লিখছি মেইন আয়ল্যান্ড থেকে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নীনা হাসেল (ভ্যাঙ্কুভার থেকে)

২০১৪তেই আমি মনস্থির করেছিলাম মেইনে ফিরে যাবো।

২০১৫র প্রথম দিকে আমার কাউন্সিলিং অফিস বিল্ডিংয়ের ল্যান্ড লর্ডকে নোটিশ দিলাম।আমার অফিসটা ছিল কেরিসডেল ও পশ্চিম ৪১ এভেন্যু তে।। আশে পাশে যথেষ্ট ফ্রি পার্কিং। কাছেই স্টারবাকস ম্যাকডোনালস।, চাইনিজ, জাপানিজ  ইংলিশ, ইতালিয়ান, গ্রীক, থাই ও যুইয়িস বেকারি । আমার খুব প্রিয় ছিল এই এলাকাটা সব মিলিয়ে। মাঝে স্টারবাক কিংবা ম্যাকডোনালসে বসে  কবিতা লিখেছি। কিংবা ডিএমেস-৪ এর পাতা উল্টিয়েছি। জুলাইয়ের শেষ নাগাদ লিজ শেষ হয়ে যাবে।  জুলাই এর প্রথম দিকে বন্ধু শ্রাবণী ফোন করে জানাল ও আসবে। আমি তো মহা খুশীতে প্যাকিং বন্ধ করে দিয়ে ওর আসা নিয়ে উত্তেজিত হয়ে গেলাম। সেই কবে থেকে আসবো আসবো করে শেষ পর্যন্ত ও এলো পাঁচ দিনের সফরে। ভ্যাঙ্কুভারে  দুদিন কাটিয়ে মেইনে এলাম। ছোট বোন রত্না আমাদের সঙ্গী হল । মহা আনন্দে কেটে গেল সময়। আমরা যেন দুদিনের জন্য কৈশোরে ফিরে গিয়েছিলাম।  তারপর যাবারদিন শ্রাবণীকে সেন্ট্রাল ষ্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এসে সত্যি খুব মন খারাপ হয়েছিল। সেই তিরিশ বছর পরে আবার দেখা হলো। শ্রাবণীর এসে চলে যাওয়াটা একটা জিনিস গভীর ভাবে অনুভব করলাম যে আমরা আমাদের রক্ত সম্পর্কিত পরিবার ও  বৈবাহিক সূত্রে যে পরিবার সেই পরিবারকে স্বাভাবিক বলে মনে করি কিন্তু তার বাইরে যে পরিবার আমাদের বন্ধুদের সঙ্গে গড়ে ওঠে সেই পরিবার কোন দিক থেকেই গৌণ নয়। যাদের সঙ্গে রক্তের বন্ধন নেই কিন্তু আছে শর্তহীন ভালবাসা আর তার মধ্যে নিহিত বিশ্বস্ততা। যে কিনা বন্ধু, বোন অথবা ভ্রাতৃতুল্য । সময় মত তারা ডাকবার  জন্য অপেক্ষা করেনা ।  কিন্তু কোন রকম চাহিদা ও  চাপ নেই এই সম্পর্কের মাঝে।

ও চলে যাবার পর চোখ মুছে মন খারাপ নিয়েই প্যাকিং শুরু করলাম। সারা ঘরে কার্ড বোর্ডের বাক্স।মেইন স্ট্রীটের লিকার স্টোর থেকে সংগ্রহ করেছি। আবার ফিরে এলাম মেইনে।নাগরিক জীবনের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত সম্পর্ক ছিন্ন  করে। সব মোহকে না বলে। ফুরফুরে পাখীর আনন্দ নিয়ে ঘুরেফিরে গ্রীষ্মের একটা মাস পার করে দিলাম। যেন আমি নিজের বাড়ীতেই ছুটিতে এসেছি।

