শিকড়ের সন্ধানে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিবব্রত দেচৌধুরী

(নিউইয়র্ক থেকে): “বাবা আমি ডিজনীল্যান্ড  যাবনা , বাংলাদেশে যাবো! শ্রাবণী ওরা তো আর কিছুদিনের মাঝেই ইমিগ্র্যান্ট হয়ে চলে আসবে , ওরা এখানে চলে এলেতো আমাদের আর দেশে যাওয়া হবেনা বাবা!” আমি বললাম , “দেশে এখন প্রচন্ড গরম, তার উপর মশা মাছির উপদ্রব , তোর সহ্য হবেনারে মা।” ও বললো , ” তুমি দেখে নিও বাবা, আমার কিচ্ছু হবেনা!”

আমার দশ বছরের মেয়ে অন্তরার বায়না শুনে সেদিন সত্যি বিস্মিত হয়েছিলাম এই ভেবে -যে  মেয়েটি জন্মের পরে কখনো বাংলাদেশে যায়নি, ও ডিজনীল্যান্ড না গিয়ে বাংলাদেশ যেতে চাইছে?!

অন্তরা, আবীর ওরা যখন অনেক ছোট তখন থেকেই আমি ওদেরে আমার ছেলে বেলার গল্প শোনাতাম। আমার সবুজ শ্যামল দেশের কথা শোনাতাম। ” জানিস , আমাদের একটা পোষা ময়না ছিল ,সোনালি-হলুদ ঝুমকো পরা কালো ময়নাটা বেশ কথা বলতে পারতো, গান গাইতো , মাঝে মাঝে যেনো শাসন করে আমাকে বলতো ,” বাবলু পড়াত বও ( পড়তে বসো ) “। জিমী আর ডেঈজী নামের আমাদের দুটো কুকুর ছিলো । জিমীর গায়ের রঙ তামাটে লাল আর ডেঈজীর গায়ের রঙ ছিলো সাদা। আমার সঙ্গে ওদের খুব ভাবছিল। আমি যখন স্কুল শেষে বাসায় ফিরতাম , দূর থেকে দেখতে পেলে ওরা দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরতো! ….

কাজিনের সঙ্গে

এরকম কতো শত গল্প আমি সুযোগ পেলেই  অন্তরা/আবীরকে শোনাতাম । ওরা ও আমার পাশে বসে তন্ময় হয়ে শুনতো। আর সেই থেকেই আমার জন্মভূমির প্রতি ওদের ও অনেক টান আর তাই ডিজনীল্যান্ডের চেয়েও বাংলাদেশই ওদের কাছে অনেক অনেক বেশী আকর্ষনীয় ।

সাত পাঁচ ভেবে ভেবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম , অন্তরাকে দুসপ্তাহের জন্য ওর মা’র সঙ্গে দেশে পাঠিয়ে দেব। দেশে গিয়ে যাতে ও অসুস্থ না হয় সে নিয়ে আমার কী দু:শ্চিন্তা! Mosquito Repellent lotion, Water purifying tablet, Gatorade, instant breakfast/ snacks ওসব দিয়েই বিরাট এক স্যুটকেস । অন্তরার পাসপোর্ট ছিলনা, একদিনেই পাসপোর্ট তৈরী করিয়ে তাতে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে – নো ভিসা রিকোয়ার্ড সিল লাগিয়ে নিয়ে এলাম।

চা বাগানে

নীল রঙের পাসপোর্ট আর এয়ার ticket টা হাতে পেয়ে অন্তরা যে কী খুশি , চোখে মুখে ওর উজ্বল হাসি দেখে আমি খুব বোঝতে পারছিলাম। দুহাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো , “থ্যাঙ্ক ইউ বাবা! “

দেশে যাবার দিন জে এফ কে এয়ার পোর্টে অন্তরা আর ওর মাকে সি ওফ করতে আমি, আমার ছেলে আবীর আর দিদি গিয়েছিলাম। আবীরের পড়ার চাপ থাকায় সে যাত্রায় ওদের সঙ্গে ও দেশে  যেতে পারেনি  , তাই মন খারাপের কালো মেঘ ওর চেহারায় বেশ স্পষ্ট । ওদিকে ব্যাকপ্যাক কাঁধে নিয়ে মায়ের আগে আগে একরাশ বিস্ময় আর হাসি হাসি মুখে যাত্রীদের লাইনে দাঁড়িয়ে অন্তরা , যেনো সে বিশ্ব জয় করতে যাচ্ছে! ওদেরে প্লেনে উঠিয়ে দিয়ে দিদিকে ওর বাসায় নামিয়ে দিয়ে আমরা বাপ বেটা চলে এলাম ঘরে । ওরা চলে যাওয়াতে ঘরটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। অজানা উৎকন্ঠায় সে রাতে আমার ভালো ঘুম হয়নি , পরদিন দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল শেষে  সন্ধ্যার দিকে ফোন এলো , আমি হ্যালো বলতেই ওপার থেকে অন্তরা বললো,”বাবা আমারা ঢাকা পৌঁছে গেছি, ফুলমামার সঙ্গে মাইক্রো বাসে করে একটু পরেই সিলেট রওয়ানা হবো , তুমি কোনো চিন্তা করোনা বাবা , আমরা ভালো আছি but miss you and bhai a lot! “

