রিনু চায় তার যা কিছু ভালো, তা পুত্রকে দিয়ে যেতে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রিনি বিশ্বাস,সঞ্চালক ও বাচিক শিল্পী

প্রতিবছর বিশ্বকর্মা পুজোর দিন মায়ের সঙ্গে পুজোর কেনাকাটা করতে যাওয়া হত, নিউ মার্কেটে। তখনও শহরজুড়ে ‘শপিং মল’ গজিয়ে ওঠেনি। নিউ মার্কেটের কৌলিন্যও ম্লান হয়নি এতটুকু। রিনুর কাছে অবশ্য এখনও নিউ মার্কেটের আলাদাই গুরুত্ব। হাজার কেতাদুরস্ত শপিং মল এলেও তা মলিন হবার নয়। বিশ্বকর্মা পুজোর দিন মায়ের ছুটি থাকতোনা, তবে মা তাড়াতাড়ি ফিরে আসতো অফিস থেকে। অপেক্ষা করে থাকতো রিনু। এক একবার শুভ আর বাবাইও যেতো কেনাকাটায়। তবে বেশিরভাগই মা আর মেয়ে। এ দোকান সে দোকান ঘুরে চার জ্যাঠতুতো দিদি, এক মামাতো দিদি আর রিনুর জামা কিনতো মা। দিদিদের মত একই জামা কেনা হত তারও। রঙের শুধু হেরফের। তবে মাত্র একটা জামাতেই তো রিনুর জন্য কেনা থামতোনা। দোকানের পাশ দিয়ে যেতে যেতে কোনোটা চোখে লাগলেই হল, মা কিনতো মেয়ের জন্য। এই করে প্রতিবারই রিনুর এতগুলো পুজোর জামা হত। দারুণ সুন্দর সব ফ্রক, ফ্যাশনেবল্ স্কার্ট টপ, কর্ডের ট্রাউজার, এটা ওটা কত কি! তখন বেশ অবাক হত রিনু, তারজন্য এভাবে এত জামা কেনার কি দরকার? এখন মা হয়ে খানিকটা বুঝতে পারে, যেকোন কারণে দোকানে কিছু কিনতে গেলেই মন উসখুস করে ছেলের জন্য কিছু একটা নেবার জন্য। অধিকাংশই তার অদরকারি। তবু ‘থাক, কিনবোনা’ , এ কথা মনকে কিছুতেই যে বোঝাতে পারেনা রিনু। গড়িয়াহাট বুলেভার্ড কর্নারের একটা দোকান থেকে একবার খুব সুন্দর একটা এ লাইন শর্ট ফ্রক কিনেছিল রিনুর উপরের দিদি। রিনুর ‘জোনমণি’। রিনুর সেটা বড্ড পছন্দের ছিল, জানতে পেরে জেঠিমা ওরকমই একটা রিনুকেও কিনে দিয়েছিলেন।

