লালনের দেশে, দিচক্রযানে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হোমায়েদ ইসহাক মুন

গত শীতে আমাদের একটা লোভনীয় পরিকল্পনা হল। দলে আমরা শুধুই চার জন, কম লোকে কম ঝামেলা। সবাই সাইকেল চালনায় সিদ্ধহস্ত, তবে কারবারটা অবশ্য এখানে পা দিয়েই। যাবো সেই লালনের দেশ কুষ্টিয়াতে। সাইকেল চালিয়ে এত পথ যাওয়া হয়েছে বটে তাই বলে একদিনে! সাগর ভাই আমদের পথ প্রদর্শক, সাহসের ভান্ডার। তিনি বললেন, এটাইতো চ্যালেঞ্জ আর এডভেঞ্চারের মজা। সুতরাং তাদেরকে দলে ভেড়াতে হবে যাদের পা-খানি জবর পোক্ত। আরিফ ভাই পাহাড়-পর্বতে সাইকেল চালায় আর বাশিওয়ালা মফিজ বেশ শক্ত সমর্থ। মূলত দূরত্বময় রাইডে কিছু প্রস্তুতি প্রয়োজন, যেমন সাইকেল এমন দূরত্বের পথ অতিক্রম করতে পারবে কিনা তা ভালভাবে পর্যবেক্ষন করে নেওয়া। টিউব,পামপার,টুলস সঙ্গে রাখা। সাইকেলের পেছনের চাকার উপরে ক্যারিয়ার এর সঙ্গে দ’ুপাশে প্যানিয়ার (প্রয়োজনীয় জিনিস নেয়ার ব্যাগ) থাকাটা জরুরি। কারন পিঠে ব্যাগ বহন করলে লং রাইডে বেশ কষ্ট হয়। এই রাইডটাকে আমরা একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছিলাম। ঠিক ঠিক প্রস্তুতি নিয়ে আমরা ভোর অন্ধকারে বের হলাম, সবাই মিলিত হবার কথা আসাদগেট। রাইডে যত ভোরে বের হওয়া যায় তত ভাল, কারন রোদের তাপের সঙ্গে সঙ্গে শরীরে আস্তে আস্তে ক্লান্তি ভর করতে শুরু করে। পাটুরিয়া ফেরিঘাট পৌছে গেলাম পাঁচ ঘন্টার মধ্যেই। দূরত্বরে পরিমাপ ছিল ৮৭ কিলোমিটার। সবাই ঠিক করেছিলাম এই পথে অতি জরুরি কিছু ছাড়া থামব না। ফল পাঁচ ঘন্টায় ফেরিঘাট পৌছনো। নাস্তা সেরে ফেরিতে উঠে পড়লাম, আমাদেরতো কোন জ্যামে আটকে থাকতে হয় না, সুতরাং বেগ পেতে হয়নি। সাইকেল আর মানুষের ভাড়া মিলিয়ে নিয়েছিল যতসামান্য টাকা। পদ্মা পাড়ি দিতে দিতে আড্ডা হলো, নদী তার জৌলুস হারাচ্ছে দিনকে দিন। শীতের সময় তার করুন অবস্থা দেখে মায়া লাগে। কত মানুষের জীবন জিবিকা এই নদীর উপর নির্ভর করে। ফেরি পার হয়ে ফরিদপুরের রাজবাড়ির পথ ধরলাম। রাস্তা একদম পরিপাটি। কিন্তু মনে হচ্ছিল এ পথের যেন কোন শেষ নেই। বড় বাসগুলোকে লক্ষ রেখে চালাচ্ছিলাম।