ফোন রাখার আগে আমি আবারো পূর্নিমাকে সতর্ক করে দিয়ে বললাম , দেখো মিনারেল ওয়াটার সব সময় সাথে রেখো, অন্তরা যেনো কখনোই রাস্তা ঘাটের জল না খায় আর গাড়ির জানালা খোলা রেখোনা , ধুলো বালিতে ও অসুস্থ হয়ে যাবে। পূর্নিমা আমাকে শান্তনা দিয়ে বললো , “তুমি একদম টেনশন করোনা। “

পরদিন সকালে আমি আবার কল করলাম ,  অন্তরা তখন শ্রাবনীর সঙ্গে বাড়ীর উঠোনে খেলছিল, আমি ফোন করেছি জেনে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে ফোন ধরলো , বললো “বাবা বাংলাদেশ ভীষণ সুন্দর , কাল আসার পথে গাড়ি থামিয়ে আমি সোনালী ধানের ক্ষেত দেখেছি ! এখানকার সবাই খুব ভালো , আমি এখানে থেকে যেতে চাই বাবা, প্লিজ তোমরা ও চলে এসো! আজ সকালে বেশ বৃষ্টি হয়েছিল, টেম্পারেচার নিউইয়র্কের চেয়ে অনেক ভালো। এখানে একদম mosquito নেই । তুমি আমার জন্য একদম চিন্তা করোনা । একটু পরেই বড়দা আর চম্পক দাদার সঙ্গে বাইরে বেড়াতে যাব , আর দুদিন পর তোমার ছোটবেলার যায়গা Clevedon Tea garden এ বেড়াতে যাবো আমরা সবাই মিলে । তোমরা ভালো থেকো বাবা, I love you! “

মায়ের সঙ্গে

এক নি:শ্বাসে কথা গুলো বলে অন্তরা আবার ওর সাথীদের সঙ্গে খেলতে চলে গেলো। বুঝলাম মেয়ে আমার মহানন্দেই আছে।

দুসপ্তাহের ভ্যাকেশন ,আসতে যেতেই পথে চারদিন চলে যায়, মনে মনে ভাবলাম ওদেরে আরেকটু বেশী সময় দিয়ে পাঠালেই বোধ হয় ভালো হতো । কিন্তু না , তা যে হবেনা, বঙ্গ সম্মেলনে হিউস্টন যাবার প্ল্যান যে আগে থেকেই করা । তাই পূর্ব নির্ধারিত তারিখেই ওরা দেশ থেকে ফিরতে হবে। ওদিকে ওদের হাতে গোনা দিন গুলিও যেনো তরতর করে ফুরিয়ে যাচ্ছিল।

রাতে ডিনার শেষে লিভিংরুমে বসে টিভি দেখছিলাম হঠাৎ দেশ থেকে ফোন এলো , অন্তরার ফোন – , মৃদুভাষী মেয়ে আমার তখন উচ্চস্বরে বলছিল, বাবা এখন আমরা Clevedon এ তোমার বাসায় । ম্যানেজার আংকেল খুব ভালো লোক , আমাদের পরিচয় দিতেই উনি বাসার প্রতিটি রুম ঘুরে ঘুরে দেখালেন , আমাকে বললেন ওখানে থেকে যেতে । জানো বাবা, বাসার সামনে তোমার লাগানো যূঁই ফুলের গাছটা এখনো আছে । অনেক ছবি তুলেছি , তোমার জন্য একটা যূঁই ফুল ও নিয়েছি সঙ্গে করে । তুমি আর ভাই সাথে থাকলে আরো বেশি মজা হতো। মিস ইউ বাবা , বাই !

টি ফ্যাক্টোরি আর গার্ডেন দেখে সিলেট ফিরতে প্রায় সারাটা দিন চলে গেলো। ফেরার পথে পূর্নিমা লক্ষ্য করল ওর পাশের সিটে বসে অন্তরা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে , কী হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই অন্তরা ওর হাতের  ফুলটা দেখিয়ে বললো , ” বাবার জন্য নিয়েছিলাম ফুলটা, দেখো কেমন শুঁকিয়ে গেছে! ” পূর্নিমা তখন ওকে সান্তনা দিয়ে বল্লো , “তোমার বাবা আর ভাই কে সঙ্গে নিয়ে আমরা আবার আসবো এখানে । ” ফোন টা অন্তরার হাতে দিয়ে বললো , “নাও, তোমার বাবার সঙ্গে একটু কথা বলে নাও । ” ফোনটা হাতে নিয়ে অন্তরা যেনো কথা বলতে পারছিলনা, কান্নায় ওর গলা ধরে আসছিল , আমি উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলাম , কী হয়েছেরে মা?!  অন্তরা ওপার থেকে বল্লো , “বাবা আমি বাংলাদেশে থেকে যেতে চাই , তোমরাও  চলে এসো প্লিজ, আমরা সবাই মিলে এখানে থাকবো!”

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com