শিলচর ভাষা আন্দোলন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাগর লোহানী

আসামের ভাষা আন্দোলনের ৫৬তম বার্ষিকী এ বছর। বাঙালি অধ্যুষিত বরাক উপত্যকার শিলচরে বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন হয়েছিল আমাদের ৫২র ২১ ফেব্রুয়ারীর নয় বছর পর ১৯৬১ সালের ১৯ মে আসামের রাজ্যভাষা হিসেবে বাংলাভাষাকে স্বীকৃতি দানের দাবিতে।
মায়ের ভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সেদিন ১১ জন বাঙালি শহীদ হন।
ভাষা শহীদরা হলেন:
১) কমলা ভট্টাচার্য ১৬ (পৃথিবীর প্রথম নারী ভাষা শহীদ) -পৈত্রিক নিবাস সিলেট-বাংলাদেশ;
২) শচীন্দ্রমোহন পাল ১৯ -পৈত্রিক নিবাস হবিগঞ্জ-নবীগঞ্জ-চন্দনপুর-বাংলাদেশ;
৩) বীরেন্দ্র সূত্রধর ২৪ -পৈত্রিক নিবাস-হবিগঞ্জ-নবীগঞ্জ-বহরমপুর-বাংলাদেশ;
৪) কানাইলাল নিয়োগী ৩৭ -পৈত্রিক নিবাস ময়মনসিংহ-খিলদা-বাংলাদেশ;
৫) চন্ডিচরন সূত্রধর ২২ -পৈত্রিক নিবাস হবিগঞ্জ-জাকেরপুর-বাংলাদেশ;
৬) সত্যেন্দ্র কুমার দেব ২৪ -পৈত্রিক নিবাস বাংলাদেশ;
৭) হীতেশ বিশ্বাস -পৈত্রিক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়া-বাংলাদেশ;
৮) কুমুদরঞ্জন দাস -পৈত্রিক নিবাস মৌলভীবাজার-জুরি-বাংলাদেশ;
৯) তরণী দেবনাথ ২১ -পৈত্রিক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়া-বাংলাদেশ;
১০) সুনীল সরকার- পৈত্রিক নিবাস ঢাকা-মুন্সিবাজার-কামারপাড়া-বাংলাদেশ;
১১) সুকোমল পুরকায়স্থ -পৈত্রিক নিবাস-করিমগঞ্জ-বাগবাড়ি-আসাম-ভারত।

জান দেবো তবু জবান দেবো না

বাঙালী জাতিই বিশ্বে একমাত্র জাতি যারা দুটি দেশে নয় বছরের মধ্যে দুবার ভাষার অধিকার আদায়ের দাবীতে রক্ত দিয়েছে। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন হয়েছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। সেই পথ ধরে আসামের বাঙালি অধ্যুষিত বরাক উপত্যকার শিলচরে বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন হয়েছিল নয় বছর পর ১৯৬১ সালের ১৯ মে আসামের রাজ্যভাষা হিসেবে বাংলাভাষাকে স্বীকৃতি দানের দাবিতে। সেই ভাষা আন্দোলনে আসামে শহীদ হয়েছিলেন ১১ জন।

অবিভক্ত বাংলার সিলেট জেলার অংশ কাছাড় (শিলচর),করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি- কে বাংলা থেকে নির্মমভাবে বিছিন্ন করে আসাম প্রদেশের সাথে মিলিয়ে দেওয়া হয়। খাঁটি বাঙালি হয়েও এপার বাংলা-ওপার বাংলা কোনো বাংলাতেই স্থান হলো না এই হতভাগ্য ঈশান বাংলার বাঙালিদের। এই দুঃখিনী ঈশান বাংলা বা বরাক ভ্যালির বাঙালিরা নিজ ভূমে পরবাসী হয়ে যায়।