একবার পুজোর আগে বোনেরা সবাই মিলে যাওয়া হল নিউ মার্কেট। রিনু তখনও তেমন বড় না, তবে বড়দি, মেজদি বোধহয় বড়ই। ‘গাইজ এন্ড ডলস্’ থেকে সব বোনের জন্য স্কার্ট কেনা হল সেবার পুজোয়। এই স্কার্টটাও রিনুর দারুণ পছন্দের ছিল। তখন রিনু একটু বড়। ইলেভেনে পড়ে। সেই প্রথম বন্ধুদের সঙ্গে পুজোয় বেরোবে রিনু; চাপা উত্তেজনা; মনে মনে হঠাৎই অনেকটা বড় হয়ে যাওয়া। অরুনিমাদের সঙ্গে সম্ভবত সপ্তমীর সকালে বেরোনো হল। একটা ঠাকুর দেখে বেরিয়েই ভ্যানরিক্সার বেরিয়ে থাকা স্পোকে লেগে পুজোর নতুন একটা লং স্কার্ট সেদিন এক মুহূর্তে ফালা ফালা হয়ে গেল। অনেক কান্ড করে সেদিন একবুক কান্না নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল রিনু। নতুন সেই স্কার্টের শোক এখনও মাঝেমধ্যেই জানান দেয়। একদম কুট্টিবেলায়, যখনকার কথা সেভাবে মনে থাকারও কথা নয়, তখন পুজোতে রিনুর প্রচুর পুজোর জামা হত। জ্যাঠামশাই, মামা তো বড় হওয়া অবধিই (নাকি বিয়ে হওয়া অবধি) পুজোতে জামা দিতেন, কিন্তু সেই ছোটবেলাতে তাঁরা ছাড়াও যে কতজন নিয়ে আসতেন নতুন জামা। কিভাবে যেন তেমন একটা জামা এখনও রিনুর মনে পড়ে। বেশ অন্যরকম তুঁতে রঙের ফ্রক। বাবাইয়ের কাছের বন্ধু তপুকাকু দিয়েছিল। তপুকাকুর মেয়ে ফুলের কথা খুব মনে পড়ে রিনুর, বহুবছর আর দেখা হয়না। তপুকাকু এরমধ্যে চলে গেছে সেই না ফেরার দেশে…থেকে গেছে ছোটবেলার কিছু ঘটনা…। পুজো এলেই জামা কেনা, নতুন জুতো কেনা তো চলতোই; সঙ্গে চলতো পূজাবার্ষিকী কেনা। আর নতুন নতুন ক্যাসেট। রেকর্ড শোনার কথা মনে এলেও তা কেনার কথা রিনুর স্মৃতিতে নেই। রিনু শুভর জন্য কেনা হত আনন্দমেলা, সন্দেশ। মা বাবার জন্য চেনা সমস্ত পূজাবার্ষিকীর সঙ্গেই কেনা হত পরিচিত এবং নাম না জানা বহু লিটিল ম্যাগাজিনের পুজো সংখ্যা। পরে বড় হবার পরে সে সমস্তই এলো রিনু আর ভাইয়েরও পড়ার তালিকায়। বড় হবার পরেও কিন্তু আনন্দমেলা আর সন্দেশের পূজাবার্ষিকী কেনা বন্ধ হলনা। ‘সেই ট্রাডিশন সমানে চলিতেছে’…।

বয়স যাই হোক না কেন, রিনু এবং তার পুত্র একই সঙ্গে এই বই দুটো আজও পড়ে। নিজেদের, আত্মীয়স্বজনের জন্য কেনাকাটার সঙ্গে সঙ্গেই কেনা হত বাড়ির সাজপোশাক। নতুন পর্দা, নতুন বিছানার চাদর, বালিশের ওয়ার…। বাড়িটায় হঠাৎ যেন নতুন রঙ লাগতো! পুজোর সকালগুলোতে দূর থেকে মাইকে ভেসে আসতো অঞ্জলীর মন্ত্রপাঠ, আধুনিক বাংলা গান, আর বাড়ির ড্রয়িং রুমের ক্যাসেট প্লেয়ারে বাজতো সেবারের পুজোর গান, কোনদিন হয়ত বা ‘মহিষাসুরমর্দিনী’…। অকারণ মনভালো আর এমনি মনখারাপের মিশেল তৈরি হত মনের মধ্যে…। বাড়িতে মা-বাবাই-ভাই, চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ভালোলাগার অফুরান কারণের মধ্যেও কিসের জন্য ওই ‘এমনি মনকেমন’ রিনু আজও আবিষ্কার করতে পারেনি। ‘পুজো আসছে’ শব্দদুটো এক আকাশ আনন্দ আনতো ছোটবেলায়। আকাশের দিকে নানা বাহানায় চোখ চলে যেত অকারণ। রিনুর স্কুলের সেই বিশাল সবুজ মাঠে, অকৃপণ আকাশ ছিলো, মন ভরিয়ে দেওয়ার মতোই। পরে ইউভার্সিটিতেও আকাশ ছিল একইরকম দরাজ। ঝকঝকে নীল আকাশটাই বোধহয় মনভালোর হদিশ আনতো। ইদানীংকালে কাজের চাপ ও ব্যস্ততায় আর আকাশে চোখ রাখা তেমন হয় কই!!! সেই হঠাৎ আনন্দও কি আর আছে? ভেবে দেখলে বোঝা যাবে, তা খানিক কমলেও, এখনও পুজো আসছে ভাবলেই, ভেতরে ভেতরে রিনুর ছটফটানি শুরু হয়ে যায়…। যেমন এখন হচ্ছে… হাতে মাত্র আর কয়েকটাদিন, তারপরেই পুজো…। এক সঙ্গে অনেকটা অবসর আর স্বজন ও সুজন… নিজের মন্দটুকু যে করে হোক ছেঁটে ফেলে, রিনু চায় তার যৎসামান্য যা কিছু ভালো, তা পুত্রকে দিয়ে যেতে…। রিনু চায় তার ছেলেও চোখ মেলুক আকাশে, তাতে যদি পড়ার সময় একটু কমেও যায়, যাক্ গে…।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com