শহর এক আশ্চর্য্য প্রেমিকার নাম…. পর্ব নয়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আহমেদুর রশীদ টুটুল

জলে ভাসা সাবানের কথা শুনেছি অনেক, কখনো পরীক্ষা করে দেখিনি। তবে জলে ভাসা শহরসম জাহাজে চড়ার যত্‌কিঞ্চিত অভিজ্ঞতা অনেক অনেক বছর আগে ব্ল্যাকে টিকেট কেটে মধুমিতা হলে কেট উইলিন্সন আর লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও অভিনিত টাইটানিক সিনেমার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। সিনেমার বাইরে শহরের মতো জাহাজের গল্প ভাসাভাসা শুনেছি অনেক, সিনেমাতেও দেখেছি কিছু। তবে তাতে চড়তে কায়রো-মাচুপিচু-ইস্তাম্বুল-অজন্তা দেখার জন্য যে আকুলতা সে রকম কোনো আকাঙ্ক্ষা কখনোই মনে জাগেনি।

সামার মানে এখানে এক বিরাট উত্‌সব। একমাসের সামারের ছুটিতে সবাই ঘুরাঘুরিতে ব্যাস্ত হয়ে পরে। এখানকার লোকজন আসলে এই সময়টায় যত পারে গায়ে রোদ লাগিয়ে নেয়। সামারের রোদের ভিটামিন ডি এর স্টক দিয়ে এরা ঠাণ্ডার সময়গুলো পার করে। সে সময় অবশ্য মাছ আর কর্ডলিভার ওয়েল ব্যাকআপ ভিটামিন ডি হিসাবে খাবারের তালিকায় থাকে। ডি ভিটামিন যে কত প্রয়োজনীয় আর গুরুত্বপূর্ণ একটা উপাদান সেটা এই ঠাণ্ডার দেশে না আসলে বুঝতামনা। সামারে এসব দেশের নারী-পুরুষ যে ভাবে প্রায় নগ্ন বা কোথাও কোথাও পুরা নগ্ন হয়ে রোদ পোহায় সবই ওই এতটুকু ডি ভিটামিনের জন্য।

সামারের ছুটি এখানে সবারই থাকে। মানুষজন ছয়মাস আগে থেকেই প্ল্যান প্রোগ্রাম মায় টিকিট-হোটেলবুকিং করে রাখে। আমরা আমাদের বাধ্যতামূলক ভাষা শেখার ক্লাস থেকে ছুটি পেয়ে ভাবছিলাম ছুটির মাসটা কিভাবে কাটাবো। কারণ ছুটি পেলেও প্ল্যান-প্রোগ্রাম করার মতো যে আনুসাঙ্গিক ব্যাপার স্যাপার আছে সে সব এখনও আমাদের জোটেনি। রুনার এক বোনের বান্ধবী থাকেন ওসলো। এখানে আসার মাস ছয়েক পর উনার সন্ধান পেয়েছি আমরা। তারপর থেকে তার কাছ থেকে এক রকম বড়বোনের স্নেহ-আতিথিয়েয়তায় সিক্ত হচ্ছি আমরা। তো সেই দিদি একদিন রুনাকে ফোন করে বললেন, তোমাদের তো বন্ধ অমুক তারিখে চলে আসো ওসলো। নিমন্ত্রণ পেয়ে আমরাতো দে দৌড়। যাওয়ার পর দিদি বললেন, সারপ্রাইজ আছে তোমাদের জন্য। তার আগে কাল ওসলোতে আরো কিছু ঘুরাঘুরি করে নিবো। আমাদের আগ্রহের অবসান ঘটিয়ে দিদি জানালেন সারপ্রাইজ হলো, আমরা দশতলা এক জাহাজে করে ২৪ ঘন্টার জন্য উত্তর সমুদ্রে ভেসে বেড়াবো।

