রিনু পড়ে ফেলতে পারলো একটা গোটা জীবনের গল্প, নিস্তারিণীর গল্প

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রিনি বিশ্বাস,সঞ্চালক ও বাচিক শিল্পী

মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় সে পিতৃহারা হল; মা ছিলেন এক সন্তান। তাঁর কোন ভাইবোন ছিল না; বাবারও সেভাবে রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়পরিজন কেউ ছিলেননা; সময়টা ১৯০০ সালের অল্প এদিকে… প্রতিবেশী ও জ্ঞাতিদের সঙ্গে বাবার বাড়ির গ্রামে, নিস্তারিণী বেড়ে উঠতে লাগলো .. পাঠশালায় প’ড়ে, হুটোপুটি করতে করতে একসময় শৈশব পেরিয়ে সে হল কিশোরী; তখন গৌরীদানের সময়; আশেপাশে সমবয়সীরা যখন বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ি পাড়ি দিলো, তখনও সে মনের আনন্দে হেসেখেলে দিন কাটাতে থাকলো মায়ের কাছেই! বিয়ের বয়সটা তার পেরিয়ে যেতে বসলো! এরজন্য হয়ত বা অল্পবিস্তর কথাও শুনতে হয়েছে মা মেয়েকে! কিন্তু সম্বন্ধ দেখবে এমন কোন আত্মীয়ই যে নেই! বহু বছর পরে নিস্তারিণী তাঁর নাতনির কাছে গল্প করেছেন ‘আমাদের তো কেউ ছেল না! ‘ তাই তাঁর বিয়ের কোন ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছিলনা! বাপমরা অনাথ মেয়ে,

রিনুকে কোলে নিয়ে ঠাকুমা

বাবার বাড়িতে বেড়ে উঠেছে; প্রতিবেশী-জ্ঞাতি, সকলের কাছে আদরের পাত্রী হলেও কেইবা তার বিয়ে নিয়ে মাথা ঘামাবে! কিভাবে যেন প্রিয়নাথের সঙ্গে নিস্তারিণীর বিয়ের সম্বন্ধ হল! কোন এক কাজে সেই গ্রামে গিয়ে প্রিয়নাথ দেখেও এলেন এই কন্যাকে! ঠিক হল বিয়ে। পরিবারের মাথা তিনিই, নানান সাংসারিক দায়িত্ব সামলে তিনিও বেশ বয়স অবধি বিয়ে করে উঠতে পারেননি! সে সময় কম বয়সেই বিয়েশাদি করে সংসার করার চল ছিল; বেশি বয়সের পাত্র বা পাত্রী বিশেষ মিলতোনা! উপর থেকে কেউ একজন বোধহয় এই দুজনকে নির্দিষ্ট করে রেখেছিলেন পরস্পরের জন্য; তাঁদের বিয়ে হয়ে গেল; বিয়ে হয়ে নিস্তারিণী এসে পড়লো এক বর্ধিষ্ণু পরিবারে। জমিজমা, পুকুর, গাছগাছালি, মাছ আর অনেক স্বজন নিয়ে ভরা এই সংসার! কর্তামশাই কাজের জন্য বেশিরভাগ থাকেন গাঁয়ের বাইরে; বাড়িতে অনেক বৌমা; শাশুড়ি মায়ের মস্ত দাপট! সকলেই তাঁকে মান্য করে! শ্বশুরবাড়ির গেরস্থালিতে মানিয়ে নেওয়ার ভার পড়ে নিস্তারিণীর উপরে! তেমন স্বাচ্ছল্যের মধ্যে বড় না হলেও নিস্তারিণী ছিলেন মায়ের আদরের; যদিও সমান সমান ঘরে ছেলের বিয়ে হয়নি, তবুও কোন অজ্ঞাত কারণে, শাশুড়িমার কাছেও সে তেমনই স্নেহ পেতে শুরু করে; শাশুড়িমা এই অনাথ মেয়েটিকে প্রথম থেকেই কাছে টেনে নেন! যদিও অন্যান্য বধূদের তা তেমন পছন্দের হয়না! সংসারের খুঁটিনাটি ধীরে ধীরে শিখে নিতে শুরু করেন নিস্তারিণী! বেশ বড়সড় পরিবার ছিল তাঁদের! অনেক মানুষজনের সঙ্গে বেশকিছু মুনিষও থাকতেন সেই পরিবারের অংশ হয়ে!

