রিনু আঁকড়ে থাকতে পারে…দমবন্ধ করা ভালোবাসতেও পারে,

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রিনি বিশ্বাস,সঞ্চালক ও বাচিক শিল্পী

কথায় কথায় কথা বন্ধ! এমনিতে সারাক্ষণ বকবক, কিন্তু যেই না একটু এদিক থেকে ওদিক হল, ব্যস্- গাল ফুলে ঢোল; মুখে কুলুপ! হাজার ডাকলেও মেয়ে তখন সাড়াটুকুও দেবেনা! মা বলে ‘কথা নেই বার্তা নেই, মুখখানা তেলো হাঁড়ি করে ফেললো! কি রাগ মেয়ের!!’ সবাই ভাবে রাগ-রিনু কাউকে বোঝাতেই পারেনা এ রাগ না- এ অভিমান-এ এমন এক কষ্ট যেটা বলা যায়না, এমন যন্ত্রণা যার উপশম হয়না! রিনু বিশ্বাস করে নিজের মানুষদের উপর রাগ করা যায়না… সেখানে অকারণ অভিমানই আসে.. আর তা এলেই সব শব্দগুলো ছুট্ লাগায়; রিনু কথা বলবে কি করে!!! ছোটবেলায় ভাইবোনের ঝগড়া হলেই ভাই ‘মা দেখো’ বলে ডাক দিতো, আর মা তৎক্ষণাৎ ‘রিনু’ বলে রাগী রাগী গলায় একটা ডাক!!! এরপরও কি রিনুর গলার কাছে ব্যথা হওয়া অস্বাভাবিক?! অতএব নৈঃশব্দ! বেশ খানিকক্ষণ অবধি রিনুর কাছ থেকে কোন শব্দ আশা করাও তখন বৃথা!! ছোটবেলা থেকেই রিনু সবেতে ‘পারফেকশনিস্ট’.. কোনকিছুর এদিক ওদিক তার নাপসন্দ! জায়গার জিনিষ জায়গায় থাকতে হবে; অগোছালো করে সব ছড়িয়ে আছে দেখলেই রিনুর ভেতরে অস্বস্তি শুরু …নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই নির্দিষ্ট কাজ শেষ করতে হবে; কাজ ফেলে রেখে অন্যকিছু?! অসম্ভব!! রিনু কি কখনই তেমন করেনি? সব কাজ সবসময় ঠিক ঠিকভাবেই করেছে?! না তা নয়… কাজ বাদ দিয়ে অন্যকিছু- রিনুও করেছে তো নিশ্চয়ই; কখনও বন্ধুদের পাল্লায় কখনও বা নিয়মভাঙার জন্য; কিন্তু তারপর শুরু হয়েছে রিনুর বিবেক দংশন! বিবেক দংশনের চোটে তারপর শুরু রিনুর প্রচন্ড মাথাব্যথা – এমন নজিরও অজস্র! এই যে রিনু সারাদিনে অজস্রবার তার বুয়ানের উপর চিল চিৎকার করে- ‘ঠাস্ করে এক মারবো’ বলে , দিনে অন্তত কয়েক শো বার- তারপরে কি তার কোন মনোকষ্ট হয়না?! কতবার এমন হয়েছে যে ছেলেকে বকুনি দিয়ে সে বেরিয়ে গেছে কোন অনুষ্ঠানে; ব্যস্, সেই অনুষ্ঠান থেকে ফিরে- তাকে আচ্ছা ক’রে আদর করার আগে অবধি-রিনুর সেই ‘তেলো হাঁড়িমুখ’ দেখতে হয়েছে সকলকে! কাষ্ঠহাসি দিয়ে কি আর সবাইকে ভোলানো যায়?! কেউ কেউ জিগ্যেসও করেছেন ‘পাবলোকে বকেছো বুঝি?!’ যাঁরা পাবলোকে চেনেন তাঁরা যে এতক্ষণে রিনুকে মনে মনে কষে ধমক দিচ্ছেন, জানি! এমন এক সুবোধ(!) বালককে রিনু বকে!!! কি পাষাণহৃদয় মা রে বাবা!!! এ কথা সর্বৈব সত্য যে রিনুর পুত্র অত্যন্ত ভালো; বাধ্য; এবং ভালোবাসার মতই ( আরো অনেক অনেক বিশেষণ দেওয়াই যেত; মায়ের কাছে সন্তানের যে অন্তত কোটিখানেক ভালোগুণ থাকেই তা কে না জানে! তবু রিনু অতি কষ্টে আবেগ দমন করলো!) এহেন সুবোধ বালককেও বকতে হয়! সে সারাক্ষণ যদি গপ্পের বই নিয়ে ঘোরে, যদি মোটেই নিজে থেকে রেয়াজ করতে না বসতে চায়, যদি সে মা খেতে ডাকলেও- পাঁচবার না ডাকা অবধি উঠে না আসে- তখন বকতে হয় বইকি!! রিনুও সেইজন্যই বকে! ‘একটু শোন না বাবা’ বলে অপেক্ষা-পুত্র সাড়াটি দেবেন! কোথায় কি! তিনি হয়ত তখন একমনে তাঁরই সৃষ্ট কোন সুপারহিরোর গুণাগুণ লিখছেন ডায়েরির পাতায়, অথবা সেই সুপারহিরোর ছবি আঁকায় তিনি এতই মগ্ন যে মায়ের ডাক তাঁর কান অবধিই পৌঁছয়নি!! আচ্ছা মানলাম এক্ষেত্রে ‘তাঁকে’ তেমন দোষ দেওয়া যায়না- কিন্তু মা যদি কাজের মাঝখানে আটকে থাকার পর ‘পাবলো’ বলে একটা জোরালো হাঁক দিয়েই ফেলে, তাহলে মাকেও কি তেমন দোষারোপ করা উচিৎ হবে?! আপনারাই বলুন!!! পিনাকী প্রায়ই বলে ‘ আমি আর ছেলে তো ভয়ে ভয়ে থাকি, এই বুঝি বকলে!! ‘ রিনু তাই করে! শুধুই বকে! সারাক্ষণ খিটখিট! সর্বক্ষণ পিটপিট! সবসময় খুঁত ধরা! ‘এটা কেন হলনা, ওটা কেন করলেনা, সেটা হল কি করে ইত্যাদি ইত্যাদি! কিন্তু কেন এমন করে রিনু?! এমন করার পরে কি যে কষ্ট ভেতরে হতে থাকে তা রিনু কাউকে বোঝাতে পারেনা! বাড়ির স-ব কাজ রিনু একা করবে, সাহায্য করার কথা তো তারাও কখনো ভাবতে পারে! আচ্ছা বেশ, সাহায্য করতে না পারুক রিনুর কষ্টের কথা বাড়ির আর দুজন একটুও বুঝবেনা! পরিশ্রমের ধকল আর না বোঝাতে পারার যাতনা – রিনুকে চুপ করিয়ে দেয় খানিকক্ষণ! ঠান্ডা মাথায় পরে ভাবলে রিনু বোঝে যে সবেতে এত নিখুঁত না হলেই বা কি এসে যায়, সবকিছু ঠিক জায়গায় নাইবা থাকলো, তাতেই বা কি ! অহেতুক নিজের ব্লাড প্রেশার বাড়িয়ে চিৎকার না করলেই তো ‘গৃহে শান্তি’ বিরাজ করতে পারে! বোঝে সব, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে রিনু তা করে উঠতে পারেনা! যথারীতি চেঁচিয়ে ফেলে! এবং তারপরই চুপ! পিন ড্রপ সাইলেন্স! নীরব হয়ে থাকলে অনেক সময় কাজ হয়… বর কখনও সখনও তাঁর ভুল টের পান; কথা বলানোর চেষ্টা করেন! পুত্রও মাঝেসাঝে (প্রায় সবসময়ই) ‘তা বলিনি মাম্মাম’ বলে পাশে এসে বসে…পুত্রের আজকাল বড় বড় হাবভাব! আগের মত চুপটি করে মায়ের সব কথা আজকাল আর তিনি মেনে নেন না! বরং প্রায়শই উত্তর আসে তাঁর