শিখণ্ডী, ওরাও মানুষ …

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমি চিত্রঙ্গদা

একটি নবজাতক যখন জন্মায় তাকে আমরা ‘ফেরেশতা’ বা ‘দেব শিশু’ বলি। কিন্তু প্রকৃতির খেয়াল অন্যরকম কারো কারো ক্ষেত্রে। তাই কোন কোন ফেরেশতার মত শিশুটিকে কাটাতে হয় অভিশপ্ত জীবন —– তাদের কথাই বলব আমার এই লেখায়।আমার বয়স যখন সাড়ে চার বছর তখন আমার একটি ভাই হল। আমার মনে আছে তার কিছুদিনের মধ্যে একদিন সকালের দিকে হঠাৎ কয়েকজন মহিলা জোরে জোরে কথা বলতে বলতে আমাদের বাড়িতে ঢুকে পড়ে। ওরা কেমন অদ্ভুত কায়দায় হাত তালি দিয়ে আমার মা কে বলল “দে লো বু দে, তোর ছেলেটাকে লাচিয়ে দেই”। মানে আমার ভাইটিকে নাচাবে। ওদের সাজগোজ, ওদের অঙ্গ ভঙ্গী দেখে আমি খুব ভয় পেয়ে দৌড়ে গিয়ে মা’র  পিছনে লুকিয়ে লুকিয়ে ওদের দেখতে থাকি। মা তখন আমার ভাইটিকে ওদের কাছে দিলে আমি আরও ভয় পেয়ে যাই এই ভেবে যে, না জানি ওরা কি করে আমার ভাইটিকে নিয়ে, যদি নিয়ে চলে যায়? এদিকে ওরা তখন নেচে গেয়ে একেবারে মাতিয়ে তুলল। মনে আছে পাড়ার অনেকে আমাদের বাড়িতে এসে জড় হয়ে মজা দেখছিল। কিন্তু আমার মোটেও ভালো লাগছিল না ব্যাপারটা। ওরা কেমন যেন ছেলে ছেলে দেখতে। ছেলেদের মত কণ্ঠস্বর, অথচ পরনে শাড়ি। ভীষণ উৎকট সাজে সেজেছে ওরা। এমনটি কখনো দেখি নি।

একসময় ওদের নাচ গান শেষ হলে কিছু পরিমাণ চাল আর কিছু টাকা দিলে ওরা চলে যায়। পরে শুনেছিলাম, ওদের “হিজড়া” বলে। কারো বাড়িতে নতুন বাচ্চা হলে ওরা সেখানে গিয়ে এভাবেই নাচ গান করে। এটাই ওদের আয়ের উৎস। কিন্তু সেই সঙ্গে আরও একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ওরা সংগ্রহ করে সেটা এখন জানি।

সেই ছোট বেলায় এটুকু বুঝেছিলাম যে, ওরা আমাদের মত নয়। অন্যরকম মানুষ ওরা। বড় হবার পর বুঝেছি হিজড়া কারো কাছে আতঙ্কের, কারো কাছে ঠাট্টার, আবার কারো কাছে কৌতূহলের বিষয় বস্তু। সমাজে অপাংক্তেয়,  পরিত্যক্ত, বিচ্ছিন্ন এই স্রোতের সঙ্গে আমাদের বিশাল দূরত্বই তাদের সম্পর্কে আমাদের করে রেখেছে অজ্ঞ, আর তাদের করে রেখেছে অবজ্ঞার পাত্র। আমরা অনেকেই জানি না হিজড়া কেন হয়? কারা হয়? কেমন তাদের জীবনযাত্রা? এটুকু জানি তারা আর দশজনের মতো স্বাভাবিক জীবিকা নির্বাহ না করে দোকানে দোকানে ঘুরে, মানুষের বাড়িতে চড়াও হয়ে টাকা তোলে। জন্মদিন, গায়ে হলুদ, মুসলমানি ইত্যাদি শুভ অনুষ্ঠানে গিয়ে নাচ গান করে আয় করে। তবে এদের সম্বন্ধে জানার কৌতূহল ছিল আমার। কিন্তু উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এমন সময় আমার এক বন্ধু আমাকে বেশ কিছু তথ্য উপাত্ত দিল। যাতে আমি ওদের নিয়ে লিখতে পারি। কৃতজ্ঞতায় মন ভরে গেল বন্ধুটির উপর। তখন আমার নিজের ইচ্ছেটির কথা মনে পড়ে গেল। মনে মনে ঠিক করে ফেললাম এদের  নিয়ে কিছু বলব। তবে তার জন্য আমাকে আরও জানতে হবে। উপায় খুঁজতে শুরু করে দিলাম।