জাহাজ ওসলো থেকে ডেনমার্কের একটা শহর পর্যন্ত যাবে, দুইঘন্টা বিরতি নিয়ে আবার ফিরে আসবে। নির্ধারিত দিনে সময় মতো গিয়ে হাজির হলাম জাহাজের টার্মিনালে। একটা জাহাজ কোম্পানীর জন্য একটা টার্মিনাল, বিশাল বিরাট। ফরমালিটিজ শেষ করে জাহাজে উঠেতো বিস্ময়ে পুরাই থ’। এলাহি কাণ্ড। কী নেই এই জাহাজে। নিচে দুইতলা জুড়ে গাড়ি পার্কিং এর জায়গা। তারপর অনেকগুলো রেস্টুরেন্ট, বার, ক্যাসিনো, বিশাল ডেক, ডিসকো থেকে ছোটখাট অডিটোরিয়াম, বাচ্চাদের খেলার জায়গা আর ডিউটি ফ্রিশপ। এবং প্রত্যেক অতিথির জন্য এটাচড বাথরুম সহ কেবিন। জাহাজ ছাড়ার পরে দশতলার উপর থেকে ওসলো শহরকে কিযে অসাধারণ লাগছিলো, তার বর্ণনা দেয়া আসলেই মুশকিলের ব্যাপার।আয়োজনের ব্যাপার স্যাপার দেখে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে কতনা হৈ-হুল্লোর, হুলুস্থুল হতে পারে। কিন্তু সেরকম কিছুই চোখে পরলো না। মানুষজন সমুদ্র দেখছিলো, পান করছিলো, গান শুনছিলো, ক্যাসিনোতে বসেছিলো, বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করছিলো-খেলছিলো; সবই হচ্ছিলো শান্তিপূর্ণ শৃঙ্খলার মধ্যদিয়ে।

এখানকার এই জাহাজগুলো বছরের ৩৬৫দিনই নির্ধারিত রুটে আসা যাওয়া করে। একদিকে এরা ফেরি পারাপারের কাজ করে আর সঙ্গে প্রমোদভ্রমন। তবে আরো কিছু জাহাজ সার্ভিস আছে যেগুলো আসলেই এক্সস্লুসিভলি প্রমোদ তরী। সে সব জাহাজে খেলার মাঠ, সুইমিংপুল সবই থাকে। প্রত্যেকটা কেবিনের সঙ্গে সমুদ্র দেখার ডেক বারান্দা থাকে। ওই সব জাহাজের কোনো কোনোটা সপ্তাহ এমন কি মাসজুড়েও প্যাকেজ ভ্রমনের আয়োজন করে থাকে। আমরা সমুদ্রে ভাসার নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে জাহাজ ভ্রমণ উপভোগ করেছি। গভীর সমুদ্রে সামান্য ঢেউয়ের দোলায় গা গুলিয়ে উঠছিলো আমাদের। যারা দিনের পরদিন উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দেয় তাদের কি অবস্থা হয় সহজেই এতে অনুমান করা যায়।

এই সমুদ্র ভ্রমনের কিছুদিনের মধ্যেই আমরা আরেকটা জাহাজ ভ্রমনের সুযোগ পেয়ে যাই।এই আমন্ত্রণটা ছিলো আমার ভাতিজার পক্ষ থেকে।সেটা ছিলো স্টকহোম থেকে ফিনল্যান্ডের একটা শহরে যাওয়া আসা।সবকিছু আগেরটার মতোই। তবে এবারের জাহাজটা ছিলো আরো বড়, বারো তলা উঁচু। আড়াই হাজার মানুষ এক সঙ্গে এই জাহাজে চড়তে পারে। দিনের বেলা অপার সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ দেখলাম একটা হেলিকপ্টার এসে জাহাজের ছাদে ল্যান্ড করলো। শহর না তবে শহরের মতো এই চব্বিশ ঘন্টার অভিজ্ঞতাগুলো জীবনের পকেটে জমা হওয়া শহরের মতোই মনে হয়েছে আমরা।

ছবিঃ লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com