লিখে পাওয়া টাকা…

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কেউ পেয়েছিলেন পনেরো টাকা, কেউ কুড়ি টাকা।কারো হাতে এসেছিলো হতবাক করা সাত‘শ টাকা। কেউ আবার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না থাকায় জমা দিতে পারেন নি হতভাগ্য চেকটাই। যাদের টাকা নিয়ে কথা বলছি তারা সবাই বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত লেখক, কবি। এই টাকার অঙ্কগুলো তাদের লেখক জীবনের একেবারে শুরুতে পত্রিকায় ছাপা হওয়া প্রথম লেখার পারিশ্রমিক।লিখে আয় করা টাকা। কী করেছিলেন তারা সেই প্রথম পারিশ্রমিক দিয়ে? কোন সালে প্রথম মিলেছিলো সেই পারিশ্রমিক? আমরা এখন যাকে বলি লেখার বিল।

এসব জানতেই প্রাণের বাংলার পক্ষ থেকে কথা বলেছিলাম কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলন, কবি শামীম আজাদ, গল্পকার ও ভ্রমণ কাহিনি লেখক ফারুক মঈনুদ্দিন, শিশু সাহিত্যিক রকিব হাসান, আমীরুল ইসলাম, কবি টোকন ঠাকুর ও পিয়াস মজিদের সঙ্গে। তাদের সঙ্গে কথায় কথায় জানা হয়ে গেলো মজার তথ্য। চোখের সামনে ফুটে উঠলো পুরনো এক সময়ের ছবিও।তাঁদের সঙ্গে সেই কথোপকথনের বিবরণ ছিলো অনেকটা এরকম।

ইমদাদুল হক মিলনঃ প্রশ্নটা করতেই দেশের বিশিষ্ট কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলন স্মৃতি হাতড়ে ফিরে গেলেন ১৯৭৩ সালে।তখন ঢাকার বাংলাবাজার থেকে প্রকাশিত হতো ‘ঝিনুক’ নামে একটি পত্রিকা।ইমদাদুল হক মিলন জানালেন, সেই পত্রিকায় একটা গল্প লিখে প্রথম লেখক সম্মানী পেয়েছিলেন কুড়ি টাকা। তিনি বলছিলেন, ‘তখন কলেজে পড়ি। ১৯৭১ সালে বাবার মৃত্যু হয়েছে। সংসারে খানিকটা অভাবও ছিলো। টাকাটা পেয়ে ভীষণ আনন্দ হয়েছিলো। সেটা ছিলো সম্ভবত আমার তিন অথবা চার নম্বর গল্প। সেই প্রথম আমার লিখে টাকা পাওয়া।’

জানতে চাইলাম সেই কুড়ি টাকা দিয়ে কী করেছিলেন? হাসলেন লেখক। জানালেন, সেদিনের সেই টাকার সামান্য অংশ খরচ হয়েছিলো বন্ধুদের পেছনে। বাকীটা তুলে দিয়েছিলেন মায়ের হাতে।

শামীম আজাদঃ বিশিষ্ট কবি, অধ্যাপক ও লেখক শামীম আজাদ এখন প্রবাসী। দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন লন্ডন শহরে।ফোনে প্রশ্ন শুনে একটু সময় নিলেন।স্মৃতির পাতা উল্টে বললেন, প্রথমবার লেখার পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন তৎকালীন দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় গল্প লিখে।বাংলাদেশ তখন স্বাধীন হয়েছে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। কথা প্রসঙ্গে শামীম আজাদ বললেন, তার লেখালেখির শুরুটা কবিতা দিয়ে নয়, গল্প দিয়ে।

পারিশ্রমিক হিসেবে কত টাকা পেয়েছিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, চেক দিয়েছিলো ওরা। পনেরো টাকার এক বিরাট প্রাপ্তি। অবশ্য গল্প ছাপা হওয়ার পর রোকেয়া হল থেকে ফোন করেছিলেন পূর্বদেশ অফিসে। ওরাই যেতে বলেছিলো চেক আনতে।

তখন কি জানতেন লেখা ছাপা হলে টাকা পাওয়া যায়?