ইদানীং ঢাকার বিভিন্ন ট্রাফিক সিগন্যাল পয়েন্টে এদের খুব বেশী দেখা যাচ্ছে। আর দেখছি আমার ছেলের স্কুলের আশেপাশে। প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ এসে টাকা চায়। এদের ভঙ্গিগুলো বেশ আগ্রাসী। দিতেই হবে নয়ত বাজে কথা বলবে। কিছুদিন আগে আমি পান্থ পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম। সোনারগাঁ ট্রাফিক সিগন্যাল পয়েন্টে লাল সংকেত এ দাঁড়াতেই হল। অপেক্ষা করছি, এমন সময় যথারীতি সেখানে হকার, ভিক্ষুক আসতে শুরু করলো। একটি ছোট্ট ছেলে বেলুন নিয়ে এলো। আমার বেলুন কেনার কোন প্রয়োজন নেই, তাই ওকে যেতে বললাম।

ঠিক সেই সময় ওর পাশে একটি হিজড়া এসে দাঁড়ালো। আমার দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে খুব ভদ্রভাবে বলল, একটা বেলুন কিনতে, তাতে ঐ ছোট হকার ছেলেটির উপকার হবে। সে এটাও বলল যে, ওকে নাহয় আমি ভিক্ষা নাই দিলাম। ওর ব্যবহার আমাকে অবাক করলো। ও অন্যদের চাইতে অনেক আলাদা। সাজটাও যথেষ্ট মার্জিত। শোভন সালওয়ার কামিজ, ওড়না পরনে। আমি ওর কথায় বেলুন কিনলাম দেখে ও খুশী হয়ে আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেল। পুরো ঘটনাটা আমার বেশ ভালো লেগেছিল। তখন আরও একবার ওদের সম্বন্ধে জানার প্রবল ইচ্ছে হয়েছিল। এখন যখন আমার বন্ধুটি আমাকে ওদের সম্বন্ধে তথ্য দিল, তখন ঠিক করে ফেললাম ঐ মেয়েটির সঙ্গেই আমি কথা বলবো, জানি না রাজি হবে কি না। এখানে একটু বলে রাখি, আমি নিজে ওদের হিজড়া বলতে পছন্দ করি না। তাই আমি মেয়ে বললাম।

যাহোক, পর পর কয়েকদিন ঐ রুটে যাওয়া আসা করলাম, যদি ওর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। একদিন পেয়ে গেলাম। ডেকে নিয়ে আমার ইচ্ছের কথা জানাতে ও খুবই অবাক হয়ে বলল, ‘আপা আমাদের কথা যেনে কি করবেন? আমরা তো হিজড়া। আমরা তো মানুষ না আপা। শিক্ষিত মানুষরা তো আমাদের ঘিন্না করে, কত আজে বাজে নোংরা কথা বলে”। আমি বললাম, আমি ওদের নিয়ে গল্প লিখব। মানুষকে জানাবো ওদের কথা। সে কথা শুনে খুশী হয়ে বলল, “ও আপনি বই লেখেন? আমাকে তাহলে একটা সই দিতে হবে কিন্তু”। আমি হেঁসে ফেললাম ওর সই চাওয়া দেখে। ও রাজি হয়ে গেল কথা বলতে। আমি ওকে আশ্বস্ত করলাম যে, ওর একদিনে যতটা আয় হয়, আমি দিয়ে দেব। তারপর ঠিক করলাম পরের শুক্রবার বিকেলে ওকে নিয়ে বসবো কন নিরিবিলি জায়গায়।