আসামের ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটও প্রায় আমাদের মতই ছিল। ১৯৬০ সালের ২১ এবং ২২ এপ্রিল আসাম প্রদেশ কংগ্রেস প্রস্তাব গ্রহণ করে ‘অহমীয়াকে রাজ্যভাষা করতেই হবে।’ আসামের মুখ্যমন্ত্রী বিমলাপ্রসাদ চালিহা এই প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে বলেন,‘দাবিটা রাজ্যের অনসমীয়াবাসীদের নিকট থেকে আসুক’। কিন্তু মাস দুয়েক যেতে না যেতেই বিধান সভায় তিনি ঘোষণা করেন ‘অহমীয়াকে রাজ্যভাষা করার জন্য সরকার শিগগিরই একটি বিল আনছেন।’উগ্র জাতীয়তাবাদীদের তান্ডব তখন গৌহাটী গোরেশ্বরে ছড়িয়ে পড়েছে। রাজ্যভাষা করার নামে সাম্প্রদায়িক আন্দোলন গড়ায় ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায়। ২ জুলাই,১৯৬০ শিলচরে ডাকা হয় ‘নিখিল আসাম বাঙলা ও অন্যান্য অনসমীয়া ভাষা সম্মেলন’। প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিল লুসাই-খাসিয়া-গারো-মণিপুরী-বাঙালি সবাই। সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গৃহীত হয় ‘ভাষা প্রশ্নে স্থিতাবস্থা বজায় থাকবে।’ কেন্দ্রের কাছে প্রার্থনা জানানো হলো ‘ভাষার প্রশ্নে হস্তক্ষেপ করুন’।

ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় নরমেধ যজ্ঞ শুরু হলো। দাঙ্গা বিধ্বস্ত এলাকা ছেড়ে সংখ্যালঘুরা পশ্চিমবঙ্গ,উত্তরবঙ্গ ও কাছাড়ে পালাল। পুলিশ পক্ষপাতমূলক আচরণ শুরু করলো। স্থানে স্থানে দাঙ্গাকারী আর পুলিশ এক হয়ে আক্রমণ চালালো। তাদের বর্বরতা পশুর হিংস্রতাকে ছাড়িয়ে গেল। ১৯৬০ সালের ১৫ আগস্ট। কলকাতা শোক দিবস পালন করল। উগ্রজাতীয়তাবাদী বর্বরতার প্রতিবাদে সরকারি-বেসরকারি সমস্ত অনুষ্ঠান বর্জন করা হল। পরবর্তী লোকসভা অধিবেশনে আলোড়ন উঠল,পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা উত্তেজনায় ফেটে পড়ল। প্রধানমন্ত্রী নেহেরু শান্তি দূত পাঠালেন গোবিন্দবল্লভ পন্থকে। পন্থজী ফর্মুলা দিলেন। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা নির্দ্বিধায় তা নাকচ করে দিল। কাছাড়বাসীর প্রতিনিধিরা ছুটলেন দিল্লী। দিল্লী নির্বিকার।

চালিহা প্রথমবার ক্ষমতায় আসার তিন বছরের মাথায় ১৯৬০ সালের অক্টোবর মাসের ১০ তারিখে অহমীয়াকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য রাজ্য আইন পরিষদে বিল উত্থাপিত হয়। উত্তর করিমগঞ্জ থেকে নির্বাচিত বিধায়ক ও বাঙালি হিন্দু নেতা রনেন্দ্র মোহন দাস এই মর্মে বিলটির বিরোধিতা করেন যে এর ফলে বরাক উপত্যকার দুই তৃতীয়াংশ মানুষের ভাষার ওপর এক-তৃতীয়াংশ মানুষের ভাষাকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হবে। অধিকন্তু এটি ১৯৫৬ সালের রাজ্য পুনর্গঠন কমিটির সিদ্ধান্তের পরিপন্থী হবে। সেই সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল কোন রাজ্যের জনসংখ্যার শতকরা ৭০ জন যদি একটি মাত্র ভাষায় কথা বলে, কেবলমাত্র তাহলেই ঐ ভাষা একক সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। শিলচর, করিমগঞ্জ এবং হাইলাকান্দিতে বসবাসকারীদের ৮০ শতাংশই ছিল বাঙালি। কিন্তু প্রয়োজনীয় সমর্থনের অভাবে রনেন্দ্র মোহনের বিরোধিতায় কোন কাজ হয়নি। ১৯৬০ সালের ২৪ অক্টোবর রাজ্যভাষা বিল পাস হয়ে গেল আসাম বিধানসভায়। নতুন আইনে সমগ্র আসামে সরকারি ভাষা হলো অহমীয়া। শুধু কাছাড়ের জন্য জেলান্তরে রইলো বাংলা ভাষা।