‘জানতাম। বন্ধু শিশু সাহিত্যিক আলী ইমাম আমাদের এসব খবর এনে দিতো। তবে সেই সময়ে একটা লেখা ছাপা হওয়ার জন্য মনোনীত হওয়ার ব্যাপারটাই আমাদের কাছে অনেক বড় ব্যাপার ছিলো।’

পারিশ্রমিকের টাকা পেয়ে সেটা জমা দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি‘র জনতা ব্যাংকে। সেখানে তখন ম্যানেজার ছিলেন প্রয়াত বিশিষ্ট অভিনেতা বুলবুল আহমেদ।শামীম আজাদ টাকা তুলে ৫ টাকায় কিনেছিলেন দুই ফিতার একজোড়া স্যান্ডেল আর ১১ টাকা দিয়ে ঢাকাই শাড়ি।

ফারুক মঈনুদ্দিনঃ  ফারুক মঈনুদ্দিন গল্পকার। এখন বেশী লিখছেন ভ্রমণ কাহিনী। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকার সময়ে তাঁর প্রথম গল্প ছাপা হয় তৎকালীন দৈনিক বাংলায়। সেটা ১৯৭৮ সালের কথা। তখন দৈনিক বাংলার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন কবি আহসান হাবীব। গল্পের নাম মনে করতে পারলেন না তিনি।লেখার সম্মানী হিসেবে পেয়েছিলেন ২০ টাকা।

টাকাটা কীভাবে খরচ হয়েছিলো জানতে চাইলে ফারুক মঈনুদ্দিন বললেন, ‘ তখন আমরা যারা লিখতাম তাদের মধ্যে লেখার সম্মানী পেলে সেটা বন্ধুদের খাতেই খরচ করার নিয়ম ছিলো। আমার বেলায়ও তার ব্যাতিক্রম হয় নি।

রকিব হাসানঃ শিশু সাহিত্যিক রকিব হাসান লিখে প্রথম টাকা পেয়েছিলেন মাসুদ রানা লিখে। সেবা প্রকাশনী থেকে তাকে দেয়া হয়েছিলো সাতশ টাকা। বইটির নাম ছিলো ‘কুউউ’। অবশ্য সে বই প্রকাশিত হয়েছিলো কাজী আনোয়ার হোসেনের নামে।

‘তখন আমি একটা চাকরি করি। দুশো টাকা বেতন পাই। মাকে নিয়ে এই শহরে একটা বাড়িতে ভাড়া থাকি। মনে আছে সাতশ টাকা পেয়ে ভীষণ অবাক হয়েছিলাম। আমার চাইতে বেশী অবাক হয়েছিলেন আমার মা।’

১৯৭৮ সালের কথা সেটা। ওই সময়ে সে টাকার মূল্যও ছিলো অনেক। টাকাটা নিয়ে কীভাবে খরচ করবেন বুঝতে পারছিলেন না রকিব হাসান। বললেন, ‘টাকা পেয়ে কিছুটা খরচ করেছিলাম ঢাকা স্টেডিয়ামের দোতলার প্রখ্যাত বইয়ের দোকান  ম্যারেয়িটা থেকে অনেক বই কিনে। আর বাকীটা যতদূর মনে পড়ে মাকে দিয়েছিলাম।

আমীরুল ইসলামঃ শিশু সাহিত্যিক আমীরুল ইসলামও প্রথমবার লেখার পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন লুপ্ত দৈনিক বাংলা পত্রিকা থেকে।১৯৭৭ সালে দৈনিক বাংলার শিশুদের পাতা সাত ভাই ভাই চম্পায় তাঁর একটি লেখা ছাপা হয়। পাতাটি সম্পাদনা করতেন প্রয়াত শিশু সাহিত্যিক আফলাতুন। পারিশ্রমিক হিসেবে পেয়েছিলেন দশটি টাকা। সেই ভীষণ ভালো লাগার দিনটিতে সঙ্গে ছিলো বন্ধু আহমদউল্লাহ।

টাকা পেয়ে কী করেছিলেন মনে আছে?

