রিনু অপেক্ষা করে এই ডাকটুকু শোনার….ভালোবাসার এই ডাকটুকু তার পিছুটান…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রিনি বিশ্বাস,সঞ্চালক ও বাচিক শিল্পী

রিনুদের বাইরের ঘরে ডিভানের কোনাকুনি একটা জানালা ছিল; ওই জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে শনিবারগুলোতে রিনু বাবা ফেরার অপেক্ষা করতো.. বাবা সারা সপ্তাহ থাকতেন কাজের জায়গায়; কখনও দুর্গাপুর কখনও আসানসোল কখনও বা আর কোথাও..
ওরা তখন থাকতো লিজ ফ্ল্যাটে; চারপাশে বইয়ের পাহাড়; বুকশেল্ফ-টেবিল-টুল-লফ্টের মধ্যে-ফ্রিজের মাথায় এমন কি ডিভানের ভিতরেও ঠাসা বই; সব বাবার; কবে বাবা এই সব বই পড়লো, ভাবতো রিনু! অফিসের বাইরে বাড়িতে থাকার সময়টুকুতে অবশ্য হাতে বই-ই থাকতো বাবার; মায়েরও; অফিস, ঘরকন্না আর ছেলেমেয়েকে পড়াশুনো করানোর বাইরে যে যৎসামান্য সময় বাঁচতো, সেই সময়টুকু ছিল বইয়ের জন্যই বরাদ্দ; বাড়ির বই তো ছিলই, সঙ্গে অফিস লাইব্রেরী থেকে আনা গল্প-উপন্যাস; প্রতিবার হাফ ইয়ারলি আর অ্যানুয়াল পরীক্ষার আগে মা সাতদিন অফিসে ছুটি নিতো; বছরভর রিনু অপেক্ষা করতো পরীক্ষা আসার…..আসলে সারাদিন মা বাড়ি থাকার আলাদা মজা; যদিও সেই সময় শুধুই পড়তে হত, তবু ভেতরে কেন যেন আনন্দ হত; স্কুল ছুটির শনিবারগুলোতে মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে রিনু কত বড় হওয়া অবধি বলতো ‘আজ তো শনিবার, মা’, বাকিটুকু উহ্য! মা বুঝতে পারতো অফিস কামাই করতে বলছে মেয়ে; একেকদিন হেসে ফেলতো, কখনও আবার বকুনি দিতো!  মা অফিস চলে গেলে, ছাড়া শাড়িটা রাখা থাকতো খাটের পাশে, গুছিয়ে; সেটাকে ভালো করে জড়িয়ে ঘুমোতো রিনু-শুভ, দুভাইবোনে; মা অফিস চলে যাবার পরে সারা ফ্ল্যাটে লেগে থাকতো ‘মা গন্ধ’..  ওই গন্ধটার মধ্যেও ছিল অপেক্ষা, মা ফিরে আসার;ছেলে তখন সদ্য তিন পেরিয়ে চারে পড়েছে! স্কুলের পরে বাড়ি ফিরে মায়ের সঙ্গে স্কুলের গল্প চলছে; রিনু ক্লাসের কোন একটি ছেলের মায়ের কথা বলেছে ‘কি সুন্দর দেখতে, না বুয়ানা?’
ছেলে মাথা এদিক থেকে ওদিক নেড়ে জবাব দিলো ‘না তুমি সুন্দর’; মা যতই বলে ‘দূর বোকা, আমার চেয়ে ঢের সুন্দর ওই আন্টি’, ছেলে ততই প্রাণপণে চেষ্টা করে বোঝাতে তার মাও সুন্দর; মায়ের সঙ্গে কথায় না পেরে শেষমেশ সে বলে ওঠে ‘ আচ্ছা, ওই আন্টি সুন্দর, কিন্তু মাম্মাম, তোমার গায়ের গন্ধটা সবার চেয়ে সুন্দর’….
কত বছর পরে, সেই মা গন্ধ, রিনুকে আর তার ছেলেকে, মুহূর্তে এক করে দেয়, আর কেউ তা টেরও পায়না….