সমগ্র কাছাড় থেকে প্রতিবাদ সোচ্চার হয়ে উঠল ‘এ রাজ্যভাষা বিল আমরা মানি না,মানবো না। বাংলাকে অন্যতম সরকারি ভাষা করতে হবে’। ১৯৬১ সালের ১৫ জানুয়ারি। শীলভদ্র যাজীকে সভাপতি করে করিমগঞ্জে সম্মেলন ডাকা হলো। শিলচর সম্মেলনের প্রস্তাব নতুন করে ঘোষণা করা হলো। সমগ্র কাছাড় জেলায় বিক্ষোভ দানা বেঁধে উঠল। ভাষার প্রশ্নে সমগ্র কাছাড় এক মন এক প্রাণ হয়ে শপথ নিল ‘জান দেবো তবু জবান দেবো না’, ‘মাতৃভাষার মর্যাদা যে কোন মূল্যে রক্ষা করবোই’।

কাছাড়ের যৌবন তরঙ্গ টগবগ করে উঠল। তবু আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে শেষ চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কি! আবার ডাকা হলো সম্মেলন। ৫ ফেব্রুয়ারি,করিমগঞ্জ রমণীমোহন ইনস্টিটিউটে কাছাড় জেলা গণসম্মেলন আহ্বান করা হলো। সম্মেলনের একমাত্র দাবি ‘বাংলাকে আসামের অন্যতম রাজ্যভাষা রূপে মানতে হবে।’ আসাম সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়ে ১৩ এপ্রিলের ভেতর শেষ জবাব চাওয়া হলো। ১৩ এপ্রিলের মেয়াদ শেষ হলেও আসাম কংগ্রেস সরকার রইল নিরুত্তর। অতএব সমরে ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। ঘরে ঘরে সংগ্রাম পরিষদের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী তৈরি হতে লাগল। এক নতুন মন্ত্রে দীক্ষিত হতে লাগল গোটা কাছাড়।
একটি ঐতিহাসিক তারিখ ঘোষিত হলো ১৯ মে ১৯৬১। ১৮ মে,নিঃসন্দেহে সেদিনটিও ছাত্র প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে স্মরণীয়। ছাত্রসমাজের ডাকে করিমগঞ্জ শহরে যে শোভাযাত্রা বের হয় তা নিঃসন্দেহে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল। সর্বস্তরের মানুষ সেদিন ভুলে গিয়েছিল এ ছিল শুধু ছাত্রসমাজের শোভযাত্রা। আবালবৃদ্ধবনিতা যোগ দিয়েছিল মাতৃভাষার ডাকে সেই শোভাযাত্রায়। শাসকগোষ্ঠীও শক্তির পরিচয় দেখাতে পিছ পা হননি। সমগ্র জেলার ব্যাটালিয়নের পর ব্যাটালিয়ন সৈন্য দিয়ে ছেয়ে ফেলা হলো। জারি করা হলো সমগ্র জেলায় ১৪৪ ধারা। রাস্তায় রাস্তায় নামানো হলো মিলিটারি আর টহলদার বাহিনী। সন্ত্রাস জাগিয়ে তোলার অপচেষ্টা শুরু হলো।
করিমগঞ্জের সংগ্রাম পরিষদের দুই নেতা রথীন্দ্রনাথ সেন, নলিনীকান্ত দাস ও ছাত্রনেতা নিশীথরঞ্জন দাসকে ১৮ মে গ্রেপ্তার করে শিলচর নিয়ে যাওয়া হলো। ভাষা আন্দোলনের ডাক গোটা কাছাড়ের চেহারা পালটে দিয়েছিল তাই এ গ্রেফতারে প্রত্যেকটি জনপদ গ্রাম যেন বিক্ষোভে আরও ফুঁসে উঠলো। সহস্র বলিষ্ঠ কণ্ঠে আওয়াজ উঠলো ‘মাতৃভাষা জিন্দাবাদ’। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য গোটা কাছাড় প্রস্তুত হয়ে রইলো।

ভাষা শহীদদের ছবি

১৯ মে ভোর চারটা থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত হরতালের ডাক দেয় কাছাড় জেলা সংগ্রাম পরিষদ। যেভাবে হোক ট্রেনের চাকা চলতে দেওয়া হবে না। বিমান ঘাঁটিতে বিমানের পাখা ঘুরবে না। অফিসের তালা খুলবে না।
ভোর হতেই শত শত সত্যাগ্রহী বসে পড়ল রেল লাইনের ওপর। বিমান ঘাঁটিতে রানওয়ের ওপর শুয়ে পড়ল সত্যাগ্রহীরা। সারি সারি দাঁড়াল অফিসের গেটের সামনে। শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি, পাথারকান্দি, বদরপুর সবক’টি জায়গায় সত্যাগ্রহীরা শান্তিপূর্ণ উপায়ে কর্তব্য পালনে প্রস্তুত।