পথে মানুষজনের বিচিত্র কৌতুহল আমাদের আমোদিত আর উৎসাহিত করেছে বৈকি। যখনই জানতে পারে ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছি তখনই একেকজনের চক্ষু চড়কগাছ।বেলা গড়ালে রোদের তাপটাও বাড়ে, আমাদের গতিও একটু মন্থও হয়। নিরিবিলি গ্রামের পরিবেশে একটু থেমে নিয়ে চা-চক্র চলে। কখনো একটানা চলতে চলতে মাথা আর পা অবশ হতে শুরু করে। কিন্তু গন্তব্যের টানে শুধুই ছুটে চলা। যাওয়ার পথে একবারতো সাইকেল থামিয়ে রাস্তার ধারে শুয়েই পড়লাম। সঙ্গীরা এসে সাহস যোগালো। ভ্রমণে সবচেয়ে মূল ব্যাপার হচ্ছে সঙ্গী নির্বাচন, কারন চলার পথে তারাই আপনের চেয়ে আপন হতে শুরু করে, আর সময়গুলো কাটে নিবিড় আনন্দে।এভাবে থেমে-চলে কুষ্টিয়া পৌছে গেলাম। তখন প্রায় রাত ৮টা। সাইকেলের মিটারে দেখাচ্ছে ১৭০ কিলোমিটার। রাতে থাকবার জায়গা ঠিক হলো পুলিশ বন্ধুর বদৌলতে, সরকারি রেস্ট হাউজে। শুতে যাবার আগে পরদিনের পরিকল্পনাটা হয়ে গেল। শরীর আর চলছে না, একদিনে কুষ্টিয়া আসার আনন্দ নিয়ে ঘুমাতে গেলাম।
ভোরে সাইকেল পরিষ্কার করে রওনা হলাম মেহেরপুর এর পথে। রাস্তাগুলো সত্যিই অসাধারন, শীতের সকাল, সঙ্গে কুয়াশার প্রলেপ এর মধ্যেই এগিয়ে যাওয়া। আজ আমাদের তেমন একটা তাড়া নেই, একটু রয়ে সয়েই যেতে পারবো। মাত্র ৮০ কিলোমিটারের পথ। কঠিন রাস্তা গতদিনেই পার করে এসেছি।

এ অঞ্চলে আমের ফলন ভাল হয় তাই পথে পথে আমের অনেক বাগান পেলাম। আবার কলার স্বাদও বেশ, এক বটের ছায়ায় বসে আমরা বেহিসাব কলা সাবাড় করে দিলাম। আরিফ ভাই হঠাৎ আবিষ্কার করলো একটা বাঁশের মাচা পাতা আছে আম বাগানের ভেতরে। জায়গাটা অদ্ভুত সুন্দর আর নিরিবিলি। রাস্তা থেকে একটু ভেতরে প্রবেশ করার পর দেখলাম আলো আধারিতে ছেয়ে আছে বাগানটা। একটি আম গাছের সঙ্গে মাচা পাতা আছে শোবার খাটের আকারে। সামনে সবজির খোলা বাগান, মিষ্টি রোদ এসে গায়ে লাগছে। হাত-পা ছড়িয়ে রীতমিত শুয়ে পড়লাম আর মফিজ ভাই যাকে আমরা বাশিওয়ালা বলি তার মন কাড়া বাঁশরী বাদন এই নিঃস্তব্দতায় যেন কোন এক কল্পলোকে নিয়ে গেল। খেজুর আর পানি দিয়ে শক্তি সঞ্চয় হলো আর সঙ্গে অনেক্ষন খুনসুটি চলল। আমার গচ্ছিত চারটি খেজুর নিয়ে সেই কী খেপানো। ইচ্ছে করছিল সারাদিন এখানটাতেই কাটিয়ে দেই, ঘুরতে ঘুরতে এমন কিছু জায়গার সন্ধান পাই মনে হয় এখানটায় বসবাস শুরু করি। কী বা আর হবে বাসাবাড়িতে ফিরে না গেলে! জীবনটা সত্যিই বিচিত্র। ঘুরে বেড়াতে না পারলে হয়তো এসব কখনো জানতেও পারতাম না। আরো অনেকটা সময় থাকবার ইচ্ছে থাকলেও সামনের গন্তব্য মুজিবনগর,তাই উঠতেই হলো। মেহেরপুরে দুপুরের খাবারটা সেরে মুজিবনগরের পথে চালানো শুরু করলাম। মেহেরপুর থেকে মুজিবনগরের দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার।মুজিবনগর জিরো পয়েন্টে যখন পৌছেছি তখনো গোধূলির আলো মলিন হয়নি।