শনিবার রাত সাড়ে আটটা থেকে ন’টায় বাবা বাড়ি আসতো; ব্রাঞ্চের কাজ ফুরোলে, দৌড়ে স্টেশন। নাগালে পাওয়া যেকোন ট্রেনে হাওড়া। তারপর বাস বা ট্যাক্সি ধরে বাড়ি; কোন এক শনিবার অনেক রাত হওয়ার পরেও বাবা আসছিলনা; রিনু ছটফট করছে, ভাই বারবার জিগ্যেস করছে ‘বাবা কখন আসবে?’ মা-ও খুব চিন্তিত; প্রতি শনিবারের মতই তিনজন সেদিনও অপেক্ষা করছিলো, বাবার ফেরার; ফারাক এই, সেদিনের অপেক্ষা ছিল এক করুণ-দুশ্চিন্তার অপেক্ষা! মোবাইল ফোন তখনও আসেনি, বাড়ির ল্যান্ডলাইনটিই সবেধন নীলমণি; সে একদম নিশ্চুপ। বাবার সপ্তাহান্তের এই বাড়ি ফেরা সম্পূর্ণ ভারতীয় রেল বিভাগের হাতে। অফিস সেরে একই ট্রেন সবসময় পাওয়া যায়না; একেকদিন ট্রেন লেট করে অনেক!  তাই কোথায় কিভাবে যে বাবার খোঁজ নেওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে কোন ধারনাই সেদিন কারুর ছিলনা! ঘড়ির কাঁটা যখন প্রায় বারোটা ছুঁয়েছে, তখন বাবা ফিরলো… পরপর ক’টা ট্রেন বাতিল হয়ে যাওয়ায় সেদিন চরম দুরবস্থায় পড়তে হয়েছিল রিনুর বাবার মতই বহু ‘উইক এন্ড’ যাত্রীকে! বাবাকে দেখতে পেয়েই সেদিন হুড়মুড়িয়ে চোখে জল এসেছিল রিনুর… রিনু আর ভাই মিলে সোমবার থেকে অপেক্ষা শুরু করতো পরের শনিবারের; বাবা আসবে যে… রবিবারটা কাটবে একদম অন্যরকম; অল্প পড়ালেখার পরে বাবার সঙ্গে এটাসেটা; বিকেলে ঠাকুমার কাছে যাওয়া বা ফার্ণ রোডে ফুটপাথে পুরোনো বই নিয়ে বসা হেমন্তকাকুর কাছে যাওয়া… কি যে আনন্দ ট্রামে চড়ে বইয়ের দোকানে যাওয়ার মধ্যে ছিল, সেটা বলে বোঝানো অসম্ভব। হেমন্তকাকুর সব চুল এখন সাদা হয়ে গেছে; বাবা এখনও যান মাঝেমধ্যে.. রিনুকে নিশ্চয় আর চিনতেও পারবেনা কাকু; বাবা বইয়ের স্তুপের মধ্যে পছন্দসই বই বাছতো, ছোটদের বই সেখানে খুব কমই থাকতো, যেদিন বেরিয়ে আসতো কোন ছোটদের বই, রিনুদের দুভাইবোনের চোখমুখের ভাষাই যেত বদলে! হেমন্তকাকু চা খাওয়াতো। রিনু আর ভাইয়ের জন্য আসতো খাস্তা বিস্কুট; ওখান দিয়ে যখনই কোথাও যায় রিনু, সঙ্গে যেই থাকুক তাকে একবার হেমন্তকাকুর দোকানটা দেখাবেই সে, আজও… প্রায়ই এখন দোকান বন্ধ থাকে; প্লাস্টিকে মোড়ানো; দোকান মানে কিছু বই সাজানো, খানিকটা মাটিতে বিছিয়ে রাখা, খানিকটা পরপর উঁচু করে রাখা… ওখানে রিনুর ছোটবেলার খানিকটা থেকে গেছে…অপেক্ষা করলেও সে আর ফিরে আসবেনা…
রিনুর পুত্র কয়েকমাস আগে প্রথমবার তার মা বাপিকে, দাদাই দিয়াকে ছেড়ে স্কুলের সঙ্গে গেল বেড়াতে; বাস দুটো চোখের আড়ালে মিলিয়ে যেতে না যেতেই শুরু হল অপেক্ষা, তার বাড়ি ফেরার; কি করে ছেলেটা থাকবে! মনকেমন করলে কি করবে! শরীর ঠিক থাকবে তো! দাদাই দিয়া আর মা বাপির বাইরে কারুর কাছেই যে সে স্বচ্ছন্দ হতে পারেনা; কেমন মুখচোরা, লাজুক; নিজের কথাটুকু জানাতে তার বড্ড অনীহা…. মায়ের মন, সমস্ত কাজের মধ্যে-তিনদিনই নাগাড়ে ভেবে চললো এসব…
কত মাকে রিনু বলতে শুনেছে, দস্যি দামাল ছেলে, একটু ঘুমোলে মনে হয় শান্তি, কিন্তু আবার তার না ঘুমভাঙা অবধি, মনে হয় কি যেন নেই!
কথায় কেউ কম যায়না, না রিনু না তার বর! মাঝেমাঝেই খিটিমিটি! চাপানউতোর শেষে নীরবতা; রিনু মৌনব্রত নেয়… অবধারিতভাবে বালিশ কোলে হেঁটে যায় বৈঠকখানার ডিভানে বিছানা করবে বলে; পিছু ডাকে ‘রাই’ ডাক… মনে মনে রিনু অপেক্ষা করে এই ডাকটুকু শোনার….ভালোবাসার এই ডাকটুকু যে তার পিছুটান…
কতকিছুর জন্য যে অপেক্ষা করি আমরা; পাবলো অপেক্ষা করে শনিবারের; এখন শনিবারগুলো দাদাই দিয়ার সঙ্গে একা তারই…
পিনাকী অপেক্ষা করে ভালো একটা গল্প নিজের মত করে ছবিতে বলার জন্য….আর সবাইও নিজের নিজের মত করে অপেক্ষার কারণ সাজায়…
সকলের মত রিনুও জানে সব অপেক্ষা ফুরোয়না; সব অপেক্ষার শেষটুকু মনের মতোও হয়না, তবু অপেক্ষা থেকেই যায়…
তাই অপেক্ষা করে রিনুও…
কবে কোন ফোনে, ভেসে আসবে খুব চেনা গলা, অফুরান প্রশংসা – ভাইয়ের কোনো একটা লেখার…
কবে প্রিয়ম একবার ফোন করবে, ‘দিদি, আজ থাকবি? আসবো আমি?’
কবে ছেলেটা বড় হয়ে বলবে ‘আমি আছি, ভয় কেন মা করো….’
কবে…..
কবে….

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com