেছেন।

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ছাড়াও (নোবেল প্রাপ্ত প্রথম তুর্কি) পামুক অজস্র পুরস্কারে ভূষিত। ‘My Name is Red’ ২০০২ সালে অর্জন করে Prix du Meilleur Livre Étranger, Premio Grinzane Cavour এবং ২০০৩ সালে International IMPAAC Dublin Literary Award.

অটোমান সাম্রাজ্য-এ আর্মেনিয় গণহত্যা সম্পর্কে মন্তব্য করায় ২০০৫ সালে তুরস্কে তাঁকে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়। পামুকের নিজস্ব বক্তব্য, তিনি তাঁর জন্মভূমিতে বাক-স্বাধীনতার অভাবের প্রতি আলোকপাত করাই তার উদ্দেশ্য ছিল। এর ফলশ্রুতিতে মিছিলে তার বই পোড়ানো হয়। তাকে হত্যার চেষ্টাও করা হয।

পামুক ইস্তাম্বুলের একটি বিত্তবান কিন্তু পতনরত উচ্চশ্রেণীর পরিবারে বড় হন— যে অভিজ্ঞতা চিত্রিত হয়েছে তার ‘The Black Book’ এবং ‘ছেফদাত বে ও তার ছেলেরা’ উপন্যাসে। এ অভিজ্ঞতা আরো পুংখানুপুংখ ভাবে উঠে আসে তার আত্মজীবনী ‘ইস্তাম্বুল’ গ্রন্থে। তিনি পড়াশোনা করেন Robert College-এ এবং স্থাপত্য বিদ্যা নিয়ে। তিনি ভেবে ছিলেন স্থাপত্য তার প্রকৃত স্বপ্ন চিত্রশিল্পী হওয়ার পথ সুগম করবে। কিন্তু ৩ বছর পর তিনি স্থাপত্য পড়া বাদ দিয়ে ১৯৭৬ সালে University of Istanbul-এর সাংবাদিকতা ইন্সটিটিউট থেকে স্নাতক পাশ করেন। ২২ থেকে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত পামুক তার মায়ের সঙ্গে বসবাস করেন এবং তার প্রথম উপন্যাস লেখার পাশাপাশি প্রকাশক খুঁজতে থাকেন।

১৯৭৪ থেকে পামুক নিয়মিত লেখা শুরু করেন। তার প্রথম উপন্যাস ‘আলো ও আঁধার’ (Karanlık ve Işık) ১৯৭৯ সালে যৌথ ভাবে মিলিয়েত প্রেস উপন্যাস প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়— যা ১৯৯৮২ সালে Cevdet Bey ve Oğulları (ছেফদাত বে ও তাঁর ছেলেরা) নামে প্রকাশিত হলে ১৯৮৩ সালের Orhan Kemal পুরস্কার লাভ করে। এ লেখায় উঠে আসে একই পরিবারের তিন প্রজন্মের উপাখ্যান।

১৯৯০ সালে প্রকাশিত Kara Kitap (The Black Book, কালো পুস্তক) উপন্যাস তাকে এনে দেয় জনপ্রিয়তা। বইটি আলোচিত হয়ে ওঠে এর জটিল রচনাশৈলী ও প্রাচুর্যতার জন্যে। এ উপন্যাস অবলম্বনে একটি ছায়াছবি চিত্রায়িত হয়— যা পরিচালনা করেন বিখ্যাত তুর্কি পরিচালক Ömer Kavur(ওমর কাফুর)।

১৯৯৫ সালে প্রকাশিত পামুকের ৫ম উপন্যাস Yeni Hayat (নতুন জীবন) তুরস্কে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং সবচেয়ে দ্রুত বিক্রি হওয়ার রেকর্ড করে।
ইতিমধ্যে তিনি আলোচিত-সমালোচিত হতে থাকেন কুর্দি জনগণের পক্ষে কথা বলার জন্যে।

আমার নাম লাল (My Name Is Red)
২০০০ সালে প্রকাশিত আমার নাম লাল পামুককে পৌঁছে দেয় জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। উত্তরাধুনিক রচনাশৈলীতে এ উপন্যাসে বিধৃত হয় চিত্রকলা, রহস্য, দর্শন ও প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের দ্বন্দ এবং বর্ণিত হয় ১৬ শতকের অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান মুরাট তৃতীয়ের (Sultan MuratIII) রাজত্বের তুষারাচ্ছন্ন ৯টি দিন। পাশ্চাত্যের রেঁনেসার প্রভাবে প্রাচ্যের শিল্পের অস্তিত্ব সংকট পাঠককে চলমান প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের অস্থিরতার কথাই স্বরণ করিয়ে দেয়।

২৩টি ভাষায় অনূদিত বইটি ২০০৩ সালে জিতে নেয় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অর্থমূল্যের সাহিত্য পুরস্কার International Dublin Literary Award।

তুষার (Snow)
পামুকের পরবর্তী উপন্যাস Kar, (তুষার বা Snow) বাজারে আসে ২০০২ সালে। এ উপন্যাসে সীমান্তবর্তী শহর কারসের (Kars) ইসলামিক ও পাশ্চাত্যের দ্বন্দের পরিবেশ চিত্রিত হয়েছে। প্রবাসি তুর্কি কবি কা এ শহরে হিযাব পরিহিত নারীদের ঘন ঘন আত্মহত্যার ঘটনা উদ্ঘাটনের উদ্দেশ্যে এসে মুখোমুখি হয় পুরাতন প্রেমিকার, উগ্র আদর্শে বিশ্বাসী মাওলানা ও নেতার, দূর্নীতি-গ্রস্থ প্রশাসনের, নাস্তিকতার এবং মৌলবাদি ও উদারপন্থিদের সংঘর্সের মধ্যে পড়ে যায়।

নিস্পাপের জাদুঘর (The Museum of Innocence)
২০০৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার পর ২০০৮ সালের গ্রীষ্মে তিনি প্রকাশ করেন নিস্পাপের জাদুঘর বা Museum of Innocence নামক উপন্যাস।
এ উপন্যাসের সাথে সম্পর্কিত দৈনন্দিন সামগ্রি নিয়ে পামুক ইস্তাম্বুলে একটি সত্যিকার জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেন।

ওরহান পামুক ১৯৫২ সালের আজকের দিনে (৭ জুন) ইস্তাম্বুল-এ জন্মগ্রহণ করেন।

ছবি:গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com