আমাদের গর্বের এক জায়গা এই মুজিবনগর, কারন এখান থেকেই ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠন হয় এবং মুজিবনগর সরকার শপথগ্রহণ করে আর তারপরেই স্বাধীন দেশের জন্য যুদ্ধের ডাক দেয়।আ¤্রকাননে শোভিত মুজিবনগর স্মৃতি স্তস্ভ আজও তার জলন্ত সাক্ষী হয়ে আছে। আমরা জুতো রেখে বেদিতে শ্রদ্ধা নিয়ে ঘুরে দেখি। এখানে ২৩টি স্তম্ভ আছে যা ২৩ বছরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূববর্তী সময়েপশ্চিম বাংলার উপওে পাকিস্তানি শাসন ব্যবস্থাকে প্রতিনিধিত্ব করে। মুজিবনগরের আদি নাম ছিল বৈদ্যনাথতলা।পরবর্তিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এর স্বাধীনতা ঘোষনার পরে তাঁর নামানুসারে এর নামকরন হয় মুজিবনগর।আম বাগান পার হয়ে একটু এগিয়ে গেলে মুজিবনগর কমপ্লক্সে , বিশাল জায়গা জুড়ে মানচিত্রে পুরো বাংলাদেশকে দেখা যাবে। ছবি তুলে আমরা আবার ফিরতি পথ ধরলাম। ততক্ষনে আধার নেমে এসেছে, যেতে হবে অনেকটা পথ। সেখানে চা চক্রে পরিচয় হলো রুবেল আর তার বন্ধুদের সঙ্গ।ে আলাপনে তারা আন্তরিকতা দেখিয়ে বলে, ‘অন্ধকারে সাইকেল নিয়ে এভাবে যাওয়াটা ঠিক হবে না আমরা মটরবাইকে আপনাদের এগিয়ে দিব’। বন্ধুত্বরে হাত বাড়িয়ে গল্প করতে করতে মেহেরপুর ফিরে এলাম। রাতে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে মেহেরপুর জেলা তথ্য অফিসের রেস্ট হাউজে আমার স্কুল বন্ধু চঞ্চল এর সৌজন্যে। পরদিনের যাত্রা শুরূ করলাম সোনালি আভা গায়ে মেখে। আবহাওয়াটাও ছিল বেশ চমৎকার। আমঝুপির নীলকুঠিতে চলে আসলাম।

ঢোকার মুখে আ¤্রকাননের অংশে একটা শান্তিময় ছবি পেয়ে গেলাম, মন তৃপ্ত হলো । এখানে বিচিত্র পাখি আছে, হাড়িচাচা আর হলদে পাখিদের আনাগোনা। মেহেরপুরে নীলকুঠিগুলোর মধ্যে আমঝুপি নীলকুঠি অন্যতম। এখানে একসময় লর্ড ক্লাইভ বসবাস করতেন। নীলকুঠি থেকে হাতের বা দিকে রয়েছে বিশাল মাঠ আর তার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কাজলা নদী। মেহেরপুর সদর থেকে আমঝুপি নীলকুঠির দূরত্ব ৭ কিলোমিটারের মত। কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের বেশ কিছু নীলকুঠির মধ্যে আমঝুপি নীলকুঠি অন্যতম। ইতিহাসের পাতা থেকে জানতে পারি, ১৯৭৮ সালের ১৩ মে খুলনা বিভাগ উন্নয়ন বোর্ডের আমঝুপি অধিবেশনের সভায় এক সময়কার নীলকুঠিটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। পলাশীর পরাজয়ের নীল নকশা রচিত হয়েছিল এখানেই। জনশ্রুতি আছে যে, এখানেই রবার্ট ক্লাইভের সঙ্গে মীরজাফর ও ষড়যন্ত্রীদের শেষ বৈঠক হয়েছিল এবং তার ফলে শুধু নবাব সিরাজউদ্দৌলারই ভাগ্য বিপর্যয় ঘটেনি, বাঙ্গালী হারিয়েছিল তার স্বাধীনতা।