হাসলেন আমীরুল।

‘ছয় টাকা দিয়ে মায়ের জন্য এক বোতল স্কোয়াশ কিনেছিলাম। তখন বোতলে ভর্তি এই স্কোয়াশ ছিলো এক ধরণের কমলার স্বাদের পানীয়।মনে হয়েছিলো, গরমের দিনে মা এই ঠান্ডা পানীয় খেতে পছন্দ করবেন।’

টোকন ঠাকুরঃ কবি টোকন ঠাকুরের প্রথম লেখা ছাপা হয়েছিলো এক সময়ের ‘নবারুণ’ পত্রিকায়। অবশ্য সে লেখা টোকন চোখে দেখতে পাননি। টোকন বললেন, ‘ এখন যেমন লেখা ইমেল করে পাঠিয়ে দেয়া যায়, কদিন আগেও এমন ছিল না বাপু। মফস্বল থেকে ঢাকার কাগজে লেখা পাঠাতাম। লেখা ছাপা আর হতো কই? তবু খামে ভরে লেখা পাঠাই, অপেক্ষা করি, যদি ছাপা হয়। তখন কলেজে পড়ি, সরকারি কেশবচন্দ্র কলেজ, ঝিনাইদহে। একদিন একটি চিঠি পেলাম ঝিনেদায় বসেই। খাম খুলে দেখি কি, একটা চেক, ৬০ টাকার। সঙ্গে ‘নবারুণ’ পত্রিকা থেকে একটি চিঠি। ‘নবারুণ’এর কোন সংখ্যায় যে লেখা ছাপা হয়েছে, তা তো দেখলাম না! তবু লেখা তো ছাপা হয়েছেই, নইলে আমার নামে চেক এলো কেন?

ব্যাংকে একাউণ্ট খুলে চেকটা জমা দিলাম। তার আগে চেকের একটা ফটোকপি করে রাখলাম। প্রমাণ আর কি!যদি কোনোদিন কোনো লেখা ছাপা নাও হয়, একটা লেখা ছাপা যে হয়েছিল একদিন, তার এক নমুনা রাখার ইচ্ছে হয়েছিল সেদিন।  এরপর আরো কয়েকটা লেখার চেক জমা করে একদিন ব্যাংক থেকে সেই টাকা তুলে ফেললাম। বই কিনলাম।

এরপর হাজার হাজার টাকার লেখার চেক পেয়েছি, কোথাও চেকের বদলে সরাসরি নগদ অর্থও পেয়েছি, পাচ্ছি। মনেও থাকে না কোথায় কোথায় লেখার চেক পাব! লিখে এককালীন একলক্ষ টাকার চেকও পেয়েছি। কিন্তু সেদিনের সেই ৬০ টাকার একটা মহিমা থেকে যাচ্ছে বাকি জীবন।  যদিও, লিখে টাকা হয় না, লেখা জীবন কেড়ে নেয়। কথা এর বেশি কী বলব আর বাপু? এখন একটা ৬০ লক্ষ টাকার চেক দরকার।’

পিয়াস মজিদঃ কবি পিয়াস মজিদ।জীবনে প্রথম লিখে টাকা আয় করেছিলেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে প্রকাশিত ‘বই’ পত্রিকায় লিখে। মজার ব্যাপার হচ্ছে তারও প্রথম লেখা কবিতা ছিলো না। সময়টা ২০০২ সাল। পিয়াস বলছিলেন, ‘লেখা ছাপা হওয়ার পর আমার কাছে চেক এলো। তাতে ছয়শ টাকার অঙ্ক বসানো। কিন্তু তখন আমার কোন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিলো না। তাই সেই চেক আর ব্যাংকে জমা দেয়া হয় নি। তোলা হয় নি টাকাও।’

পিয়াস অবশ্য চেকটা বেশ অনেকদিন নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে।

সাক্ষাৎকার: প্রাণের বাংলা প্রতিনিধি

কাভার ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com