কোন কিছু নিয়ে কোন উদ্বেগ নেই তাড়াহুড়ো নেই। ধীরেসুস্থে শীতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।ঘরের আসবাব এদিক ও ওদিক করি। শুকনো কাঠ সংগ্রহ ও কাটানো ।  আমি ছোট একটা কুড়ুল দিয়ে সরু করে কাঠ চেরাই করি আগুণ ধরাবার জন্য।  দিনগুলি যেন খুব তাড়াতাড়ি কেটে যাচ্ছে। কবিতা পড়া  গান শোনা তারপর খানিকটা লেখালেখির চেষ্টা যা কিনা নিজের সঙ্গে ছলনা বলা চলে।

অপূর্ব সুন্দর এই দ্বীপটি এক কথায় ম্যাজিক্যাল। ভ্যাঙ্কুভার থেকে আসার পথে প্রথমে পড়ে  গ্যালিয়ান আয়ল্যনড  তারপর ভিলেজ বে মেইন আয়ল্যানড । তারপর মেইন , পেনডার এবং শেষ স্টপ সল্ট স্প্রিং আয়ল্যান্ড। স্যাটারনা আয়ল্যান্ডের যাত্রীরা মেইনে নেমে একটা ছোট ফেরী ধরে যায় মেইন আয়ল্যানড। দক্ষিণ গলফ আয়ল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপ এই  মেইন আয়ল্যানড।  যেখানে আমার বাস ।

খুঁজতে খুঁজতে একদিন কলম্বাসের মত এই দ্বীপে পৌঁছে গিয়েছিলাম।  আমি পেয়েছিলাম আমার  স্বপ্ন ঘেরা ‘ধন নয়  মান নয় এতটুকু বাসাটি’ ২০০৩ সালে ।

যেহেতু পেশাগত কারনে আমাকে ভ্যাঙ্কুভারে থাকতে হতো তাই এখানে খুব একটা থাকা হতো না। আসা যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল ।

নতুন করে আবার মেইনের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ঝালাই করছি। কি করে এখানে আমার এত বন্ধু হল সেটা পরে অন্য লেখায় বলবো। নতুন করে বসত করা পুরানো গাঁয়ের সেই পুরানো বাড়ীটিতে বসে আমি সমুদ্র ও বনরাজীর সঙ্গে আবার নতুন করে প্রেমে পড়লাম যেন।

শরতের  শুকনো হলুদ ঝরা পাতার উপর আমার নিজেরই হালকা পায়ের শব্দ শুনি; মনে কেমন যেন একটা হুহু করা আনন্দ।  মানব জীবনের সীমাবদ্ধতা হয়ত এটাই। সুখের মাঝেও দুঃখ। পূর্ণতার মাঝেই অপূর্ণতা।  প্রকৃতির কাছে নিজেকে সমর্পণ করি।

গত ক্রিসমাসের  আগে পুরানো ফায়ার প্লেস বদলে নতুন একটা লাগানো হয়েছে।  ঠাণ্ডা পড়ে গেছে। আগুনের পাশে বসে বই পড়ি ডিনার করি রোস্ট বিফ স্যান্ডউইচ দিয়ে। সঙ্গে লেটুস, হর্স র‍্যাডিশ সস দিয়ে গার্নিস করে। কোন দিন টুনা কিংবা স্যালমন  বা বেগুনে আর  মজারেলা পনির সহযোগে ফ্যান্সি নিরামিষ স্যান্ডউইচ তৈরি করি। খেতে ভালো, তৈরি করাও সহজ।।একটানা কয়েকদিন এরকম খাবার পর খুব ভাত খেতে ইচ্ছে করে।

এই রকম প্রায় তিন সপ্তাহ এক টানা নিরামিষ মেন্যু চলার পর বেশ একটু কাহিল লাগছিলো।

প্রায়ই আমিষের প্রতি অনিহা বোধ করি আমি। বন্ধু শ্রাবণী ফোন করে বকুনি দিয়ে যাচ্ছে বেশী করে আমিষ ভক্ষন করার জন্য তাছাড়া হঠাৎ করে নিরামিষাশি হওয়াটা হয়তো অবাস্তব।