দিক থেকে! রিনু ভেতরে ভেতরে অধৈর্য্য হয়; মুখে বলে ‘থাক, তুমি যা বোঝো করো; আমাকে বলতে হবেনা’ … এবং সাময়িক নীরবতা পালন করে… তারপরেই শ্রীমান মায়ের কাছে এসে বসেন… বলে ওঠে ‘তা বলিনি মাম্মাম…’ অনেকসময় কথা বন্ধ করেও রিনু তা ভুলে যায়! কথা বলে ফেলে! রাতে ঝগড়া হলে, পরদিন সকালে অবধারিতভাবে রিনু কারণ মনে করতে পারেনা, এবং যথারীতি কর্তামশাইয়ের সঙ্গে কথা বলে ফেলে! বড় হবার সময় বাবাই অফিস থেকে ফিরলেই সোফার হ্যান্ডেলে ব’সে সারাদিনের গল্প করাটা ছিল রিনুর খুব পছন্দের! মা বাবাইয়ের ঘরের সোফায় বাবাই ব’সে, মা খাটে আর রিনু বাবাইয়ের সোফার হ্যান্ডেলে ব’সে -‘জানো আজ ইউনিভার্সিটিতে……..’ খানিক পরে হয়ত রিনুর মনে পড়ে বাবাইয়ের সঙ্গে তো তার কথা বন্ধ! আগের রাতে হয়ত মনোমালিন্য হয়েছিল! রিনু বেমালুম ভুলে গেছে! গল্পের মাঝপথে মনে পড়লে কি আর করা যায়, বলতেই হয় ‘আচ্ছা গল্পটা এখন বলেনি, তারপর তোমার সঙ্গে আর কথা বলবোনা’…. রিনুর প্রচুর সমস্যা! পাবলোকে বকুনি দিয়ে মিনিট কয়েক পরেই তাকে চটকাই মটকাই ক’রে ফেলে! এটা দেখে পিনাকী রিনুর উপর রাগ করে! বলে ন্যাকা মা! তবু রিনু এমনই করে! এই অবধি প’ড়ে, সবাই নিশ্চয় ‘রিনু’কে ত্যাগ দেওয়ার কথাই ভাবতে শুরু করেছেন; এ প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখা ভালো যে রিনু তার গন্ডীর কয়েকজনের উপরেই এই অত্যাচার করে থাকে; তার বাইরে থাকা সবাই একদম ‘সেফ’!!! তবে হ্যাঁ, প্রচন্ড অন্যায় (যদি রিনু মনে করে তা অন্যায়) দেখলে রিনু প্রতিবাদ করে ! প্রয়োজনে চিৎকার করে! সেক্ষেত্রে সে ঘর-বার মানেনা! আপনারা কেউ হয়ত ভবিষ্যতে রিনুর সেই রূপ দেখে ফেলতেও পারেন! প্রচন্ড রেগে ( হ্যাঁ এটা রাগ, নরম অভিমান নয়) রিনু হয়ত রাস্তায় বা অন্য কোথাও কারুর উপর চিৎকার করছে! ইদানীং অবশ্য আরেকটা উপায় বের করেছে রিনু, প্রতিবাদের… যে কারণে মন তোলপাড়-যার কারণে কষ্ট – তাকে এখন বাদ দিয়ে দিতে শিখেছে রিনু … তা ভার্চুয়াল জীবনেই হোক বা বাস্তব… কোন শব্দ খরচ না করে, মন থেকে বিয়োগ… যাঁরা মনে করেন এভাবে চাইলেই বাদ দেওয়া যায়না, রিনু তাঁদের সঙ্গে সহমত নয়.. রিনু তা পারে… রিনু আঁকড়ে থাকতেও যেমন পারে, দমবন্ধ করা ভালোবাসতে যেমন পারে, তেমনিই মুখ ঘুরিয়ে নিতেও দিব্যি পারে… এরজন্য যতটুকু আনচান হয় মনে-তা রিনুর একার… তার কথা আর নাইবা হল…

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com