সময়মত আমি গিয়ে দেখি ও আগে থেকেই বসে আছে। আজও বেশ মার্জিত সাজ পোশাকে এসেছে। আমরা কথা শুরু করলাম। ওর নাম, মরিয়ম। ওর কাছ থেকে যা শুনলাম, এবার সেকথায়

আসি…………

মরিয়মের জন্ম হয়েছিল একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে আর দশটি সাধারণ শিশুর মতোই। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে ও ছিল ৩ নম্বর সন্তান। ও স্বাভাবিকভাবেই বড় হতে থাকে ভাইবোনের সঙ্গে। স্কুলে যায়। তবে ওর প্রবণতা ছিল মেয়েদের পাশে বসবার, মেয়েদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবার। সেটাও কেউ খুব একটা আমলে নেয় নি। ছোটবেলায় ওর শারীরিক ত্রুটি কারো নজরে ধরা পড়ে নি। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন বড় হতে থাকে, তখন ক্রমশই স্পষ্ট হতে থাকে সেই অভিশপ্ত ত্রুটি। বাড়িতে ওকে নিয়ে সবার দুশ্চিন্তা শুরু হয়। দিন রাত মা কাঁদে। বাবা হতাশায় কখনো চুপ করে থাকে, কখনোবা রাগারাগি করে তুচ্ছ কারণে। ভাইবোনরা ধীরে ধীরে ওর কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। ওকে নিয়ে মাঝে মাঝে নির্মম উপহাসও করে বসে। মরিয়ম চেষ্টা করে ওদের সঙ্গে মানিয়ে চলতে। কিন্তু মা’র চোখে পানি দেখলে ওর খারাপ লাগে। তখন ও ওর মার সঙ্গে কাঁদে মেয়েলী কায়দায়। এভাবেই আপনজনদের পাল্টে যাওয়া আচরণ, অবহেলা, অবজ্ঞা আর ওর দেহের পরিবর্তন ওর জীবনকে দুঃসহ করে তোলে। স্কুলে ওর সহপাঠীরা, আর স্কুলের দুষ্টু ছেলেরা ওর জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। ওকে হিজড়া বলে ক্ষ্যাপায়। ও মা বাবার কাছে কান্না কাটি করে বলে যে ও আর স্কুলে যেতে চায় না।

মাঝে মাঝে ওর মা’র উপরেও অভিমান হতো। মা’ একদিন কারো উপর রেগে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল যে, সে কি পাপ করেছে যে, তার গর্ভে এমন জিনিষ পয়দা হলো? সেই দিন থেকে মরিয়ম আর মা’র সঙ্গে কাঁদে না। মা’কে এড়িয়ে চলে। অনেক কষ্ট পায় ও যে, মা ভাবছে মা’র কোন পাপের জন্য আল্লাহ্‌ ওকে এমন করে পাঠিয়েছে! এমন চিন্তা ওর কষ্ট বাড়িয়ে দেয় অনেকগুণ।

এদিকে ওই অঞ্চলের হিজড়া সমাজের কাছে এই খবর পৌঁছে যায়। তাদের দুর্ভাগ্যের  আগামী সাথী হিসেবে আরেকটা দুর্ভাগা প্রাণীকে তারা নিজেদের করে নিতে এগিয়ে আসে। এরা উৎফুল্ল হয় আরেকজন সঙ্গী বাড়ছে বলে। ওরা তখন ওকে বোঝাতে থাকে যে ওর নিজের বাড়িতে, নিজের পরিবেশে, সমাজে ওর জায়গা নেই। এখানে ও হাসির পাত্র। মা বাবা ছাড়া আর কেউ ভালও বাসে না ওকে। ও তো তাদের জন্য ও একটা বোঝা। মরিয়ম এদের সংস্পর্শে এসে বুঝতে পারে এরা ওরই মত মানুষ। যারা ওকে বুঝবে, কষ্ট দেবে না। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবে না। ও বুঝতে পারে এদের কাছে চলে যাওয়াই ওর জন্য, আর ওর পরিবারের জন্য সব দিক থেকে ভালো হবে। এসব না না চিন্তা ওর মাথায় ঢুকে যায়। আর তার ফলে ধীরে ধীরে আলগা হতে থাকে পারিবারিক বন্ধন। রক্তের বন্ধন। আর ক্রমেই মরিয়া হয়ে মরিয়ম একদিন সত্যি সত্যি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় পরিবার থেকে… মরিয়ম চলে যায় হিজড়া পল্লীতে।

