লোহিত সাগরের তীরে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ডা. এম আল মামুন

(হাকিল, তাবুক, সৌদি আরব থেকে): সময় কত দ্রুত চলে যায়। এই তো সেদিন ফাগুনের এক মায়াবী বিকেলে আমিও ছিলাম একুশে বইমেলার ইট বিছানো রাস্তায়। আরব দেশের এই মরুভূমিতে ফিরেছি তাও দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে উড়ে যেতে হবে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীতে। উদ্দেশ্য, একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণাপত্র উপস্থাপন। হাতে এক মাস সময়ও নেই। অথচ বিমানের টিকিট করা হয় নি এখনও, ইস্ট এবং ওয়েস্ট কোস্টের কোন্ কোন্ জায়গায় ঘুরবো সেই পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয় নি। যুক্তরাষ্ট্রে আমার যেসব বন্ধু-সুহৃদগণ থাকেন, তাঁদের সঙ্গে এখনও পুরোপুরি যোগাযোগ স্থাপন করতে পারি নি। মাঝে মাঝে মনে হয়, বড্ড অপরিকল্পিত এই জীবন, কোনও কিছুই সময়মত গুছিয়ে উঠতে পারি না।

রোদেলা এই মরু-সকালে দাঁড়িয়ে আছি এক উপসাগরের তীরে। এটি লোহিত সাগরেরই একটি অংশ যা উত্তরপ্রান্তে এসে ক্রমশঃ সরু হয়ে উপসাগরে পরিণত হয়েছে। এটি সেই জায়গা, যেখানে মিশর, জর্ডান, ইসরাইল আর সৌদি আরব এই চারটি দেশ এসে একসঙ্গে মিশেছে। উপসাগরের উল্টোতীরে মিশরপ্রান্তে মেটেরঙা পাহাড়ের চূড়ায় সকালের রোদ ঝিলমিল করছে। আমি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখছি সেই লালচে আভার প্রতিফলন। মরুভূমির বালুরাশিতে উপচে পড়া উপসাগরের স্বচ্ছ নীল আর সবুজ জলের মিশ্রণে দ্রবীভূত হয়ে যাচ্ছে আমার হৃদয়, আমার মন। জর্ডানপ্রান্ত থেকে বয়ে আসা এলেবেলে বাতাস আমাকেও করে দিচ্ছে ‘আউলা বাউলা’….।

শহরটির নাম হাকিল। এটি তাবুক প্রদেশের একটি জেলা শহর। তাবুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে আমিসহ আরেকজন ভিনদেশী জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এখানে এসেছি দু’দিনের সরকারী অ্যাসাইনমেন্টে। মার্স করোনা রোগের মত ভয়াবহ সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় এখানকার প্রধান হাসপাতালটি কতটুকু প্রস্তুতি নিতে পেরেছে সেটির মূল্যায়ন করাই হবে আমাদের কাজ। শহরের একপ্রান্তে লোহিত সাগরের তীরঘেষা একটি জায়গায় হাসপাতালটির অবস্থান। প্রতিটি ওয়ার্ডের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই চোখে পড়ে লোহিত সাগরের অপরূপ দৃশ্য। যেন রোগীদের জন্য এটি কোনও চিকিৎসালয় নয়, বরং একটি চমৎকার গোছানো অবকাশ যাপন কেন্দ্র। আহা! আমার নিজের দেশে কি কখনও এরকম কোনও সরকারী হাসপাতাল হওয়া সম্ভব?

হয়তোবা কখনও কখনও সমুদ্রের কাছে এলে মানুষের মন এলোমেলো হয়ে যায়। বিক্ষিপ্ত মনের অতলে তখন কতশত ভাবনা যে উঁকি দেয়। সমুদ্রের ঢেউ দেখে কেউ হয় রোমান্টিক, কেউ হয় নস্টালজিক, কেউ হয় কাব্যিক, কেউবা হয় আনন্দে আত্নহারা। সাগরতীরে এসে কেউ থাকে মধুচন্দিমা মুডে, কেউ থাকে অবকাশ-যাপন মুডে, আবার কেউবা স্মৃতির গহীনে হাতড়ে বেড়ায় পেছনে ফেলে আসা কাছের মানুষদের। আর এই আমি, এয়ারফোন কানে গুঁজে সেলফোনের পর্দায় হাতড়ে বেড়াচ্ছি শাহনাজ রহমত উল্লাহর গাওয়া সেই পুরোনো গান….

“সাগরের সৈকতে…. কে যেন দূর হতে…..
আমারে ডেকে ডেকে যায়…. আয় আয় আয়….
পারি না তবু যেতে…. শিকল বাঁধা এ দুটি পায়….।”

মানুষের এক জীবনের পুরোটাই তো নিয়তির অমোঘ শেকলে বাঁধা। এই বাঁধন ছিন্ন করে কেউ কেউ বেরিয়ে আসতে পারে, আবার কেউ পারে না….।

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com