আমরা বাড়িটা ঘুরেফিরে দেখি তারপর প্যাডাল মারা শুরু করি। পরবর্তী গন্তব্য শিলাইদহ, রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি। কুষ্টিয়ার গড়াই নদী পার হয়ে কুমারখালির এক বিকল্প পথ ধরলাম। রাস্তা সারাইয়ের কাজ চলছিল, তাই যা-তা অবস্থা। বালু পথ, মেঠো পথ পেরিয়ে অবশেষে রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি। যেখানে রবি ঠাকুর তার যুগান্তকারি কবিতা ‘সোনারতরী’ লিখেছিলেন। এছাড়াও লিখেছেন ‘কথা ও কাহিনী’, ‘চিত্রা’, ‘চৈতালী’ সহ আরো অনেক কবিতা ও গান। এখানে বসে ১৯১২ সালে কবি ‘গিতাঞ্জলী’ এর ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন যা ১৯১৩ সালেতাঁকে দিয়েছিল নোবেল। ঘুরে ফিরে দেখে বেশ তেষ্টা পেয়েছে, বাইরে কুলফি ওয়ালা আমাদের দেখে এগিয়ে এলো। এখানের সবচেয়ে স্পেশাল বলে যদি কিছু থাকে তাই মনে হল। মালাইসহ দুধ তার মধ্যে এলাচ,কিভাবে কি করে হাড়ি ভরা কুলফি। হরেক আকারের হরেক দাম,দশ বা বিশ। আমরা দুই হাড়ি নগদে শেষ করে দিলাম। এখনো সেই স্বাদ আমাদের তাড়া করে। শহরের পথে যেতে আমাদের গড়াই নদী পার হতে হলো।

মানুষ ভর্তি নৌকার মধ্যে মানুষ সহ চারটে সাইকেল।রেল ঘাট দিয়ে নৌকা থেকে নেমে গোধূলী লগ্নে মীর মোর্শারফ হোসেন সেতুতে এসে থামি।যার নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে গড়াই নদী। শীতের মৌসুম বলে পানি তেমন একটা নেই তবে তার সৌন্দর্য মলিন হয়নি মোটেও। কিছু ভাল ছবি তোলার চেষ্টা করলাম। জলের কিনারা ধরে কেউ কেউ মাছ ধরছে। রক্তিমতায় জল মাটি মিলে মিশে একাকার। নদী দেখে রবীন্দ্রনাথের গানএর কথা মনে হল, মাটির বুকের মাঝে বন্ধীযে জল মিলিয়ে থাকে,মাটি পায় না তাকে”। পাশেই আছে গড়াই রেল ব্রীজ। এতখানি পথ এসে গোধূূলি বেলায় দূর দিগন্তের এই রক্তিমতা দেখেবিমোহিত হয়েছি আর পথের ক্লান্তি ম্লান হতে হতে অম্লান হয়েছে। অস্তের অপেক্ষা করে আবার পথ চলি। শহরে একটা এনজিও এর রেস্ট হাউজে শেষ রাতের থাকার ব্যবস্থা হয়।ব্যাগ রেখে দিচক্রযানে এবার লালনের বাড়ি ছেউড়িয়াতে। কুষ্টিয়া রেল ষ্টেশন থেকে মাত্র দুই কিলো দূর। ঘুরে ফিরে আর গান শুনে লালন ফকিরের ‘সত্য বল সুপথে চল’ মনে গেথে ফিরে এলাম।

ফেরার পথও ঠিক হলো একই ভাবে। দৌলদিয়া ফেরি র্পয্ন্ত আসার আগে পদ্মা নদীর বাধ ধরে একটা বিকল্প রাস্তা খুজে পাই। গ্রামের পথ, পাখির কলতান আর নদীর স্রোতসব মিলিয়ে মোহনীয় ছিল সেই রাস্তা আর সন্ধ্যা। ফেরি পার হবার পর মফিজ ভাইয়ের হাটুতে প্রচন্ড ব্যথা শুরু হলো। সুতরাং গড়িমসি করলেও তাকে বাসে তুলে দিলাম। বাকি তিনজন অন্ধকার রাতে এই ভয়ঙ্কর রাস্তায় প্যাডাল মারা শুরু করলাম। বড় রাস্তাগুলির মধ্যে এই ঢাকা-আরিচা হাইওয়ে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মনে হয় সাইকেল এর জন্য। দূরন্ত বাস থেকে গা বাঁচিয়ে সাভার পর্যন্ত এসে একটা ট্রাকে উঠে পড়লাম। ঢের হয়েছে এবার শান্তিতে বাড়ি যাই। বাড়ি ফিরে সাইকেলের মিটারের দিকে তাকালাম – চার দিনের এই ভ্রমণে পাড়ি দিয়েছি ৫৪৯.৭১ কিলোমিটার পথ।

লেখা ও ছবি : হোমায়েদ ইসহাক মুন

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com