পল্লী মানে সেই বস্তি, যেখানে গোষ্ঠীবদ্ধ ভাবে বাস করে হিজড়ারা। মরিয়ম বলল, এটা ওদের নিজস্ব সমাজ, এখানে আছে ওদের নিজস্ব নিয়ম, নিজস্ব শাসন পদ্ধতি, সবই ভিন্ন ধরনের। প্রতিটি হিজড়া বাড়ির তত্ত্বাবধানে থাকে একজন গুরু মা। এখানেই হিজড়াদের শেখানো হয় নাচ, গান এবং দু হাত দিয়ে কিভাবে অদ্ভুত কায়দায় তালির আওয়াজ সৃষ্টি করা যায়। অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি এবং ভয় ভীতি দেখিয়ে কিভাবে লোকজনের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে হয় তার প্রশিক্ষণও দেয়া হয় এখানে। আর এভাবেই তৈরি করা হয় হিজড়াদের অস্বাভাবিক জীবন পথের প্রতিকূলতায় অস্বাভাবিক ভাবে বেঁচে থাকার কৌশল।

মরিয়মের কাছ থেকেই শুনলাম, কোথাও নতুন কোন হিজড়া সন্তান জন্ম নিলে ওরা জোট বেধে সেখানে যায় বাচ্চাটিকে তুলে আনতে। এমন শিশু জন্ম দেয়া পরিবারটির যদি আর্থিক সঙ্গতি না থাকে তবে বাবা মায়েরা সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কথা ভেবে শিশুটিকে হিজড়া সমাজের কাছে দিয়ে দেয়াই শ্রেয় মনে করে। আর যদি না দিতে চায় তবে মোটা অঙ্কের বখশিশ দিয়ে তবেই হিজড়াদের বিদায় করা যায়। এখন জানি ওরা বাচ্চা নাচানোর সঙ্গে সঙ্গে এটাও দেখতে আসে যে বাচ্চাটি হিজড়া কিনা?

যাহোক, আমি এখানে এই অল্প পরিসরে শিখণ্ডীদের বায়োলজিক্যাল ডিসকাশন করছি না। আমি শুধু এইটুকু বলার চেষ্টা করছি যে, এরা যে শিখণ্ডী এটা তো ওদের দোষে নয়। জন্মগত ভাবে হিজড়া হবার মূল কারণ, জেনেটিক প্যাটার্নের অসম বিন্যাস। এদেরকে সাধারণভাবে ‘উভলিঙ্গ’ বোঝান হয়েছে। মানুষের জন্ম দোষ কখনোই নিজের হয় না। আর হিজড়ারা নিজেরা বংশবৃদ্ধি করতেও পারে না। এ অপরাধ তাদের নয়। স্বাভাবিক পরিবারের মধ্যেই অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবে তাদের জন্ম হয়। তবু প্রকৃতির খেয়ালের কারণে অস্বাভাবিক লিঙ্গ বৈকল্যে নিয়ে একটি অভিশপ্ত জীবনের অপরাধ সম্পূর্ণ বিনাদোষে তাদের ঘাড়ে চেপে বসে। প্রকৃতির বিচিত্র খেয়ালে একটা মেয়ে যদি ছেলে হয়ে যায়, কিংবা একটা ছেলে ঘটনাক্রমে মেয়ে হয়ে গেলেও এরকম পরিণতি কখনোই নামে না তাদের জীবনে, যা একজন হিজড়ার জীবনে অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেয়া হয়। খুব অমানবিক ভাবে যৌনতার অধিকার, পরিবারে সম্মানের সঙ্গে বসবাসের অধিকার, চাকরির অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার, ইত্যাদি মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে যায় এমন হাজারো মরিয়ম। অসহায় পরিবার ওদের রাখতে পারে না। অবিবেচক, নিষ্ঠুর সমাজে এরা হাসির খোরাক বলে এরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় নির্মম ভাবে। সমাজ এদের কোন মানবিক অধিকার, সম্মান দেয় না। যদিও ২০১৩ সালে বর্তমান বাংলাদেশ সরকার হিজড়াদের লিঙ্গ-পরিচয়কে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়, যদিও এটা করা উচিত ছিল অনেক আগেই। কিন্তু ওইটুকুই। সরকার আজও সম্মানজনক ভাবে বাঁচার, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দীক্ষার, অর্থ উপারজনের কোন ব্যবস্থা করেনি। এই তো ক’দিন আগে টিভি তে একটি প্রতিবেদন প্রচার হল। সরকার আর সমাজের বড় বড় মাথারা কতকিছু করার কথা বলল, কিন্তু বাস্তবে আসলে কিছুই হয় নি এতকাল। এখনও ওদের কেউই এগিয়ে আসে নি কোন যুগান্তকারী উদাহরণ সৃষ্টি করতে। শুধু কথার পর কথা। এ প্রকল্প সে প্রকল্পও।