লেখক অলক রায় তাঁর ‘ভাষা আন্দোলনে কাছাড়’ বইয়ে লিখেছেন কতটা স্বতঃস্ফূর্ত ছিল সেদিনের ধর্মঘট, “করিমগঞ্জ রেলস্টেশন। ভোরের ট্রেন আটকাতেই হবে। সত্যাগ্রহীরা রেললাইন আগলে বসলো। কয়েকজন আবার রেললাইনের ওপর উপুড় হয়ে শুয়েও পড়ল। রেলের চাকা যদি চলে ওদের উপর দিয়ে পিষে বেরিয়ে যায় যাক ক্ষতি নেই। আচমকা পুলিশ ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল উদ্যত লাঠি হাতে। পেটাতে লাগল। কিন্তু সত্যাগ্রহীদের রেললাইন থেকে সরাতে পারলো না। সত্যাগ্রহীদের শ্লোগানে চারদিক মুখর হয়ে উঠল ‘মাতৃভাষা জিন্দাবাদ’, ‘জান দেবো,তবু জবান দেবো না’। এবারে আরও নৃশংস হয়ে উঠল কংগ্রেস সরকারের পুলিশ বাহিনী। সঙ্গীন উঁচু করে ধেয়ে এলো সত্যাগ্রহীদের দিকে। কিন্তু না,সত্যাগ্রহীরা লাইন আঁকড়ে ধরে পড়ে আছে। সঙ্গীনের খোঁচায় সত্যাগ্রহীদের শরীর রক্তাক্ত হয়ে উঠল। মুখে তাদের ‘মাতৃভাষা জিন্দাবাদ’। ট্রেন আটকাতে অসংখ্য মেয়েরা এসেছে। সত্যাগ্রহী ভাইদের সাথে ওরাও মাতৃভাষার যুদ্ধে শামিল। আর একটি পুলিশ বাহিনী এসে এবার মেয়েদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মাথায় তাদের রাইফেলের আঘাত পড়তে লাগল। জ্ঞান হারিয়ে দু’একজন লুটিয়ে পড়ল সেখানে বাকিদের রেললাইন থেকে যে কিছুতেই নড়ানো যাচ্ছে না। আঘাতে শরীর জর্জরিত তবু সরতে চায় না। কি ভয়ানক মনোবল ওদের। কংগ্রেস সরকারের পুলিশ এবার দুঃশাসনের ভূমিকায় নামলো। মেয়েদের সম্ভ্রম হরণের জন্য তান্ডব শুরু করল। শাড়ি টেনে টেনে খুললো, তারপর বুটের আঘাত, রাইফেলের বাঁটের ঘা,টেনেহিঁচড়ে ফেলে দিল রেললাইন থেকে দূরে। জ্ঞান হারিয়ে ওরা তখন বিবস্ত্রা। সঙ্গে সঙ্গে আর একদল সত্যাগ্রহী সে স্থান দখল করল।

সমস্ত দিন ওরা চেষ্টা করল ট্রেনের চাকা চালাতে কিন্তু প্রতিবারই সত্যাগ্রহীদের অটুট মনোবলের কাছে হেরে গিয়ে বর্বরোচিত অত্যাচার চালিয়েছে। আহত হয়েছে অসংখ্য সত্যাগ্রহী আবালবৃদ্ধবনিতা নির্বিশেষে। হাসপাতালের সিট ভর্তি হয়ে গেছে। আহতদের শেষ পর্যন্ত হাসপাতাল করিডোরে রাখার ব্যবস্থা করা হলো।
জেলেও জায়গাভাব। কত শত সত্যাগ্রহীকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে। শত শত সত্যাগ্রহী আবালবৃদ্ধবনিতা সত্যাগ্রহী। অনেক সত্যাগ্রহীকে বন্দী করে কয়েক মাইল দূরে পুলিশ ছেড়ে দিয়ে আসে। সংগ্রাম পরিষদের গাড়িও প্রস্তুত তৎক্ষণাৎ পেছন ছুটে সত্যাগ্রহীদের নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়। সে এক অভূতপূর্ব গণসত্যাগ্রহ, গণআন্দোলন। এর ইতিহাস বিরল। শিলচর-হাইলাকান্দি-পাথারকান্দি-বদরপুরে একই পাশবিক অত্যাচার,একই পদ্ধতির উৎপীড়ন। শাসক কংগ্রেস সরকারের পুলিশ বাহিনীর একই তান্ডবলীলা।