কোলে ছোট নাতনি-রিনু, পিছনে বড় নাতনি স্বাতী

বিয়ের পর থেকে বেশিরভাগ সময়ে নিস্তারিণীর মা-ও হয়ে উঠলেন এই পরিবারেরই সদস্য; যথাযোগ্য মর্যাদায় তাঁকে পরিবারে স্থান দেওয়ার নেপথ্যে নিস্তারিণীর শাশুড়ি মায়ের এক বিশেষ অবদান ছিল…শাশুড়ি মা ও পুত্রবধূর এক নির্ভরতার সম্পর্ক ক্রমশঃ মজবুত হতে থাকলো…. বিয়ে হল বেশি বয়সে, সবাই মনে করলো এবার তাড়াতাড়ি কোল জুড়ে সন্তান আসবে নিস্তারিণীর! কিন্তু বছর ঘোরে, কোন সুখবর দিতে পারেননা নিস্তারিণী! দেবেনই বা কি করে! স্বামী তো থাকেন কর্মসূত্রে অন্যত্র! কদিনই বা স্বামীর সঙ্গে থাকার সুযোগ পান তিনি! কিন্তু গাঁ দেশের মানুষে তো তা বোঝেনা! বাপমরা সেই মেয়েকে শ্বশুরঘরে এরজন্য না জানি কত অকথা শুনতে হয়েছিল তা নিয়ে! যদিও ঘুণাক্ষরেও সেসব কথা তিনি কোনদিন কাউকে বলেননি! বলেছেন এনিয়ে তাঁর মায়ের উদ্বেগের কথা! মা যে অস্থির হতেন কেন মেয়ে সন্তানসম্ভবা হচ্ছেনা ভেবে, সে কথা বারবার বলতেন গল্পচ্ছলে! মা নিস্তারিণীকে নিয়ে যেতেন নানা জায়গায় ; না ডাক্তারের কাছে নয়; সেসময় গ্রামদেশে তেমন ডাক্তার বদ্যির চল তো ছিলনা; ছিল সাধু সন্ন্যাসীর কাছে যাওয়ার চল! তেমনই কোন এক পাগলাবাবার কাছে গিয়ে ওষুধবিষুধ খাওয়ার পরে নাকি নিস্তারিণী প্রথম মা হন! প্রথম সন্তানকে আজীবন তিনি ভালোবেসে ডাকতেন পাগল বলে! নাতনিরা যদি তর্ক জুড়তো ‘কি যে বলো, ওসব শেকড়বাকড় খেলে কি কোন কাজ হয়?! ঠাকুরদাদা তো গ্রামে থাকতোইনা; তোমাদের ছেলেমেয়ে হবে কি করে!’ বিরক্ত হতেন! তাঁর অগাধ বিশ্বাস ছিল সেই পাগলাবাবার জড়িবুটিতে! ছেলেরা তখনও ছোট, তাদের পড়ালেখা শেষ হয়নি; বাড়িতে রোজগেরে একমাত্র স্বামী; সেই অবস্থায় স্বামীহারা হন নিস্তারিণী! ততদিনে দেখেছেন দেশভাগ; জমিজমা, ঘরবাড়ি, ভিটে, স-ব ছেড়ে এসেছেন অবশ্য দেশভাগের বহু আগেই! খানিক স্বামীর একগুঁয়ে জেদেই চলে আসতে হয়েছে সব ছেড়ে…স্বামীর কর্মস্থল কলকাতায় চলে এসেছেন মেজ ছেলের যখন বছর সাত আট বয়স; তারপর আর ফিরে যাননি; শুরু হয়েছে তাঁদের জীবনসংগ্রাম! দেশগাঁয়ের স্বচ্ছলতা দূর অস্ত, প্রতিনিয়ত সেখানে বাঁচার জন্য লড়াই; অচেনা এই শহরে থেকেছেন নিজের সন্তানাদিসহ অন্যান্য পরিজনদের নিয়ে; বাংলাদেশ থেকে মানুষজনের আসা যাওয়া লেগেই থাকতো; কতজন ও বাড়িতে থেকেই পড়াশুনো করতো, পড়া শেষে চলতো চাকরি খোঁজ; এমন পরিস্থিতে এসবকিছু নিয়ে একা হয়ে গেলেন নিস্তারিণী; বেশ কম বয়সেই মারা গেলেন প্রিয়নাথ! কিভাবে কতটা লড়াই করে সন্তানদের বড় করেছেন নিস্তারিণী, তা কখনই সবিস্তারে তিনি কাউকে জানাননি; যাঁরা এর সাক্ষী ছিলেন, তাঁদের সংখ্যা আজ হাতে গোনা; নিস্তারিণীর সন্তানেরাও কখনও সেসব দিনের কথা বলেননি আর কাউকে; সেসব দিন তাঁদের ভিতটুকু মজবুত করেছিল, সন্দেহ নেই; পরবর্তীতে যখন তিনভাই তিনবাড়িতে আলাদা থাকতে শুরু করলেন, তখন এবং আজ অবধিও বড়দাদা যদি কোনরকম দরকার-অদরকারে ডেকে পাঠান, বাকি দুভাই কোন অবস্থাতেই ‘না’ বলেননি, বলবেনওনা! কোন উৎসব অনুষ্ঠানে বাইরের কেউ আজও বলবেন না এই তিনভাই কোথাও আলাদা! তাঁরা এখনও সেই আগের তিনভাই-ই