আমিও তার বাইরে নই। আজ এখানে এসব লিখে আমি কি ওদের জীবন পাল্টে দিচ্ছি? না, তা আমি একা পারবো না। তাছাড়া ওরা সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করে, তাই কোন একজন কে আমরা ওই সমাজ থেকে বের করে আনতে পারব না। আমাদের যা কিছু করার, তা করতে হবে হিজড়া গোষ্ঠীর জন্য।

একবার ভাবুন এই না-পুরুষ না-স্ত্রী স্বত্বাটি আপনার আমার মতোই সবক’টি নির্দোষ দৈহিক উপাদান নিয়েই কোন না কোন পারিবারিক আবহে জন্মেছিলো একদিন। মানবিক বোধেও কোন কমতি ছিল না। কিন্তু প্রকৃতি তাকে দিয়েছে ভয়াবহ বঞ্চনা, যা আপনার, আমার যে কারো ক্ষেত্রেই হতে পারতো! আর কোন অপরাধ না করেও ভাগ্য-বিড়ম্বিত সে কি আপনার আমার একটু সহানুভূতি থেকেও বঞ্চিত হবে ? অভিশপ্ত নিয়তি তো এদের ফেরার পথটাও বন্ধ করে দেয় চিরতরে। কারণ অভ্যস্ত সমাজের বাইরে তার একটাই পরিচয় হয়ে যায় তখন, ওরা – হিজড়া ! তাই আমরা যদি চাই তাহলে আমাদের পরিবারে আজ থেকে ভবিষ্যতে যে শিশুটি এই শারীরিক বৈকল্য নিয়ে জন্মাবে তাকে আমাদের অন্য সন্তানদের মতই আদরে, মায়া মমতায়, ভালবেসে, মানুষের পূর্ণ মর্যাদা দিয়ে নিজের কাছে রাখতে পারি। পারি না বলুন?

মরিয়ম যাবার আগে আমি ওর সঙ্গে হাত মেলালাম, আসলে হাতটি ধরলাম। ও কেমন বিষণ্ণ হাসি হেসে বলল, “আপনার ঘিন্না করছে না আপা?” আমি আমার চোখ লুকাতে ওর হাতটি ছেড়ে দিয়ে বললাম, আসি, ভালো থেক বলে শিঘ্রই বেরিয়ে যেতে চাইলাম… আসলে, আসলে আমি পালালাম…

আমার বন্ধুটি আমাকে যে সব তথ্য দিয়েছিল সে সবের সঙ্গে মরিয়মের দেয়া তথ্য মিলে গেল। শেসে আপনাদের বলি, আমরা তো মানুষ, আসুন না চেষ্টা করি আরও ভালো মানুষ হতে, মানুষকে ভালোবাসতে। আর যারা মানুষ হয়েও হতভাগা, আসুন তাদের জন্য কিছু করি।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com