শিলচর। বেলা দু’টা বেজে দুপুর গড়িয়ে গেছে। নেতারা কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। মারাত্মক অঘটন বুঝি আর ঘটবে না। কংগ্রেস সরকারের সমস্ত বলপ্রয়োগ বিফলে গেছে। হরতাল সফল হতে চলেছে। পুলিশ মিলিটারি অত্যাচারের মাত্রা একটুখানি কমিয়ে দম নিচ্ছে। ‘মাতৃভাষা জিন্দাবাদ’ ধ্বনিতে রেলস্টেশন মুখর। হঠাৎ গুড়ুম্-গুড়ুম্-গুড়ুম্ আওয়াজে শিলচর রেলস্টেশন সচকিত হয়ে উঠল। ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুটে এলো নরপিশাচদের রাইফেল থেকে। রক্তস্নাত হলো শিলচর। একে একে লুটিয়ে পড়লো বীর সত্যাগ্রহীরা। রক্তের ফোয়ারায় শিলচর প্ল্যাটফর্ম লাল হয়ে উঠল। লাল হয়ে গেল কঠিন পাষাণ রেললাইন। রক্তের আর্তনাদ থেকে সত্যাগ্রহীদের মুখ দিয়ে বেরোল ‘মাতৃভাষা জিন্দাবাদ’। মাতৃভাষার ইজ্জত বাঁচাতে অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত সত্যাগ্রহীরা শহীদের মৃত্যুবরণ করে নিল। ১৯৬১ এর মাতৃভাষার সংগ্রাম এগারো জন শহীদের জন্ম দিল।”

মায়ের ভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ১৯ মে ১৯৬১ তে ১১ জন বাঙালি শহীদ হন,ভাষা শহীদরা হলেন: কমলা ভট্টাচার্য ১৬ -পৈত্রিক নিবাস সিলেট-বাংলাদেশ (পৃথিবীর প্রথম নারী ভাষা শহীদ), শচীন্দ্রমোহন পাল ১৯ -পৈত্রিক নিবাস হবিগঞ্জ-নবীগঞ্জ-চন্দনপুর-বাংলাদেশ, বীরেন্দ্র সূত্রধর ২৪ -পৈত্রিক নিবাস-হবিগঞ্জ-নবীগঞ্জ-বহরমপুর-বাংলাদেশ, কানাইলাল নিয়োগী ৩৭ -পৈত্রিক নিবাস ময়মনসিংহ-খিলদা-বাংলাদেশ, চন্ডিচরন সূত্রধর ২২ -পৈত্রিক নিবাস হবিগঞ্জ-জাকেরপুর-বাংলাদেশ, সত্যেন্দ্র কুমার দেব ২৪ -পৈত্রিক নিবাস বাংলাদেশ, হীতেশ বিশ্বাস -পৈত্রিক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়া-বাংলাদেশ, কুমুদরঞ্জন দাস -পৈত্রিক নিবাস মৌলভীবাজার-জুরি-বাংলাদেশ, তরণী দেবনাথ ২১ -পৈত্রিক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়া-বাংলাদেশ, সুনীল সরকার- পৈত্রিক নিবাস ঢাকা-মুন্সিবাজার-কামারপাড়া-বাংলাদেশ এবং সুকোমল পুরকায়স্থ -পৈত্রিক নিবাস-করিমগঞ্জ-বাগবাড়ি-আসাম-ভারত।

২০ মে তারিখে সান্ধ্য আইন উপেক্ষা করে নিহতদের মৃতদেহ নিয়ে মিছিল বের হলে তাতে জনতার ঢল নামে। আসাম সরকার এটি উপলব্ধি করেন যে,একটা ন্যায়সঙ্গত দাবিকে কেন্দ্র করে বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে ঐক্য ও উন্মাদনা তৈরি হয়েছে তা দমন করা সম্ভব নয়। সরকার বাঙালির প্রাণের দাবি মেনে নেন এবং বরাক উপত্যকায় বাংলা সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। শিলচরে নির্মিত শহীদ মিনারের নির্মাণ সামগ্রীর মধ্যে এই ১১ জন বীর বাঙালির যে দেহভস্ম মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল তা আজও জাতি হিসেবে বাঙালীর বীরত্বগাথা বহন করে চলেছে।

ছবিঃ গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com