আছেন, নিস্তারিণীর তিন ছেলে! পাঁচফুট হাইট, ছিপছিপে গড়নের যে মানুষটিকে রিনু ঠাকুমা বলে ডাকে (মনে মনে এখনও ডাকে বইকি) , ফোকলা দাঁতের সরল হাসিমাখা সেই নরমসরম মানুষটিই যে এই তিনভাইয়ের জননী-সেই নিস্তারিণী, তা জানতে-বুঝতে বেশ সময় লেগেছিল তার…এই মানুষটার সঙ্গে যে কত গল্প জড়িয়ে, তা রিনু বুঝেছে বহু পরে… জন্ম থেকেই রিনু দেখেছে ঠাকুমা ধবধবে সাদা থান পরেন;চুলের বেশিটাই সাদা, তা বেশিরভাগ সময়েই থাকে এইটুকু এক খোঁপায় জড়ানো; কপালে পুজো করার পরে চন্দনের ছোট্ট ফোঁটা; মুখভর্তি অজস্র কাটাকুটি রেখা; পাতলা দুটো ঠোঁট, পানের রঙে সবসময় রাঙানো; আশেপাশে সকলের তিনি ‘ভাই’; ঠাকুমা দিদিমা না বলে হঠাৎ ‘ভাই’ কেন! ছোটবেলায় বুঝতোনা রিনু; এখনও বোঝেনা কি যে কারণ! তবে তাঁর যে এক অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব ছিল তা তখনও টের পেতো, এখনও বুঝতে পারে! আশেপাশে যাঁরা থাকেন, তাঁরা সবাই জ্ঞাতি; সকলের খোঁজ নিতেন, প্রতিদিন; কারুর বাড়িতে কোনরকম অশান্তি হলে ডাক পড়তো ‘ভাই’য়ের! মিটমাট করে দিতেন সহজেই! সবাই মানতো তাঁর কথা! আদাপড়া জানতেন! কারুর হঠাৎ পেটব্যথা, আদার টুকরো হাতে নিয়ে কিসব যেন বিড়বিড় করে বলে,হাতে দিতেন; রিনু শুনেছে তা খেলে পেটব্যথা সেরে যেত! মাটি দিয়ে অপূর্ব পুতুল বানাতেন; ৮ এর দশকে তখনও কলকাতা শহরে ঘরে ঘরে গ্যাসের চল শুরু হয়নি! বাড়ির উনুনের পড়ন্ত আঁচে সেইসব পুতুল পুড়িয়ে মজবুত করতেন! আর কোন নাতিনাতনির সেকথা মনে আছে কিনা রিনু জানেনা, রিনুর স্পষ্ট মনে আছে সেই কুট্টি পুতুলগুলোকে! আর মনে আছে ঠাকুমার তৈরি অসাধারণ সব কাঁথার কথা; ঠাকুমার নিখুঁত সেলাইয়ের ফোঁড়ে তৈরি হত একটার পর একটা কাঁথা; ওমের সঙ্গে যাতে মাখামাখি হয়ে থাকতো ঠাকুমার আদর; কালের নিয়মে একসময়ে সেসব ছিঁড়ে গিয়ে নষ্ট হয়েছে, আছে বলতে সেই আদরের ওমটুকুই… লকার গোছাতে গিয়ে সেদিন রিনুর হাতে এক ডালিমরঙা পাথরের এইটুকু আঙটি ! মনে হল ছোটবেলায় যেমন আঙুল ধরে থাকতেন ঠাকুমা, তেমন করেই যেন আরেকবার তিনি ছুঁয়ে দিলেন তাঁর আদরের ছোট নাতনিকে! এক মুহূর্তে হুড়মুড় করে ফিরে এলো রিনুর ছোটবেলা! সব নাতনিকে নিস্তারিণী ওই ডালিমরঙা পাথরের আঙটি দিয়েছিলেন! সেজ নাতনি তখন নার্সারিতে! তার হাতেও ওইরঙেরই এক আঙটি! অন্যমনস্ক হয়ে কখন যেন সে তাকে চুষতে শুরু করেছে! একসময়ে খেয়াল হল ডালিমরঙা কিছু একটা তার হাতে, বাকিটা একটা হলদেটে কি যেন, দলা পাকিয়ে কেমন একটা হয়ে গেছে; সেটাকে আদৌ গুরুত্ব না দিয়ে, ডাস্টবিনে ফেলে, সেদিন পাথরটুকুই বাড়ি নিয়ে এসেছিল নিস্তারিণীর সেজ নাতনি! রিনুকে মা কখনও সখনও ওই আঙটি তাকে পরিয়ে দিতেন; পরে সে বড় হয়ে যাওয়ায় আঙটি গেল ছোট হয়ে, ঠাঁই পেল লকারে; ভাগ্যিস এতবছর পরে তাতে আবার হাত পড়লো রিনুর, তাই তো বহু না পাওয়ার মধ্যে আরো একবার মনে পড়লো, ঘুরে দাঁড়ানোর নামই জীবন; একা হওয়া বড় কথা নয়; জীবনকে আঁকড়ে রাখাই আসল… তাই তো রিনু পড়ে ফেলতে পারলো একটা গোটা জীবনের গল্প, নিস্তারিণীর গল্প…

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com