তাই আজ একটু বাজার করতে বেরুলাম। আমাদের অন্যতম মাছ মাংসের দোকান বা বাজার “ট্রু ভ্যালু” তে গেলাম। বাজার করেছি শাকসবজী, ফলমূল, দুধ আর ডিম।  কিনলাম বাইসনের কিমা। যদিও ফ্রিজারে মাছ মাংস মজুদ আছে তবে বরফ গলা সময় সাপেক্ষ। ফ্রোজেন খাবার খেতে মন চাইলো না।তাই তাজা মাছ মাংসের দিকে গেলাম। এখানে খাবারের বৈচিত্র বড় শহর ভ্যাঙ্কুভারের মত নয়। তবে একেবারে নেই সেটাও বলা চলে না। সমস্যা যত নিজেকে নিয়ে। যে খাদ্যাভাস নিয়ে বড় হয়েছি। কত রকমের খাবার গরু, শুকর, ভেড়া, ছাগল বাইসন মুরগি,টার্কি আর কত রকমের সসেজ ইত্যাদি। মাছের মধ্যে ততো রকমারি নেই, আছে শুধু স্যালমন, স্ন্যাপার, কড আর চিংড়ি মাছ।কিছুতেই তেমন আগ্রহ বোধ করলাম না। অগত্যা কিছুতো খেতে হবে তাই বাইসনের কিমা। কোন হরমন বা কৃত্রিম খাবার বা এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়নি। নির্ভেজাল। ভাবলাম চিলি রান্না করবো। চিলি হচছে মেক্সিকান খাবার। চিলিতে সাধারনত কিমা আর লাল কিডনি আকৃতির বরবটির বিচি দেয়া হয়। লাল ও সাদা দুই রঙের পাওয়া যায়। মশলা আর টম্যাটো দিয়ে রান্না করা হয়। কিছুটা ঘন সুপের মত। খাওয়ার আগে সুপের বাটিতে বেড়ে তাঁর উপর হলুদ রঙের চেডার পনিরের গুড়ো ও ধনে পাতার কুচি দিয়ে পরিবেশন করা হয়। খেতেও মন্দ নয়। সঙ্গে বেকড রাসেট আলুর সাথে টক ক্রিম ও তাঁর ওপর সবুজ পেঁয়াজ পাতার কুচি ছড়িয়ে দিতেই দেখতে বেশ আকর্ষনীয় লাগলো নিজের কাছেই। সে  এক রীতিমত ফিস্ট রান্না করলাম নিজের জন্য।৭০ এর দশকের ছোট ভিনটেজ কিচেন টেবিলটাতে গুছিয়ে নিয়ে খেতে বসলাম ।

শেষে রাখলাম এক টুকরো লেবু আর একটা ফ্রোজেন কাচামরিচ। আর আমার ছেলে অয়নের ছোট নীল চায়নীজ পটে পুরো একপট কেমোমিল চা দমে দিলাম। কেমোমিল চা  ঘুমাতে সাহায্য করে। সেই সংগে CBC রেডিওরসান্ধ্য অনুষ্ঠান ক্লাসিক্যাল জ্যাজ টিম টামিশিরোর উপস্থাপনায়। নিজের ঘরের বিস্ত্রোয় বসে খাচ্ছি। বাইরে ঘন নরম অন্ধকার। শিশিরের শব্দ না শোনা গেলেও অনুভব করি কদাচিৎ হরিণের চঞ্চল চলাফেরা ঝরা পাতায় খদখসে শব্দ তুলে বনের নিবিড়তায় হারিয়ে যায় তারা যথারীতি।আগুনটা তাতিয়ে দিয়ে আহারে মন দিলাম।

নিজেকেই যেন মনে মনে বলি, এই ছোটগ্রামের নিরিবিলি অরণ্যের ঐশ্বর্য ও শান্তির জীবনকে যেন প্রতিদিন বিনম্র চিত্তে উদযাপন করে যেতে পারি। (চলবে)

ছবি: লেখকও গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com